কাশ্মীরে মসজিদে অভিন্ন জুমার খুতবার প্রস্তাব, রাজনৈতিক-ধর্মীয় নেতাদের ক্ষোভ
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতশাসিত কাশ্মীরের মসজিদগুলোতে একই ধরনের জুমার খুতবা চালুর প্রস্তাব ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ উদ্যোগের বিরোধিতা করে স্থানীয় রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতারা অভিযোগ করেছেন, এর মাধ্যমে মুসলিমদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।
জম্মু ও কাশ্মীর ওয়াকফ বোর্ডের প্রধান দর্শন আন্দ্রাবি গেল সপ্তাহে এই প্রস্তাবের কথা জানান। তিনি ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন স্থানীয় নেতা।
বোর্ডের দাবি, মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় অভিন্ন খুতবা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আন্দ্রাবি জানিয়েছেন, ধর্মীয় আলেমদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটি খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করবে এবং এতে সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা থাকবে না।
রোববার কাশ্মীরের প্রায় দেড় হাজার আলেম ও ধর্মীয় বক্তাকে নিয়ে বৈঠক করে ওয়াকফ বোর্ড। এতে অংশ নেওয়া এক আলেম আল জাজিরাকে জানান, কমিটির অনুমোদিত খুতবাই মসজিদগুলোতে পাঠ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে কমিটিতে কারা থাকবেন, তা স্পষ্ট করা হয়নি। প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি জানালে তাদের বক্তব্য গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন ওই আলেম।
কাশ্মীরের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নাঈম আখতার বলেন, মসজিদে কী বিষয়ে খুতবা দেওয়া হবে, তা নির্ধারণের অধিকার ধর্মীয় নেতাদের। তার মতে, ওয়াকফ বোর্ডের দায়িত্ব মূলত ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত; ধর্মীয় বক্তাদের কাজের ধরন নির্ধারণ করা তাদের এখতিয়ারের বাইরে।
অঞ্চলটির প্রধান মুসলিম ধর্মীয় নেতা মিরওয়াইজ উমর ফারুকও প্রস্তাবটিকে সরাসরি ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার নেতৃত্বাধীন ধর্মীয় সংগঠনগুলোর যৌথ মঞ্চ মুত্তাহিদা মাজলিস-ই-ওলামা বলেছে, খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণের দায়িত্ব ইসলামি আলেমদের, প্রশাসনিক সংস্থার নয়। কাশ্মীরের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সমালোচনার মুখে আন্দ্রাবি পরে তার বক্তব্য থেকে সরে এসে বলেন, সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করবেন কি না, তা স্বাধীন আলেম ও ধর্মীয় বক্তাদের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আত্মহত্যা, মানসিক চাপ ও মাদকাসক্তির মতো বিষয়গুলো আলোচনায় রাখার কথাও জানান তিনি।
২০১৯ সালে ভারত কাশ্মীরের বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা বাতিল করে অঞ্চলটিকে কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে আনে। এরপর ওয়াকফ ব্যবস্থাপনাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে কেন্দ্রীয় আইনের প্রভাব বেড়েছে। স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, এর ফলে কাশ্মীরিদের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় রীতিনীতি ও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এর আগেও মসজিদগুলোর ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিবদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের জন্য পুলিশের একটি ফরম বিতরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এ ছাড়া শ্রীনগরের ঐতিহাসিক জামিয়া মসজিদে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনাও সমালোচিত হয়েছে।
কাশ্মীরের রাজনৈতিক বিশ্লেষক নূর আহমদ বাবা মনে করেন, অঞ্চলটিতে ধর্ম দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই প্রচলিত ধর্মীয় ব্যবস্থায় পরিবর্তনের উদ্যোগ মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও ক্ষোভ সৃষ্টি করে। সমালোচকদের মতে, অভিন্ন খুতবা চালুর প্রস্তাবকে কাশ্মীরের মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও পরিচয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর উদ্বেগের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, সামাজিক সমস্যা মোকাবিলাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
সূত্র: আলজাজিরা

