Logo
Logo
×
   

Advertisement

আন্তর্জাতিক

দেশ থেকে পালিয়েই রুশ গোয়েন্দাদের নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন এই তরুণী

Advertisement

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম

দেশ থেকে পালিয়েই রুশ গোয়েন্দাদের নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন এই তরুণী

রাশিয়ার বিখ্যাত প্রতিবাদী ব্যান্ড ‘পুসি রিওটের’ সাবেক সদস্য ও রুশ শিল্পী রিটা ফ্লোরেস। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

প্রথমে আসে ব্ল্যাকমেল ও প্রাণনাশের হুমকি, তারপর একের পর এক ভয়ংকর সব মিশন। সহকর্মী অ্যাক্টিভিস্টদের ওপর নজরদারি করা, প্রতিবাদী শিল্পীদের ব্যক্তিগত তথ্য জোগাড় করা—আর শেষ পর্যন্ত ক্রেমলিনের এক শত্রুকে অপহরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্রে সহায়তা করা।

রাশিয়ার বিখ্যাত প্রতিবাদী ব্যান্ড ‘পুসি রিওটের’ সাবেক সদস্য ও রুশ শিল্পী রিটা ফ্লোরেস ঠিক এভাবেই নিজের চরম আতঙ্কের দিনগুলোর কথা বলেছেন। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী এফএসবি-এর গোয়েন্দাদের হাতে দীর্ঘ তিন বছর ধরে কীভাবে তিনি ব্যবহৃত হয়েছেন, তা প্রকাশ করেছেন গত মাসে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর।

গত আগস্টের শেষে রাশিয়া ছাড়ার ঠিক পরপরই নিজের আইনজীবী দিমিত্রি জাখভাতভের সঙ্গে এক ভিডিও আলোচনায় সহযোগিতার সমস্ত বিবরণ প্রকাশ করেন ২৯ বয়সি রিটা ফ্লোরেস। তিনি জানান, এফএসবি-এর সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করতে অন্যদের উৎসাহিত করার জন্যই তিনি মুখ খুলেছেন।

দেশ ছাড়ার পর প্রথম কোনো গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রিটা তার এই দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বহু বছর পর আমি আজ স্বস্তি অনুভব করছি। এত দিন শুধু দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার এবং এ বিষয়ে খোলামেলা কথা বলার স্বপ্ন দেখেই দিন কাটিয়েছি।’ অবশ্য রিটা ফ্লোরেসের এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি গার্ডিয়ান। তবে গত কয়েক বছরে রাশিয়ায় বিরোধী দল ও গোষ্ঠীর ভেতরে এফএসবি-এর অনুপ্রবেশের বহু ঘটনা রয়েছে।

যেভাবে শুরু হয়েছিল জিম্মি দশা

মার্গারিটা কোনোভালোভা নামেও পরিচিত রিটা ফ্লোরেস ২০২০ সাল থেকে পুসি রিওটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ক্রেমলিনের কাছে এক পারফরম্যান্সের পর তাকে আটক করা হয়েছিল। এরপর তাকে বেশ কয়েকবার স্বল্প মেয়াদে কারাবাস করতে হয় এবং নজরদারি ও তল্লাশির মুখে পড়তে হয়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পুরোদমে রুশ আগ্রাসনের পর ঘরোয়া দমনপীড়ন আরও তীব্র হলে তার ওপর চাপও বেড়ে যায়।

২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পুলিশের এমন এক তল্লাশির পরই তাকে ব্ল্যাকমেল করে নিয়োগ করা হয়। তল্লাশি শেষে দুই ব্যক্তি সেখানে থেকে যান এবং নিজেদের এফএসবি কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন। ইউক্রেনে রুশ হত্যাকাণ্ডের সমালোচনা করে রিটা ইনস্টাগ্রামে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। যুদ্ধকালীন সেন্সরশিপ আইনে সেই পোস্টের জেরে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। পাশাপাশি, সহযোগিতা না করলে তার মাকে খুন করার হুমকিও দেওয়া হয়।

রিটা বলেন, ‘আমি তাদের বিশ্বাস করেছিলাম। তারা যা বলেছিল, তা করতে পারে বলেই আমার মনে হয়েছিল... আমার ভয় এত বেশি ছিল। নিজের পাশাপাশি পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে আমি ভীষণ আতঙ্কিত ছিলাম।’ সহযোগিতা করার চুক্তিপত্রে সই করার পুরস্কার হিসেবে তাকে এককালীন ৩০ থেকে ৪০ হাজার রুবল দেওয়া হয়েছিল।

‘ভালো পুলিশ, মন্দ পুলিশ’ কৌশল

রিটার প্রথম কাজ ছিল তার পরিচিত বৃত্তের অন্য বিরোধী মনোভাবাপন্ন শিল্পীদের তথ্য সংগ্রহ করে এফএসবিকে দেওয়া। যে দুই কর্মকর্তা তাকে নিয়োগ করেছিলেন, তারাই তার নিয়মিত হ্যান্ডলার হয়ে ওঠেন। তারা ক্লাসিক ‘ভালো পুলিশ, মন্দ পুলিশ’ কৌশল ব্যবহার করতেন।

জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাটি ছিলেন প্রায় চল্লিশোর্ধ্ব এক অমার্জিত ব্যক্তি, যিনি চকচকে কালো স্যুট পরার কারণে রিটাকে তার নাম দিয়েছিলেন ‘দ্য জ্যাকেট’। অন্যদিকে, তরুণ কর্মকর্তা ইভান ছিলেন তার প্রধান হ্যান্ডলার, যিনি প্রায়ই বন্ধুসুলভ ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করতেন এবং সরাসরি হুমকি দেওয়ার কাজটি ছেড়ে দিতেন ‘জ্যাকেট’-এর ওপর।

রিটা স্মরণ করে বলেন, ‘যখনই ইভান ও জ্যাকেট একসঙ্গে আসত, ইভান চুপ থাকত। জ্যাকেট হতো রুক্ষ ও হুমকিস্বরূপ; একজন নারী হিসেবে আমাকে অপমান করত। সে যেন সাক্ষাৎ শয়তান! অথচ এরপর যখন শুধু আমি আর ইভান দেখা করতাম, তখন সে খুব মিষ্টি ও বন্ধুসুলভ আচরণ করত।’

ইভান প্রায়ই বলত, ‘এফএসবি তোমাকে পুনর্শিক্ষিত করবে, আমিও করব। এরপর তোমার জীবন সুন্দর ও শান্তিময় হবে, তুমি রাশিয়াকে ভালোবাসবে, সন্তান জন্ম দেবে এবং একজন অনুগত স্ত্রী হবে।’

পিভোর ভেরজিলভ হত্যা মিশন ও পলায়ন

গত বছরের মে মাসে ইভান ও জ্যাকেট পিভোর ভেরজিলভ সম্পর্কে রিটাকে জেরা করা শুরু করেন। পুসি রিওটের সঙ্গে যুক্ত এই অ্যাক্টিভিস্ট বর্তমানে ইউক্রেনে বাস করছেন এবং রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছেন। গোয়েন্দারা রিটাকে বলেন ভেরজিলভের ইউক্রেনের বাসার ঠিকানা জোগাড় করতে এবং সার্বিয়ায় একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করতে। সেখানে একটি এফএসবি স্কোয়াড তাকে অপহরণ করে হত্যা করবে—এমনটাই ছিল পরিকল্পনা। এই মিশনে সহায়তার জন্য ইভান তাকে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ৫০ হাজার রুবল দিতে শুরু করেন।

তবে এর মধ্যেই পালানোর পরিকল্পনা করতে শুরু করেন রিটা। গত সেপ্টেম্বরে তিনি তার সঙ্গীকে বিয়ে করেন। এই বিয়ের পেছনে একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল সার্বিয়া ট্রিপ থেকে নিজেকে বাঁচানো, যাতে ইভানকে বলা যায় তার স্বামী তাকে অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে দেখা করতে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেবেন না। আইনজীবীর সহায়তায় অবশেষে গত আগস্টের শেষে তিনি সফলভাবে রাশিয়া থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

দেশ ছাড়ার পর সাবেক বিরোধী গোষ্ঠীর একাংশ রিটার এই সাহসিকতাকে সাধুবাদ জানালেও দীর্ঘ সময় ধরে সহযোগিতা করার জন্য কেউ কেউ সন্দেহও প্রকাশ করেছেন। তবে রিটা বলছেন, ভয়ের কাছে মানুষ কীভাবে অসহায় হয়ে পড়ে, তা একমাত্র হাড়েই টের পাওয়া যায়। কারো কোনো ক্ষতি না করেই তিনি শেষ পর্যন্ত এই জাল ভেদ করে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পেরেছেন—এটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় স্বস্তি।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম