লেনিন-মার্কসের নামও কি মুছে যাবে কলকাতার মানচিত্র থেকে
Advertisement
কলকাতা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩০ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সুরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের পর এবার কি কলকাতার রাস্তার নামের তালিকা থেকে মুছে যেতে চলেছে লেনিন ও কার্ল মার্কসের নাম? কলকাতা পুরসভায় নতুন দায়িত্ব নিয়ে বসেই সেই জল্পনা আরও বাড়িয়ে দিলেন রাস্তা ও জনপরিসরের নামকরণ পর্যালোচনা কমিটির চেয়ারম্যান স্বামী প্রদীপ্তানন্দ মহারাজ ওরফে কার্তিক মহারাজ।
তার দফতরে ইতিমধ্যে লেনিন সরণি, কার্ল মার্কস সরণি, বিশ্ব বাংলা সরণি এবং পার্ক সার্কাস সেভেন পয়েন্টের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে বলে তিনি জানিয়েছেন। তবে কোনো নাম পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পর শহরের রাস্তা ও জনপরিসরের নামকরণকে কেন্দ্র করে রাজনীতির নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় জানিয়েছিলেন, কলকাতা বা বাংলার কোনো রাস্তা বা এলাকার নাম মুঘল, পাঠান বা অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসকদের নামে রাখার প্রয়োজন নেই। একই সঙ্গে রাস্তা ও এলাকার নাম পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠনের কথাও তিনি জানিয়েছিলেন।
এর পর ১১ সেপ্টেম্বর রাজ্য সরকার ১০ সদস্যের একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। কমিটির চেয়ারম্যান করা হয় কার্তিক মহারাজকে। সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায়, মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত এবং কলকাতা পুরসভার কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে। ইতিহাস, সংস্কৃতি, সমাজ ও ঐতিহ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে নামকরণের প্রস্তাব খতিয়ে দেখার কথা এই কমিটির। তবে কলকাতা পুরসভার ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও নির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও মানতে হবে।
কমিটির কাজ শুরু হওয়ার পরেই আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে কলকাতার বাম আমলের স্মৃতি বহনকারী রাস্তার নামগুলো। লেনিন সরণি আগে ছিল ধর্মতলা স্ট্রিট। ১৯৭০ সালে ভ্লাদিমির লেনিনের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে তার নাম বদলে লেনিন সরণি করা হয়। পরের বছর সার্কুলার গার্ডেন রিচ রোডের নাম হয় কার্ল মার্কস সরণি।
এখন সেই দুই নামও পুনর্বিবেচনার তালিকায়। প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায় লেনিন সরণির পরিবর্তে গণিতজ্ঞ এবং ভারতীয় জনসংঘের প্রাক্তন সভাপতি দেবপ্রসাদ ঘোষের নাম প্রস্তাব করেছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
কার্ল মার্কস সরণির ক্ষেত্রে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বা রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। হো চি মিন সরণির নাম মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নামে করার প্রস্তাবও এসেছে।
এরই মধ্যে কার্তিক মহারাজ জানিয়েছেন, আগামী দিনে কলকাতার বিতর্কিত বা পুরনো নামগুলোর ক্ষেত্রে ভারতীয় মনীষী এবং ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নামকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সাধারণ মানুষ এবং সামাজিক সংগঠনও নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব জমা দিতে পারবেন।
নতুন সরকারের আমলে ইতিমধ্যে একটি বড় নাম পরিবর্তন কার্যকর হয়েছে। পার্ক সার্কাসের সুরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম ২০ জুন বদলে গোপাল মুখার্জি রোড করা হয়। কলকাতা পুরসভার সিদ্ধান্তকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বলে স্বাগত জানান। এই নামবদল নিয়েই অবশ্য বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
তৃণমূলের কুণাল ঘোষের দাবি, রাস্তার পুরনো নামটি ব্রিটিশ ভারতের চিকিৎসক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য স্যার হাসান সুরাবর্দির নামে ছিল, তার ভাইপো হুসেন শহীদ সুরাবর্দির নামে নয়। ফলে ইতিহাসের দুই ব্যক্তিকে এক করে দেখা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। অর্থাৎ কলকাতার রাস্তার নামের এই নতুন পর্ব শুধু পুরনো সাইনবোর্ড বদলের বিষয় নয়।
এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক পরিচয় এবং রাষ্ট্র ও সমাজের স্মৃতিকে কোন ব্যক্তিত্বের নামে প্রকাশ করা হবে, সেই প্রশ্ন। লেনিন ও মার্কসের নাম সত্যিই বদলাবে কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। কমিটি প্রথমে প্রস্তাবগুলো পরীক্ষা করবে এবং পরে সুপারিশ করবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য নির্দিষ্ট প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়াও অনুসরণ করতে হবে।
কলকাতার ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুস্তরীয় ইতিহাসের মধ্যে এখন নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে রাষ্ট্রবাদ, ভারতীয় ঐতিহ্য এবং সনাতনী সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন। এই পরিবর্তনের গতি কোথায় গিয়ে থামে, তার ইঙ্গিত মিলতে পারে দুর্গাপূজার পর কমিটির বৈঠক এবং পরবর্তী সুপারিশে।


