Logo
Logo
×
   

Advertisement

আন্তর্জাতিক

আনাদোলুর প্রতিবদেন

দুই প্রণালিতে বিঘ্ন, বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার শঙ্কা

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৬ এএম

দুই প্রণালিতে বিঘ্ন, বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার শঙ্কা

ফাইল ছবি

Advertisement

বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের কৌশলগত এলাকাগুলোতে হুথিদের অগ্রসর হওয়ার ঘটনায় বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। কৌশলগত অবস্থান দখলের ফলে প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচলকারী নৌযানগুলোর ওপর হুথিদের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বেসামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার কারণে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। এতে বীমা ব্যয় ও অন্যান্য পরিবহণ খরচ তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন মিসরের সামরিক ও কৌশলগত বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সামির রাগেব। অন্যদিকে ব্রিটিশভিত্তিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মামদুহ সালামেহ বলেছেন, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—দুই প্রণালিতে একই সময়ে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে এমন পর্যায়ে তেলের দাম পৌঁছাতে পারে যা বিশ্ব অর্থনীতি সামাল দিতে পারবে না। 

বিশ্বের জ্বালানি ও বাণিজ্য পরিবহণের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারগুলোর একটি বাব আল-মান্দেব। হরমুজ প্রণালি ও সুয়েজ খালের পাশাপাশি এই জলপথের গুরুত্বও ব্যাপক। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এটি আরও জটিল সমীকরণের কেন্দ্রে চলে এসেছে।

হুথিরা প্রণালির কাছাকাছি কৌশলগত অবস্থান নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পাশাপাশি জাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হুমকি বাড়ানোয় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বিশ্বের বার্ষিক বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করে।

বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। উত্তরে সুয়েজ খালের মাধ্যমে এটি ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে। ফলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যের জন্য প্রণালিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রণালির কাছাকাছি কৌশলগত এলাকাগুলোতে হুথিদের অগ্রসর হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মোখা ও এর কাছাকাছি দ্বীপগুলো হুথিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী নৌযানের ওপর তাদের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

২০২৩ সালে গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর পর হুথিরা লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী ইসরাইলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে। এর ফলে বড় বড় নৌপরিবহণ কোম্পানি জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে চলাচল শুরু করে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মিসরের সুয়েজ খালের বাণিজ্যে। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি সম্প্রতি বলেছেন, লোহিত সাগরে অস্থিরতার কারণে তার দেশ খালটির আয় থেকে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে।

মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবে নৌ চলাচলকে প্রভাবিত করা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে সৌদি আরব হুথিদের হুমকির বিষয়ে সতর্ক করে এবং সমুদ্রপথ সুরক্ষা ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাকে আন্তর্জাতিক সবার দায়িত্ব বলে উল্লেখ করে।

এই পরিস্থিতিতে ‘আনাদোলু’ মিসর, ব্রিটেন, ইরাক ও আলজেরিয়ার সামরিক, জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছে। তারা সংকটের সম্ভাব্য তিনটি পথের কথা জানিয়েছেন—উত্তেজনা অব্যাহত থাকা, বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়া এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সমঝোতা।

বাব আল-মান্দেব নিয়ন্ত্রণে হুথিরা

মিসরের সামরিক ও কৌশলগত বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সামির রাগেব আনাদোলুকে বলেন, বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে অগ্নিনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা হুথিদের রয়েছে।

তিনি বলেন, প্রণালির আশপাশে মায়ুন দ্বীপ থেকে মোখা, হাইস ও দক্ষিণ আল-হুদায়দাহ হয়ে ধামার প্রদেশের পূর্ব উপকূল পর্যন্ত কৌশলগত অবস্থানগুলোতে হুথিদের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।

আরব সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রধান রাগেব বলেন, উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মাধ্যমে হুথিদের এসব এলাকা থেকে সরিয়ে প্রণালির ওপর থেকে হুমকি দূর করার একটি সামরিক সমাধান সম্ভব।এটি এখনো হয়নি। তবে জাতীয় বাহিনী তাদের সক্ষমতা ফিরে পেলে তারা আবার নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং হুমকি শেষ হবে। 

বর্তমান নিয়ন্ত্রণের ধরন সম্পর্কে তিনি বলেন, সরাসরি নৌ নিয়ন্ত্রণের কথা বললে আন্তর্জাতিক জোটের যুদ্ধজাহাজগুলো সবচেয়ে বেশি সক্ষম। তবে এটি দুটি নৌবহরের মধ্যকার যুদ্ধ নয়। বরং হুথিরা বেসামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করছে। এতে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে, বীমা ও অন্যান্য ব্যয় তিন গুণ পর্যন্ত বাড়ছে। জাহাজগুলোকে উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে।

রাগেবের মতে, সংঘাতে সক্রিয় কোনো পক্ষ সরাসরি সামরিকভাবে যুক্ত হলে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে যেতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

তেলের বাজারে চাপ

বাব আল-মান্দেবের সংকটের প্রভাব শুধু নৌ চলাচলে সীমাবদ্ধ নয়। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন এবং তেল রপ্তানির বিকল্প পথ সংকুচিত হওয়ায় জ্বালানি বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে।

ব্রিটেনভিত্তিক আন্তর্জাতিক তেল ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মামদুহ সালামেহ বলেন, বাব আল-মান্দেব নিয়ন্ত্রণে হুথিদের প্রচেষ্টা এবং ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টারই অংশ। 

সালামেহ বলেন, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবে একই সঙ্গে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০৮ ডলারের ওপরে, এমনকি ১১০ বা ১২০ ডলার ব্যারেলেও উঠতে পারে। তার মতে, এমন দাম বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অসহনীয় হয়ে উঠবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয়, শিল্প উৎপাদন ও খাদ্য উৎপাদনের খরচ বাড়িয়ে দেবে।

হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবের বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তিনি। কারণ বিকল্প পথগুলোও এখন হুমকির মুখে। হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর সৌদি আরব লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে শেষ হওয়া ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ব্যবহার করতে চেয়েছিল। তবে হুথিদের হামলায় সম্প্রতি পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে সৌদি রপ্তানিতে।

বিকল্প পথেও হামলা

ইরাকের সাবেক তেল মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ আসিম জিহাদ বলেন, বর্তমান সংকটের মূল সমস্যা হলো হুমকি এখন বিকল্প পথের কাছেও পৌঁছে গেছে। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি এর অন্যতম উদাহরণ। স্বাভাবিক সময়ে পাইপলাইনটি প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহণ করতে পারে।

জিহাদ বলেন, এতে বিশেষ করে এশিয়ার বাজারগুলো তাদের ওপর নির্ভরশীল তেল সরবরাহের একটি অংশ থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

তার মতে, হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহণ দ্রুত কমে যাওয়ায় বিকল্প পথের গুরুত্ব বেড়েছে। বাব আল-মান্দেব দিয়ে তেল পরিবহণ ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে প্রতিদিন প্রায় ৫৪ লাখ ব্যারেল থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রায় ৮১ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে।

তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধের আগে হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহণ হতো। ফলে হরমুজের ঘাটতি পূরণে বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জিহাদের মতে, সংকট বাব আল-মান্দেবে ছড়িয়ে পড়া বা বিকল্প পথগুলোতে বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে শুধু তেলের দাম বাড়বে না, বরং তেল ও গ্যাস সরবরাহে দ্বৈত সংকট তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, এসব প্রভাব তৈরি করতে জলপথ পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। ঝুঁকি বেড়েছে—এমন ধারণাই ট্যাংকারের ভাড়া ও বীমা প্রিমিয়াম বাড়াতে পারে, নৌযানের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে এবং যাত্রার সময় দীর্ঘ করতে পারে।

সম্ভাব্য তিন পরিস্থিতি

আলজেরিয়ার সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞ নাসরেদ্দিন বুগাচিচে বলেন, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ মোড়ের মুখে।

তিনি বলেন, হুথিদের সক্ষমতা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করতে আগাম হামলাগুলো এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। ফলে অঞ্চলটির সামুদ্রিক পরিবেশ দীর্ঘ সময়ের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ থাকতে পারে।

তার মতে, প্রথম ও সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পরিস্থিতি হলো উত্তেজনা অব্যাহত থাকা এবং অনিশ্চয়তা আরও গভীর হওয়া। এর ফলে জাহাজে হামলা অব্যাহত থাকতে পারে বা নতুন নৌপথ ও প্রকল্পও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। এতে আরও বেশি আন্তর্জাতিক নৌপরিবহণ কোম্পানি সরাসরি বাণিজ্যপথ পরিত্যাগ করতে পারে।

দ্বিতীয় পরিস্থিতি হলো সংঘাতের বিস্তৃতি। তুলনামূলক কম সম্ভাবনাময় হলেও এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে এবং নির্দিষ্ট সময়গুলোতে প্রণালির প্রায় পুরোপুরি চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

তৃতীয় পরিস্থিতি হলো উত্তেজনা প্রশমিত করে একটি ব্যাপক সমঝোতায় পৌঁছানো। তবে আঞ্চলিক ইস্যুগুলোর জটিলতা, বিশেষ করে ইরানের পরিচালিত আঞ্চলিক ভারসাম্যের কারণে বুগাচিচে মনে করেন, বর্তমানে এ পরিস্থিতি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা দুর্বল। যদিও তিনি এটিকে পুরোপুরি অসম্ভব বলছেন না।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম