মসজিদে নববীতে নবীজির (সা.) স্মৃতিবিজড়িত ৮টি স্তম্ভের অজানা তথ্য
মো. কবির হোসাইন
প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৬ পিএম
মসজিদে নববীর কয়েকটি উস্তুওয়ানাহ। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মসজিদে নববী—এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি নবুয়তের ইতিহাসের একটি লাইভ আর্কাইভ। স্থাপনাগুলো ইবাদত, অশ্রু, তওবা আর ওহির জীবন্ত স্মৃতি। এখানে প্রবেশ করলেই বোঝা যায়— ইট–পাথরের চেয়ে স্মৃতির ওজন বেশি। এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর জীবনচর্চার নীরব সাক্ষী।
অনেকেই জানেন না— মসজিদে নববীর সম্মুখ অংশে কিছু নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক স্তম্ভ (উস্তুওয়ানাহ) রয়েছে, যেগুলোর অবস্থান ঠিক সেই জায়গাতেই— যেখানে নবী (সা.)–এর যুগে যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছিল। স্তম্ভগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয় পাথরের কারণে— গুরুত্বপূর্ণ হলো এগুলো কী দেখেছে, কী বহন করেছে।
চলুন, সংক্ষেপে জেনে নিই— মসজিদে নববীর সেই ৮টি ঐতিহাসিক স্তম্ভ সম্পর্কে—
১️. উস্তুওয়ানাহ হান্নানাহ (কান্নার স্তম্ভ)
এটি উস্তুওয়ানাহ মুখাল্লাক নামেও পরিচিত। এই স্থানেই নবী (সা.) সালাত আদায় করতেন। একসময় এখানে ছিল একটি খেজুর গাছ— যেটিতে ভর দিয়েই তিনি খুতবা দিতেন।
মিম্বর স্থাপনের পর, যেদিন তিনি আর গাছটিতে ভর দিলেন না— মসজিদজুড়ে শিশুর কান্নার মতো শব্দে গাছটি কেঁদে উঠেছিল। নবী (সা.) নিজ হাতে সেটিকে শান্ত করেন এবং বলেন— তিনি তা না করলে, কিয়ামত পর্যন্ত গাছটি কাঁদতেই থাকত। পরবর্তীতে গাছটি শুকিয়ে গেলে, তাকে সম্মানের সঙ্গে দাফন করা হয়।
২️. উস্তুওয়ানাহ সারীর (বিশ্রামের স্থান)
‘সারীর’ অর্থ— শোবার স্থান। ইতিকাফের সময় নবী (সা.) এখানে বিশ্রাম নিতেন। এখানে তার জন্য কাঠের একটি ছোট মাচা রাখা হতো। ইবাদতের মাঝেও পরিমিত বিশ্রাম— এটিও সুন্নাহ।
৩️. উস্তুওয়ানাহ তাওবা
উস্তুওয়ানাহ আবু লুবাবাহ (রা.) তওবার এক জীবন্ত কেস স্টাডি। এক অনিচ্ছাকৃত ভুলের পর সাহাবি আবু লুবাবাহ (রা.) নিজেকে এখানকার একটি খেজুর গাছের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে বলেন— ‘আল্লাহ আমার তওবা কবুল না করা পর্যন্ত আমি নিজেকে মুক্ত করব না।’ দিনের পর দিন—ক্ষুধা, দুর্বলতা, কষ্ট। অবশেষে তাহাজ্জুদের সময়
ওহির মাধ্যমে তার তওবা কবুল হয়। ফজরের পর নবী (সা.) নিজ হাতে তাকে মুক্ত করেন।
৪️. উস্তুওয়ানাহ আয়েশা (রা.)
উস্তুওয়ানাহ কুরআহ। এই স্থানে নবী (সা.) সালাত আদায় করতেন, তারপর হান্নানাহ স্তম্ভের দিকে যেতেন। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন—
মসজিদে এমন একটি স্থান আছে, যার ফজিলত মানুষ জানলে সেখানে নামাজ পড়তে কুর‘আ (লটারি) করতে হতো। এই স্তম্ভের অবস্থান তিনিই দেখিয়ে দেন। হজরত আবু বকর ও ওমর (রা.) এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন।
৫️. উস্তুওয়ানাহ আলী (রা.)
উস্তুওয়ানাহ মাহরাস। ‘মাহরাস’ অর্থ— পাহারা। এই স্থানে সাহাবারা নবী (সা.)–এর নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করতেন। হজরত আলী (রা.) এই দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি পালন করেন। নবী (সা.) হজরত আয়েশা (রা.)–এর ঘর থেকে বের হলে এই স্তম্ভের পাশ দিয়েই যেতেন।
৬️. উস্তুওয়ানাহ উফূদ
‘উফূদ’ অর্থ—প্রতিনিধি দল। বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধি দল এখানেই বসত। রাসুলুল্লাহ (সা.) এখানেই তাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন— ইসলামের দাওয়াত দিতেন, প্রশ্নের উত্তর দিতেন। ইসলামের বহু কৌশলগত সংলাপ এই স্থানেই সংঘটিত হয়েছে।
৭️. উস্তুওয়ানাহ জিবরাঈল (আ.)
এই পথ দিয়েই হজরত জিবরিল (আ.) নিয়মিত নবী (সা.)–এর কাছে আসতেন। বর্তমানে এটি রওজা শরিফের ভেতরে হওয়ায় দৃশ্যমান নয়, তবে এর ঐতিহাসিক অবস্থান সুপ্রতিষ্ঠিত ও গ্রহণযোগ্য।
৮️. উস্তুওয়ানাহ তাহাজ্জুদ
রাত গভীর হলে, সবাই চলে গেলে— এই স্থানে চাটাই বিছিয়ে নবী (সা.) তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতেন। বর্তমানে এটি একটি বুকশেলফ দিয়ে আচ্ছাদিত, তবে পুরোনো নথি ও ছবিতে এর অবস্থান স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।
মসজিদে নববী হলো নবুয়তের জীবন্ত মানচিত্র। আপনি যখনসেখানে যাবেন— শুধু ছবি তুলবেন না। একটু থেমে থাকবেন। নীরবে শুনবেন। স্তম্ভগুলো কথা বলে— শুধু শোনার মতো মন দরকার। আল্লাহ তাআলা আমাদের উপলব্দি করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: পরিচালক, তাকওয়া হজ্জ গ্রুপ।


