Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

স্বাস্থ্য বীমা কি হালাল, ইসলাম কী বলে?

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৩৯ পিএম

স্বাস্থ্য বীমা কি হালাল, ইসলাম কী বলে?

ইসলামে স্বাস্থ্য বীমা। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

মানুষের জীবন ও সুস্থতা আল্লাহ তাআলার বড় নিয়ামত। হঠাৎ অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ মানুষের জন্য বড় পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক সময়ে এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বীমা একটি বহুল ব্যবহৃত ব্যবস্থা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—স্বাস্থ্য বীমা কি শরিয়তসম্মত? ইসলাম এ বিষয়ে কী বলে?

ইসলামে জীবন ও চিকিৎসার গুরুত্ব

নিজের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া শরিয়তের নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা মানবজীবন রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করেছেন—

وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ

‘নিজেদের ধ্বংসের দিকে তোমরা নিজেদের নিক্ষেপ করো না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৯৫)

চিকিৎসা গ্রহণের বিষয়ে হাদিসের নির্দেশনা

রাসুলুল্লাহ (সা.) সুস্পষ্টভাবে চিকিৎসা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন—

تَدَاوَوْا عِبَادَ اللَّهِ، فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءً

‘হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার চিকিৎসা তিনি সৃষ্টি করেননি।’ (আবু দাউদ ৩৮৫৫, তিরমিজি ২০৩৮)

স্বাস্থ্য বীমার ধারণা

স্বাস্থ্য বীমা মূলত এমন একটি চুক্তি, যেখানে—

> নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ জমা দেওয়া হয়

> অসুস্থতার সময় চিকিৎসা ব্যয় বীমা প্রতিষ্ঠান বহন করে

এখানে প্রশ্ন ওঠে—এতে কি সুদ (রিবা), অনিশ্চয়তা (গারার) বা জুয়া (মাইসির) আছে কি না?

প্রচলিত বাণিজ্যিক স্বাস্থ্য বীমার শরিয়তগত সমস্যা

অধিকাংশ ইসলামি ফকিহদের মতে, প্রচলিত কমার্শিয়াল বীমায় তিনটি বড় সমস্যা থাকে—

১. গারার (অনিশ্চয়তা)

বীমাগ্রহীতা জানে না সে আদৌ সুবিধা পাবে কি না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

نَهَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَنْ بَيْعِ الْغَرَرِ

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) অনিশ্চয়তাপূর্ণ লেনদেন নিষেধ করেছেন।’ (মুসলিম ১৫১৩)


২. রিবা (সুদ)

অনেক ক্ষেত্রে জমাকৃত অর্থ সুদভিত্তিক খাতে বিনিয়োগ করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৭৫)

৩. মাইসির (জুয়া)

অল্প টাকা দিয়ে বড় অঙ্ক পাওয়ার সম্ভাবনা বা কিছুই না পাওয়ার ঝুঁকি—এটি জুয়ার বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। কুরআন বলে—

إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ ... رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ

‘মদ ও জুয়া শয়তানের অপবিত্র কাজ।’ (সুরা আল-মায়েদা: আয়াত ৯০)

তাহলে স্বাস্থ্য বীমা কি সম্পূর্ণ হারাম?

প্রচলিত স্বাস্থ্য বীমায় যেহেতু সুদ ও জুয়া উভয় উপাদান বিদ্যমান, তাই স্বাভাবিক অবস্থায় এর মাধ্যমে উপকৃত হওয়া শরিয়তসম্মত নয়। গ্রাহক নিজের জমা করা প্রিমিয়ামের অতিরিক্ত যে অর্থ গ্রহণ করে, তা সুদের আওতায় পড়ে। আবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অসুস্থ না হলে কোনো অর্থ ফেরত না পাওয়ার বিষয়টি ‘তামলিক আলাল খাতার’—অর্থাৎ অনিশ্চিত শর্তের সঙ্গে মালিকানা হস্তান্তরের স্পষ্ট উদাহরণ, যা শরিয়তসম্মত নয়।

এখানে পারস্পরিক সহযোগিতার যে দিকটি দেখানো হয়, বাস্তবে তা অনুপস্থিত। আর সহযোগিতা ধরে নেওয়া হলেও তা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার সময় থেকেই সুদের শর্ত আরোপ করা হয় এবং নির্দিষ্ট অঙ্ক নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।

জরুরি প্রয়োজনের ক্ষেত্রে অনুমতি

অনেক সমসাময়িক আলেম বলেন— যদি স্বাস্থ্য সেবায় বিকল্প ব্যবস্থা না থাকে এবং চিকিৎসা ব্যয় বহন করা অসম্ভব হয়, তবে ‘প্রয়োজনের মাত্রায়’ স্বাস্থ্য বীমা গ্রহণ করা বৈধ হতে পারে। ইসলামের একটি মূলনীতি—

الضَّرُورَاتُ تُبِيحُ الْمَحْظُورَاتِ

‘চরম প্রয়োজন নিষিদ্ধ বিষয়কেও বৈধ করে দেয়।’ (আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ির – ইবনু নুজাইম)

ইসলামসম্মত বিকল্প: তাকাফুল (Takaful)

তাকাফুল কী?

তাকাফুল হলো পারস্পরিক সহযোগিতাভিত্তিক বীমা ব্যবস্থা, যেখানে—

> অংশগ্রহণকারীরা অনুদান (তাবার্রু’) হিসেবে অর্থ দেন

> লাভ নয়, সহযোগিতা মূল লক্ষ্য

> সুদ ও জুয়ামুক্ত কাঠামো

কুরআনের ভিত্তি—

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى

‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে পরস্পর সহযোগিতা করো।’ (সুরা আল-মায়েদা: আয়াত ২)

স্বাস্থ্য বীমার শরিয়তসম্মত বিকল্প কী হতে পারে—এ বিষয়ে উলামায়ে কেরাম, জাতির দায়িত্বশীল নেতৃত্ব ও কল্যাণকামী মানুষদের গভীরভাবে চিন্তা ও গবেষণা করা জরুরি। জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলো উদ্যোগ নিলে এটি অসম্ভব নয়। ধারাবাহিক গবেষণার মাধ্যমে স্বাস্থ্য বীমার বিকল্প ব্যবস্থা উদ্ভাবন করা কঠিন হলেও সম্ভব। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সরকারের প্রতি আহ্বান থাকবে—তারা যেন বীমাভিত্তিক ব্যবস্থার পরিবর্তে মানুষের চিকিৎসা সহযোগিতাভিত্তিক কল্যাণমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলে।

পরিশেষে—

> ইসলাম স্বাস্থ্য রক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণকে উৎসাহিত করে।

> প্রচলিত বাণিজ্যিক স্বাস্থ্য বীমায় শরিয়তগত সমস্যা রয়েছে

> চরম প্রয়োজন ছাড়া তা পরিহার করাই উত্তম

> ইসলামসম্মত বিকল্প হলো তাকাফুলভিত্তিক স্বাস্থ্য বীমা

একজন মুসলমানের উচিত—সম্ভব হলে হালাল বিকল্প বেছে নেওয়া এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সুস্থতার জন্য দোয়া ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ডেঙ্গু জ্বর কমার পরই বাড়তে পারে বিপদ, যেসব লক্ষণে সতর্কতা জরুরি

ডেঙ্গু জ্বর কমার পরই বাড়তে পারে বিপদ, যেসব লক্ষণে সতর্কতা জরুরি

কিস্তিতে ফ্ল্যাট কেনা কি জায়েজ?

কিস্তিতে ফ্ল্যাট কেনা কি জায়েজ?

ব্যাংক লোন নিয়ে বাড়ি করা কি শরীয়তসম্মত?

ব্যাংক লোন নিয়ে বাড়ি করা কি শরীয়তসম্মত?

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, মুসলিম আইন কী বলে?

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, মুসলিম আইন কী বলে?

বিষাক্ত বাতাস যেভাবে অকালেই কেড়ে নিচ্ছে স্মৃতিশক্তি, কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?

বিষাক্ত বাতাস যেভাবে অকালেই কেড়ে নিচ্ছে স্মৃতিশক্তি, কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?

দরুদ শরিফ পড়ার গুরুত্বপূর্ণ সময় ও ফজিলত

দরুদ শরিফ পড়ার গুরুত্বপূর্ণ সময় ও ফজিলত

আরও পড়ুন

কিস্তিতে ফ্ল্যাট কেনা কি জায়েজ?

কিস্তিতে ফ্ল্যাট কেনা কি জায়েজ?

ব্যাংক লোন নিয়ে বাড়ি করা কি শরীয়তসম্মত?

ব্যাংক লোন নিয়ে বাড়ি করা কি শরীয়তসম্মত?

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, মুসলিম আইন কী বলে?

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, মুসলিম আইন কী বলে?

নারীরা কি জিন্স বা টাইট প্যান্ট পরতে পারবে? যা বললেন আহমাদুল্লাহ

নারীরা কি জিন্স বা টাইট প্যান্ট পরতে পারবে? যা বললেন আহমাদুল্লাহ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম