Logo
Logo
×
   

Advertisement

আন্তর্জাতিক

প্রতি ১০ জনে ৩ জন প্রবীণ, রেকর্ড সংখ্যক শতায়ু মানুষ নিয়ে উদ্বেগে জাপান

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১৬ পিএম

প্রতি ১০ জনে ৩ জন প্রবীণ, রেকর্ড সংখ্যক শতায়ু মানুষ নিয়ে উদ্বেগে জাপান

জাপানে ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে।

Advertisement

জাপানে ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা প্রথমবারের মতো এক লাখ ছাড়িয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর শতায়ু মানুষের সংখ্যা রেকর্ড ১ লাখ ৭ হাজার ৬৭৭ জনে পৌঁছেছে, যা ২০২৫ সালের তুলনায় ৭ হাজার ৯১৪ জন বেশি। টানা ৫৬ বছর ধরে এ সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শতায়ুদের মধ্যে প্রায় ৮৮ শতাংশই নারী। খবর আলজাজিরার। 

জাপানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেনইচিরো উএনো বলেছেন, ‘অনেক মানুষ দীর্ঘ, সুস্থ ও সক্রিয় জীবন যাপন করছেন, এতে আমি খুবই আনন্দিত।’ তিনি চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নয়ন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তবে এ অর্জনের আড়ালে রয়েছে একটি বড় জনমিতিক সংকট। জাপানে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও জন্মহার কমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ফলে দেশটিকে ক্রমশ ছোট হয়ে আসা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করে পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সেবার ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।

দ্রুত বার্ধক্যের দিকে জাপান

বর্তমানে জাপানের প্রায় প্রতি ১০ জন বাসিন্দার মধ্যে তিনজনের বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি। ২০৭০ সালের মধ্যে এই হার প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জাপানে ৯৫ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা ছিল ৮ লাখের বেশি, অথচ জন্ম নিয়েছে মাত্র ৭ লাখ শিশু।

এদিকে দেশটির জনসংখ্যাও দ্রুত কমছে। প্রাথমিক আদমশুমারির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে জাপানের ৪৭টি প্রিফেকচারের মধ্যে ৪৫টিতেই জনসংখ্যা পাঁচ বছর আগের তুলনায় কমেছে। কেবল টোকিও ও ওকিনাওয়ায় জনসংখ্যা বেড়েছে।

জাপানের জনসংখ্যা ২০০৮ সালে প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। দেশটির ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পপুলেশন অ্যান্ড সোশ্যাল সিকিউরিটি রিসার্চের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৭০ সালে তা কমে ৮ কোটি ৭০ লাখে নেমে আসবে, যা প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস।

কেন বেশি দিন বাঁচছেন জাপানিরা?

গবেষকদের মতে, জাপানিদের দীর্ঘায়ুর পেছনে একক কোনো কারণ নেই। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সমন্বিত প্রভাব এতে ভূমিকা রাখছে।

প্রচলিত জাপানি খাদ্যতালিকায় মাছ, শাকসবজি ও ভাতের পরিমাণ বেশি এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট তুলনামূলক কম। ফলে স্থূলতার হারও পশ্চিমা অনেক দেশের তুলনায় অনেক কম।

এ ছাড়া হাঁটা, সাইকেল চালানো ও গণপরিবহন ব্যবহারের অভ্যাস জাপানিদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। বয়স্করাও নিয়মিত এসব কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। দলগত ব্যায়াম চর্চাও সেখানে জনপ্রিয়।

জাপানের সার্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসা ও ওষুধের সুযোগ নিশ্চিত করেছে, যা মানুষের আয়ু বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।   

দীর্ঘায়ু কেন নতুন চ্যালেঞ্জ?

বিশ্বের অন্যতম নিম্ন জন্মহারের দেশ জাপান। ২০২৫ সালে দেশটির মোট প্রজনন হার নেমে এসেছে রেকর্ড ১ দশমিক ১৪-এ। অথচ স্থিতিশীল জনসংখ্যা ধরে রাখতে সাধারণত এ হার ২ দশমিক ১ হওয়া প্রয়োজন। এর ফলে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, কিন্তু পেনশন, চিকিৎসা ও বয়স্কদের সেবার প্রয়োজন বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।

জন্মহার বাড়াতে সরকার শিশুভাতা, ভর্তুকিযুক্ত শিশুসেবা, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি এবং বিভিন্ন প্রণোদনা চালু করেছে। তবে এখনো এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি পতনের ধারা বদলাতে পারেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানে কম বয়সিদের মধ্যে বিয়ে কমে যাওয়া, দেরিতে বিয়ে করা, অনিশ্চিত চাকরি, স্থবির মজুরি এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টার কারণে পরিবার গঠন কঠিন হয়ে উঠছে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও গৃহস্থালি ও সন্তান লালনের দায়িত্ব সমানভাবে ভাগ না হওয়ায় অনেক নারীর জন্য কর্মজীবন ও মাতৃত্ব একসঙ্গে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

অর্থনীতিতে প্রভাব

কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমে যাওয়ায় আয়কর ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অবদান রাখা মানুষের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা ও বয়স্কদের পরিচর্যার ব্যয় বাড়ছে। এ কারণে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে এবং তরুণ কর্মীদের ওপর করের বোঝাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শ্রমিক সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে নির্মাণ, কৃষি, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সেবাসহ বিভিন্ন খাতে পড়ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় তরুণরা শহরমুখী হওয়ায় অনেক অঞ্চলে জনশূন্যতা ও সেবার ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।

শুধু জাপান নয়, বাড়ছে বৈশ্বিক বার্ধক্য

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, মানুষের আয়ু বৃদ্ধি মানবজাতির অন্যতম বড় অর্জন। সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবার অগ্রগতির কারণে মৃত্যুহার কমেছে এবং অধিকাংশ মানুষ এখন ৬০ বছরের বেশি বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকার আশা করতে পারেন।

ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক গড় আয়ু দাঁড়িয়েছে ৭৩ দশমিক ৩ বছর, যা ১৯৯৫ সালের তুলনায় ৮ দশমিক ৪ বছর বেশি। ২০২৩ সালের ১১০ কোটি থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১৪০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে।

তবে বার্ধক্যের প্রবণতা সব দেশে সমান নয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জাপানের মধ্যম বয়স ছিল ৪৯ বছর, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। ইতালিতে এ হার ৪৭ দশমিক ৫ বছর, পর্তুগালে ৪৬ দশমিক ২, গ্রিসে ৪৫ দশমিক ৭ এবং জার্মানিতে ৪৫ দশমিক ১ বছর।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম