দ্য হিন্দু’র প্রতিবেদন
যন্তর মন্তর যেভাবে হয়ে উঠল আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন ও রাজপথের আন্দোলনের প্রতীক যন্তর মন্তরকে আর বিক্ষোভের স্থান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। সম্প্রতি দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে দিল্লি পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে যন্তর মন্তর থেকে প্রতিবাদের তকমা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছে। এখন থেকে বড় ধরনের গণজমায়েত ও বিক্ষোভের জন্য বিকল্প স্থান হিসেবে রামলীলা ময়দান, বুরারি গ্রাউন্ড এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি গ্রাউন্ডকে নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক পটভূমি থেকে দেখা যায়, ১৭২৪ সালের দিকে জয়পুরের মহারাজা সাওয়াই দ্বিতীয় জয় সিংহ মোগল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের নির্দেশে এই জ্যোতির্বিজ্ঞান কেন্দ্রটি নির্মাণ করেছিলেন। প্রাচীনকালে খালি চোখে নক্ষত্র ও গ্রহের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য এটি তৈরি করা হয়। ইট ও সুরকি দিয়ে তৈরি এই চত্বরে সম্রাট যন্ত্র, রাম যন্ত্র, জয় প্রকাশ যন্ত্র ও মিশ্র যন্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগুলো ছিল, যা মূলত সময় ও গ্রহের অবস্থান নির্ণয়ে ব্যবহৃত হতো।
পরবর্তী সময়ে ভারতীয় রাজনীতির মানচিত্রে যন্তর মন্তর এক অনন্য স্থান করে নেয়। আগে ইন্ডিয়া গেটের বোট ক্লাব কিংবা রামলীলা ময়দানে বড় বড় রাজ রাজনৈতিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতো। তবে সংসদ ভবনের ৩ কিলোমিটারের কম দূরত্বে অবস্থিত হওয়ায় এটি ধীরে ধীরে নাগরিক ও বিভিন্ন সংগঠনের কাছে নিজেদের দাবি আদায়ের অন্যতম প্রধান মঞ্চ হয়ে ওঠে। কড়া নিরাপত্তার কারণে সংসদ ঘেরাও অসম্ভব হলে যন্তর মন্তরকেই প্রতিকী পথ হিসেবে বেছে নেওয়া হতো, যেখানে সংসদ চলাকালীন জনপ্রতিনিধিরাও এসে আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলতে পারতেন।
ভারতের আধুনিক ইতিহাসের বহু বড় বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের নীরব সাক্ষী এই স্থানটি। ২০১১ সালে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের নেতা আন্না হাজারে এই যন্তর মন্তরেই ঐতিহাসিক অনশন শুরু করেছিলেন, যা তৎকালীন সরকার ও দুর্নীতি দমন আইন পাসে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ২০১২ সালের আলোচিত ‘নির্ভয়া’ ঘটনার পর হাজার হাজার ক্ষুব্ধ মানুষ এই স্থানেই জমায়েত হয়ে কঠোর আইনের দাবি জানিয়েছিলেন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে নতুন নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) ও এনআরসি বিরোধী বিক্ষোভের সময় বহু মানুষকে এই চত্বরেই একত্রিত হতে দেখা যায়।
সাম্প্রতিক ইতিহাসেও এর প্রভাব বজায় ছিল। ২০২৩ সালের জানুয়ারি ও এপ্রিলে কুস্তি ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কুস্তিগির ভিনেশ ফোগাট, সাক্ষী মালিক ও বাজরং পুনিয়ারা দীর্ঘদিন এখানে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এমনকি ২০২৬ সালের মাঝামাঝিতে নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভ এবং পরবর্তীতে পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশনও এই যন্তর মন্তরেই অনুষ্ঠিত হয়, যা ব্যাপক জনমত তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। দীর্ঘসময় ধরে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হওয়া ঐতিহাসিক এই স্থানটি এখন থেকে ফের কেবল তার প্রাচীন স্থাপত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের জন্যই পরিচিতি পাবে।

