পিএইচপির এক ত্রুটিতেই বিশ্বজুড়ে অনলাইন সেবায় বিপর্যয়, ঝুঁকিতে কোটি সার্ভার
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৫ এএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার একটি সাইবার নিরাপত্তা ত্রুটি। ঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে নিরাপত্তা হালনাগাদ করছে। গবেষকদের আশঙ্কা, এখনো বহু ওয়েবসাইট ও সার্ভার এ ত্রুটির কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইটে পিএইচপি ব্যবহৃত হয়। ওয়েবসাইটের সার্ভার থেকে তথ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ এবং ব্যবহারকারীর সামনে ওয়েবপেজ প্রদর্শনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই প্রোগ্রামিং ভাষা।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্রুটিটি কাজে লাগাতে পারলে অপরাধীরা ওয়েবসাইটের চেহারা পরিবর্তন, তথ্য চুরি এবং ক্ষতিকর সফটওয়্যার প্রবেশ করানোর চেষ্টা করতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এ ত্রুটির সুযোগ নিয়ে সফলভাবে তথ্য চুরি বা সিস্টেমে অনুপ্রবেশের নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসে ব্যারোনেস লয়েড অব এফরা জানিয়েছেন, পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে দেশটির ৩২টি সরকারি সেবা বন্ধ ছিল এবং আরও চারটি সেবা আংশিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে। তবে জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বড় কোনো সেবা এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলে জানানো হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে নিরাপত্তা ত্রুটির ঝুঁকিতে থাকা সার্ভারের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। সাইবার নিরাপত্তা গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ত্রুটি সংশোধনের নিরাপত্তা প্যাচ প্রয়োগের হার স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় ৩ দশমিক ১০ শতাংশ থাকলেও বিকেল সাড়ে ৩টায় তা বেড়ে ৫ দশমিক ৩৪ শতাংশে পৌঁছায়।
বিশ্বব্যাপী প্যাচ প্রয়োগের হার ছিল ৪ দশমিক ২১ শতাংশ। ফলে দ্রুত হালনাগাদের উদ্যোগ চললেও বিপুলসংখ্যক ওয়েবসাইট ও সার্ভার তখনো ঝুঁকিতে ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা ত্রুটির প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান ও অনলাইন সেবায়। এরমধ্যে জাপানের বিমান সংস্থা এএনএ, আসাহি গ্রুপ হোল্ডিংস এবং টোকিও মেরিন হোল্ডিংস সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কিছু ওয়েবসাইট ও সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় আইটি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ভ্যালটোরি কিছু ওয়েবসাইট বন্ধ করে নিরাপত্তা হালনাগাদের কাজ শুরু করেছে।
ফ্রান্সের টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান অরেঞ্জ নিরাপত্তা প্যাচ প্রয়োগের সময় বিশ্বব্যাপী কিছু সেবায় প্রবেশ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।
চীনের ক্লাউড সেবা প্রদানকারী টেনসেন্ট ক্লাউড গ্রাহকদের পিএইচপির হালনাগাদ সংস্করণ ইনস্টল করার পরামর্শ দিয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি সব ওয়েবসাইট বন্ধ করার আহ্বান জানায়নি।
জার্মানির সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কোনো আইটি ব্যবস্থা সফলভাবে আক্রান্ত হওয়ার খবর তারা পায়নি। সতর্কতামূলকভাবে বন্ধ রাখা সরকারি ওয়েবসাইটগুলোর অধিকাংশই পরে আবার সচল হয়েছে। তবে সফল সাইবার হামলার আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলেও সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হায়া শুলমান এ ঘটনাকে গত দুই বছরের অন্যতম গুরুতর নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণযোগ্য হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অগ্রগতির ফলে প্রযুক্তিগত দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে হামলা চালানো আগের তুলনায় সহজ হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
শুলমানের মতে, নিরাপত্তা ত্রুটি সংশোধনের প্যাচ তৈরির পাশাপাশি তা দ্রুত প্রয়োগের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ করতে পারলেও ছোট ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কাজটি তুলনামূলক কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ, অনেক ছোট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তথ্যপ্রযুক্তি দল নেই। ফলে বাইরের আইটি সেবা প্রদানকারীদের সহায়তার জন্য তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
এরই মধ্যে নিরাপত্তা সমস্যার কারণে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যাটফর্ম এবং কম্পিউটার গেমের লগইন সেবায়ও বিঘ্নের খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, অনলাইন কোর্স, পাঠ্যসামগ্রী ও অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে না পেরে তারা সমস্যায় পড়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবা সচল রাখার পাশাপাশি নিরাপত্তা ত্রুটি দ্রুত সংশোধন করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। যদিও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের তথ্য ফাঁসের নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবু ঝুঁকি এড়াতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত নিরাপত্তা প্যাচ প্রয়োগ এবং নিজেদের সার্ভার পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

-6ada4ec5e0bb6.jpg)