ডোকলাম ঘিরে চীনের তৎপরতা, ‘চিকেনস নেক’ নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারত
Advertisement
কলকাতা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভুটানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ মেটাতে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে চীন। তবে এই আলোচনার সম্ভাব্য ফল নিয়ে কৌশলগত উদ্বেগ রয়েছে ভারতের। বিশেষ করে ডোকলাম মালভূমিকে ঘিরে কোনো সমঝোতা হলে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তায় কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে সতর্ক নয়াদিল্লি।
চীন ও ভুটানের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে ১৬তম বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৩ থেকে ১৫ অক্টোবর ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে। বৈঠক শেষে দুই দেশ জানিয়েছে, সীমান্ত আলোচনা এগিয়ে নিতে ২০২১ সালে সম্মত হওয়া তিন ধাপের রূপরেখা বাস্তবায়নে তারা কাজ চালিয়ে যাবে। পাশাপাশি সীমান্ত নির্ধারণ ও চিহ্নিতকরণ নিয়ে যৌথ কারিগরি দলের চতুর্থ বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তবে বৈঠকে ডোকলাম নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে— এমন ঘোষণা দেয়নি দুই দেশ। ফলে সীমান্ত আলোচনা এগোলেও বিরোধপূর্ণ এলাকাগুলোর ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।
কেন ডোকলাম নিয়ে ভারতের উদ্বেগ?
ডোকলাম ভুটান ও চীনের মধ্যে বিরোধপূর্ণ একটি মালভূমি। এর অবস্থান ভারত, চীন ও ভুটানের সীমান্তসংযোগস্থলের কাছাকাছি। ২০১৭ সালে ডোকলাম এলাকায় চীনের সড়ক নির্মাণের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে ৭৩ দিন ধরে অচলাবস্থা চলেছিল। পরে দুই পক্ষের সেনারা ওই অবস্থান থেকে সরে যায়।
ভারতের উদ্বেগের মূল কারণ ডোকলামের ভৌগোলিক অবস্থান। এর কাছেই রয়েছে শিলিগুড়ি করিডর, যা ‘চিকেনস নেক’ নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গের এই সরু ভূখণ্ড ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দেশের অন্যান্য অংশের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, করিডরটির সবচেয়ে সরু অংশ প্রায় ২০ মাইল প্রশস্ত। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ডোকলাম এলাকায় নিয়ন্ত্রণ বা সামরিক অবস্থানের পরিবর্তন ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
সীমান্ত সমঝোতায় কী নিয়ে আলোচনা?
চীন ও ভুটানের মধ্যে উত্তর, মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি এলাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। অতীতের আলোচনায় উত্তর ভুটানের কিছু এলাকার বিনিময়ে পশ্চিমাঞ্চলের ডোকলামসংলগ্ন এলাকায় সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের কোনো ভূখণ্ড বিনিময় হলে তা ভারতের জন্য কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। কারণ, ডোকলাম এলাকায় চীনের অবস্থান শক্তিশালী হলে শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি নজরদারি ও সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ বাড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা। তবে অতীতের প্রস্তাব বা বিশ্লেষণকে বর্তমানের চূড়ান্ত সমঝোতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
২০২০ সালে চীন পূর্ব ভুটানের সাকতেং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য নিয়েও দাবি তুলেছিল। এ ঘটনায় ভুটান প্রতিবাদ জানায়। সাকতেং নিয়ে বিরোধ এবং ডোকলামের অবস্থান— দুটিই চীন-ভুটান সীমান্ত আলোচনাকে ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
‘চিকেনস নেক’ কেন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
শিলিগুড়ি করিডর ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সড়ক ও রেল যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ। এই পথ ব্যাহত হলে সেনা ও সরঞ্জাম পরিবহন, পণ্য সরবরাহ এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
এ কারণে ডোকলাম এলাকায় চীনের অবকাঠামো নির্মাণ বা সামরিক অবস্থানের সম্ভাব্য পরিবর্তনকে ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন। তবে চীন-ভুটান আলোচনার অগ্রগতি মানেই শিলিগুড়ি করিডরের ওপর তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি হয়েছে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য নেই।
ভারত-চীন সম্পর্কেও পড়তে পারে প্রভাব
চীন ও ভুটানের মধ্যে সীমান্ত সমঝোতা হলে তা শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই প্রভাব ফেলবে না; এর কৌশলগত প্রভাব ভারত-চীন সম্পর্কেও পড়তে পারে। বিশেষ করে ডোকলাম নিয়ে কোনো পরিবর্তন হলে তা সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের হিসাবকে নতুন করে সামনে আনতে পারে।
অন্যদিকে, ভুটান নিজের সীমান্ত বিরোধের সমাধান করতে চীনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে আলোচনার অগ্রগতির কথা বলা হলেও ডোকলাম নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।

-6ae2e7d70a5eb.jpg)