বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দৃশ্য দেখে চোখে পানি এসেছিল সোনিয়ার
কলকাতা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:২৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতের রাজনীতির দুই বিতর্কিত অধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং জরুরি অবস্থা নিয়ে নিজের স্মৃতিকথায় গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধী। ১৯৯২ সালে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দৃশ্য টেলিভিশনে দেখে তাঁর চোখে পানি চলে এসেছিল। তাঁর মনে হয়েছিল, মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর স্বপ্নের ধর্মনিরপেক্ষ ভারত রক্ষায় এবার দীর্ঘ লড়াই করতে হবে।
অন্যদিকে, ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্তকে ভুল বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ছেলে সঞ্জয় গান্ধীর প্রভাব ছিল বলেও দাবি করেছেন সোনিয়া। সোনিয়ার স্মৃতিকথার নাম ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’। আগামী ১০ নভেম্বর বইটি প্রকাশের কথা রয়েছে। প্রকাশের আগেই বইটির নির্বাচিত অংশ সামনে এসেছে। সেখানেই ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন রাজীব গান্ধীর স্ত্রী।
অযোধ্যার ঘটনা প্রসঙ্গে সোনিয়া লিখেছেন, উত্তর ভারতে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের এক উত্তাল সময়ে বাবরি মসজিদকে ঘিরে বিতর্ক ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছিল। মসজিদটি একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের ওপর নির্মিত হয়েছিল বলে দাবি উঠেছিল। কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন, দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। এর পর ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে আন্দোলনের সমর্থকেরা, যাদের মধ্যে বিজেপির নেতারাও ছিলেন, মসজিদটি ভেঙে ফেলেন। সেই দৃশ্য টেলিভিশনে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন বলে স্মৃতিচারণ করেছেন সোনিয়া।
তার উপলব্ধি হয়েছিল, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র রক্ষার লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে বিজেপি এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থানের পেছনে কংগ্রেসের ব্যর্থতাও স্বীকার করেছেন তিনি। সোনিয়ার ভাষায়, অনেক ক্ষেত্রেই কংগ্রেস অতিরিক্ত আত্মতুষ্টিতে ভুগেছে এবং দলের মনোভাবে এক ধরনের শিথিলতা ছিল।
জরুরি অবস্থা নিয়েও স্মৃতিকথায় খোলামেলা মন্তব্য করেছেন সোনিয়া। ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। সোনিয়ার মতে, এটি ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। পরবর্তী সময়ে ইন্দিরা নিজেও যে এ সিদ্ধান্তের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন, তেমন ধারণার কথাও লিখেছেন তিনি।
সোনিয়ার দাবি, জরুরি অবস্থা জারির প্রশ্নে গান্ধী পরিবারের মধ্যেও মতবিরোধ ছিল। তার স্বামী রাজীব গান্ধী মাকে পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইন্দিরার ছোট ছেলে সঞ্জয় গান্ধী জরুরি অবস্থা জারির পক্ষে ছিলেন। সরকারের কোনো সাংবিধানিক বা মন্ত্রিসভার পদে না থেকেও সে সময় ইন্দিরার ওপর সঞ্জয়ের ব্যাপক প্রভাব ছিল।
সোনিয়া লিখেছেন, এক পারিবারিক নৈশভোজের সময় সঞ্জয় তার মাকে বিরোধীদের থামানোর জন্য জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দিয়েছিলেন। রাজীব এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার চেষ্টা করলেও ইন্দিরা তার কথা শুনতে চাননি।
সোনিয়ার মতে, সঞ্জয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলে জরুরি অবস্থার পর যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তার অনেকটাই এড়ানো যেত। স্মৃতিকথায় সোনিয়ার এই বক্তব্য ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেসের অতীত, গান্ধী পরিবারের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
ব্যক্তিগত স্মৃতির পাশাপাশি ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোও যে তার লেখায় জায়গা পেয়েছে, প্রকাশিত অংশগুলোতে তারই ইঙ্গিত মিলছে।
