মাদকবাহী নৌযানে মার্কিন হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন: জাতিসংঘ
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারের সন্দেহে নৌযান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে এবং তা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের এক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ। খবর আল জাজিরার।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মানবাধিকার ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক বেন সল জানান, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক জলসীমায় ৬৮টি নৌযানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব হামলায় অন্তত ২২৩ জন নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র এসব অভিযানকে ‘নার্কো-সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, ঘোষিত ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে চলমান সশস্ত্র সংঘাতের অংশ হিসেবেই এসব অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
তবে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলাগুলো আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি, জীবনের অধিকারের লঙ্ঘন এবং সম্ভাব্যভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।’
প্রতিবেদন প্রকাশের মাত্র দুই দিন আগে ক্যারিবীয় সাগরে একটি নৌযানে হামলা চালিয়ে চারজনকে হত্যার কথা জানিয়েছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এই অভিযানগুলোর সমালোচনা করে এগুলোকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে আখ্যা দিয়েছে।
পেন্টাগন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার ভিডিও প্রকাশ করলেও নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় বা তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচারের কী প্রমাণ ছিল, সে বিষয়ে খুব কম তথ্য প্রকাশ করেছে।
আত্মরক্ষার অধিকার নেই: জাতিসংঘ
বেন সলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদক পাচারকে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এমন ‘সশস্ত্র হামলা’ হিসেবে গণ্য করা যায় না, যার জবাবে কোনো রাষ্ট্র আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কেবল কোনো রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার ক্ষেত্রেই আত্মরক্ষার যুক্তি প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যেসব গোষ্ঠীকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেমন ভেনেজুয়েলাভিত্তিক ট্রেন দে আরাগুয়া, তারা ভেনেজুয়েলা সরকারের সশস্ত্র প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছে—এমন কোনো বাস্তব ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
এছাড়া প্রাণঘাতী হামলার পরিবর্তে সন্দেহভাজন নৌযানগুলোকে সমুদ্রে আটক করার মতো বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও এ ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবসম্মত বলে স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
‘মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’
প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তি অনুযায়ী কেবল আসন্ন ও গুরুতর হুমকির ক্ষেত্রে শেষ বিকল্প হিসেবে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করা যায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এসব অভিযানে সেই শর্ত পূরণ হয়নি।
এ কারণে হত্যাকাণ্ডগুলোকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে বলে মত দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সংগঠিত রাষ্ট্রীয় নীতির আওতায় নিয়মিত ও ব্যাপকভাবে এসব হামলা পরিচালিত হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হওয়ায় তা মানবতাবিরোধী অপরাধের আইনি সংজ্ঞার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একই সঙ্গে এসব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত, দায়ীদের—রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বসহ—বিচারের আওতায় আনা এবং নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মাদকবিরোধী অভিযানের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন
হামলাগুলোর বৈধতা ছাড়াও এর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে জাতিসংঘ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে কোকেন জব্দের পরিমাণ প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। অধিকাংশ কোকেন বড় কনটেইনার জাহাজে পরিবহন করা হয়, যেগুলো খুব কমই তল্লাশির মুখে পড়ে। অথচ ছোট নৌযানগুলোই হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে অতিমাত্রায় মাদকসেবনে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ফেন্টানিল ও অন্যান্য ওপিওয়েডের বিস্তার ঠেকাতেও এসব হামলা কোনো ভূমিকা রাখছে না, কারণ এসব মাদক সাধারণত ভেনেজুয়েলা থেকে সমুদ্রপথে পাচার করা হয় না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিম্নস্তরের সন্দেহভাজনদের হত্যা করায় মাদক চক্রের মূল নেতৃত্বকে বিচারের আওতায় আনার প্রচেষ্টা দুর্বল হতে পারে। পাশাপাশি ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত এসব সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে, যা প্রমাণভিত্তিক আইন প্রয়োগ, জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে ব্যয় করা যেত বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।

