তেহরানের যে কুখ্যাত কারাগারে বন্দি ছিলেন খামেনি
Advertisement
জেসমিন ফেরদৌস
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৫, ০২:০১ পিএম
জাদুঘরে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মোমের মূর্তি। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ১৯৮৯ সাল থেকে দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বর্তমানে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। সম্প্রতি ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে তাকে হত্যার হুমকি দেয় তেলআবিব ও ওয়াশিংটন।
তবে ক্ষমতায় আসা ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী নেতা হওয়াটা খামেনির পক্ষে এতোটা সহজ ছিল না। তার শুরুর জীবনটা ছিল কষ্টে ভরা। দীর্ঘ আট মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল তাকে। এই সময়টিকে তিনি তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় বলে বর্ণনা করেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের আগে শাহ রেজা পাহলভির শাসনামলে যে কারাগারটিতে তাকে বন্দি করা হয়েছিল, তা এখন এব্রাত জাদুঘর নামে পরিচিত।
তেহরানের একসময়ের কুখ্যাত কারাগার এব্রাত জাদুঘর কেবল তার নৃশংস ইতিহাসের জন্যই নয়, বরং এখানে অনেক বিশিষ্ট রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বন্দি ছিল বলেও পরিচিত।
কারাগারে খামেনির সময়কাল
পাহলভি শাসনের বিরুদ্ধে ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে ১৯৬০ এবং ১৯৭০ এর দশকে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে
একাধিকবার গ্রেফতার করা হয়। এই সময়ে পাহলভির গোপন পুলিশ বাহিনী ‘সাভাক’ খামেনির ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালায়। তাকে এব্রাত জাদুঘরে সে সময়ের ‘জয়েন্ট কমিটি অ্যাগেইনস্ট সাবোটেজ’ কারাগারে ছয়বার বন্দি করে রাখা হয়।

জাদুঘরের একটি সংকীর্ণ করিডোরে সাবে বন্দিদের ছবি রযেছে, যার মধ্যে বাদামী ফ্রেমে আয়াতুল্লাহ খামেনির একটি ছবিও রয়েছে। তার নামের নীচে ফার্সি ভাষায় লেখা, আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি।
জাদুঘরটিতে একটি ছোট, আবছা আলোকিত কক্ষও রয়েছে, যেখানে খামেনিকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। সেই কক্ষে কালো পাগড়ি, গোলাকার চশমা এবং বাদামী পোশাক পরা খামেনির একটি মোমের মূর্তি রয়েছে, যার তার কষ্ট ও সংকল্পের প্রতীক।
খামেনিকে গ্রেফতার ও নির্যাতন
১৯৬২ সালে খামেনি শাহের যুক্তরাষ্ট্রপন্থি ও ইসলাম-বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে কোমে ইমাম খোমেনির নেতৃত্বে বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দেন। তিনি মাশহাদের আয়াতুল্লাহ মিলানি এবং অন্যান্য ধর্মগুরুদের কাছে ইমাম খোমেনির বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৩ সালে, তিনি প্রথমবারের মতো বিরজান্দে গ্রেফতার হন এবং এক রাত কারাগারে থাকেন।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে, খামেনি মাশহাদের তিনটি ভিন্ন মসজিদে কুরআন এবং ইসলামী আদর্শের ওপর ক্লাস নেন। তার বক্তৃতা, বিশেষ করে ইমাম আলীর নাহজ আল-বালাগার ওপর হাজার হাজার যুবক এবং ছাত্রকে আকৃষ্ট করেছিল। এর ফলে ১৯৭৫ সালে মাশহাদে তার বাড়িতে অভিযান চালানো হয়।

ষষ্ঠবারের মতো তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তার বই ও নোট বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। এবার, তাকে তেহরানের কুখ্যাত ‘পুলিশ-সাভাক যৌথ কারাগার’ (বর্তমানে ইব্রাত জাদুঘর) এ কয়েক মাস ধরে আটক করে রাখা হয়।
ইসলামী বিপ্লবে খামেনির অবদান
খামেনির বিপ্লবী কর্মকাণ্ড শুরু হয় ১৯৬০-এর দশকে যখন তিনি ইমাম খোমেনির শিষ্য হন। তিনি শাহের শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর যখন শাহের শাসনের পতন ঘটে এবং খোমেনি প্যারিস থেকে তেহরানে ফিরে আসেন তখন খামেনির ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পদমর্যাদা বৃদ্ধি পায়। তাকে উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত করা হয় এবং তেহরানে জুম্মার নামাজের ইমাম হন তিনি, এই পদে এখনও অধিষ্ঠ তিনি। এরপর ১৯৮৯ সালে, তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন।
জাদুঘরে খামেনির স্মৃতি
এব্রাত জাদুঘরে খামেনির ছবি এবং মোমের মূর্তি রয়েছে, যা শাহের শাসনামলে তার বিপ্লবী সংগ্রাম এবং কষ্টের প্রতিফলন। জাদুঘরের এক কর্মকর্তার মতে, ‘আল্লাহ খামেনিকে জাতির নেতা হিসেব নির্ধারিত করেছিলেন।’
এব্রাত জাদুঘরের ইতিহাস
এব্রাত জাদুঘর ভবনটি ১৯৩২ সালে নির্মিত হয়েছিল। রেজা শাহ পাহলভির নির্দেশে জার্মান প্রকৌশলীরা এটি নির্মাণ করেন। ইরানের প্রথম আধুনিক কারাগার হিসেবে এটির নকশা করা হয়, যা প্রাথমিকভাবে নাজিমিয়া কমপ্লেক্সের অংশ ছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে এটি দেশের প্রথম নারী কারাগার হয়ে ওঠে। তবে, এর সবচেয়ে কুখ্যাত ব্যবহার ছিল ১৯৬০ এবং ১৯৭০ এর দশকে মোহাম্মদ রেজা পাহলভির (দ্বিতীয় পাহলভি) রাজত্বকালে। সেসময় এটি ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলনের বিরোধীদের আটক ও নির্যাতন করার জন্য ব্যবহৃত হত। এই সময়কালে, কারাগারটি সাভাকের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর কারাগারটির নামকরণ করা হয় ‘তোহিদ কারাগার’ এবং ২০০০ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। পরে মানবাধিকার সংস্থার তদন্তের পর এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০০২ সালে, ইরানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংস্থা এটিকে একটি জাদুঘরে রূপান্তরিত করে, যা এখন দর্শনার্থীদের সেই যুগের বর্বরতা এবং নিপীড়নের গল্প বলে।
হিজাব পরিধান ও কারাগারে নিক্ষেপ
শুধু আয়াতুল্লাহ খামেনিই নন; হাজার হাজার পণ্ডিত, নেতা এবং ইসলামের অনুসারীদের এই কারাগারে বন্দী করা হয়েছিল। সে সময় যেসব নারী মাথা ঢেকে রাখতেন অর্থাৎ হিজাব পরতেন, তাদেরকেও বন্দি করা হতো। বর্তমানে ইরানের অনেক নারী হিজাব ছাড়া থাকতে চাইলেও, সে সময় মাথা ঢেকে রাখা ছিল অপরাধ। আর সেই অপরাধে দুষ্ট অনেক নারীকেও শাহ রেজা পাহলভি এই কারাগারে বন্দি করে রেখেছিলেন। তাদের সেই ছবি আজও প্রদর্শিত হয় জাদুঘরে।
যেভাবে পরিদর্শন করবেন এব্রাত জাদুঘর
এব্রাত জাদুঘরটি তেহরানের ইয়ারজানি স্ট্রিটের ইমাম খোমেনি স্কোয়ারে অবস্থিত। এটি সপ্তাহে সাতদিনই খোলা থাকে। এখানে প্রবেশের জন্য টিকেট প্রয়োজন। জাদুঘরে ভেতরে ঘোরার জন্য ইংরেজিভাষী ট্যুর গাইড রয়েছে। এই ট্যুরে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা ও সাবেক বন্দিদের গল্প অন্তর্ভুক্ত থাকে।
সূত্র: এনডিটিভি
