Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

শবেবরাতকে ‘ভাগ্যরজনী’ বলা হয়— কথাটি কি সঠিক?

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৫৬ পিএম

শবেবরাতকে ‘ভাগ্যরজনী’ বলা হয়— কথাটি কি সঠিক?

লাইলাতুল বারাআত। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

শবেবরাত ও লাইলাতুল বারাআত। ভিন্ন ভিন্ন দুইটি শব্দ। একটি আরবি (লাইলাতুল বারাআত) অন্যটি ফার্সি (শবেবরাত)। আরবিতে ‘লাইলাতুল বারাআত’ শব্দ দুটির অর্থ হলো- মুক্তির রাত। আর ফার্সিতে ‘শবেবরাত’ শব্দ দুটির অর্থ দাড়ায়- ‘ভাগ্য রজনী’। কিন্তু হাদিসের পরিভাষায় এ রাতটি ব্যবহৃত হয়- ‘লাইলাতান নিসফে মিন শাবান’ বা মধ্য শাবানের রাত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে পাকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বাক্যটি এসেছে। এ বাক্য দিয়ে রাতটির নামকরণ করা হলে প্রিয়নবির সুন্নাতের সবচেয়ে সুন্দর ও পরিপূর্ণ অনুসরণ হয়।

শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটিকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বলে সম্বোধন করলে সুন্নত পালন হবে। আর বাংলা ভাষাভাষী মানুষ ‘শাবানের মধ্যরজনী’, ফারসিকগণ ‘শবে বরাত’ ও আরবের লোকেরা ‘লাইলাতুল বারাআত বলে থাকেন। প্রত্যেক ভাষার মানুষ তাদের নিজস্ব ভাষায় এ রাতকে নামকরণ করলে তা বৈধ হবে ঠিক; কিন্ত সুন্নাত পালন হবে না এটা নিশ্চিত।

আরও বিশ্লেষণ করে বললে এরকম হবে—

আরবি বারাআত শব্দটির বাংলা অর্থ হলো- মুক্তি, বিমুক্তি, ছিন্ন, বিচ্ছিন্ন, দায়মুক্তি ইত্যাদি। আরবি শব্দটা যখন ফারসি ভাষার ভেতর প্রবেশ করে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হয় তখন তা উচ্চারণের দিক থেকে ‘বরাত’ নামে আত্ম প্রকাশ করে। আর তাতে তখন অর্থগত পরিবর্তনও ঘটে।

বাংলা ভাষায় বরাত শব্দটা এখন অনেকটাই সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা বা নিজস্ব ভাষায় পরিণত হয়েছে; যার মানে দাঁড়ায় ভাগ্য। আর ‘শবে বরাত’ মানে ‘ভাগ্য রজনী’।

যার ফলে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে এখানে একটা ব্যাপক বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। রাতটা হচ্ছে ক্ষমার রজনী। এখানে রিজিক বা আগামী এক বছরের ভাগ্য নির্ধারণ সম্পর্কিত কোনো কথা কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় না।

আমাদের দেশে অনেকেই মনে করেন, শবে বরাতে ভাগ্য লেখা হয়। এ ধারণা থেকে পত্র-পত্রিকায় শবে বরাতকে ‘ভাগ্যরজনী’ বলেও উল্লেখ করা হয়। অথচ এটি পুরোপুরি ভিত্তিহীন ধারণা। শবে বরাতে ভাগ্য নির্ধারণ করা হয় না। কুরআনে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন ভাগ্য নির্ধারণ করা হয় কুরআন নাজিলের রাতে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

حٰمٓ وَ الۡكِتٰبِ الۡمُبِیۡنِ اِنَّاۤ اَنۡزَلۡنٰهُ فِیۡ لَیۡلَۃٍ مُّبٰرَكَۃٍ اِنَّا كُنَّا مُنۡذِرِیۡنَ فِیۡهَا یُفۡرَقُ كُلُّ اَمۡرٍ حَكِیۡمٍ اَمۡرًا مِّنۡ عِنۡدِنَا اِنَّا كُنَّا مُرۡسِلِیۡنَ

‘হা-মিম! সুস্পষ্ট কিতাবের কসম! নিশ্চয়ই আমি তা নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে, আমি তো সতর্ককারী। সে রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয় আমার নির্দেশে। আমিই রাসুল প্রেরণকারী।’ (সুরা দুখান: আয়াত ১-৫)।

আর কুরআনের অন্য দুটি আয়াত থেকে বোঝা যায় কোরআন রমজানে কদরের রাতে অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

شَهۡرُ رَمَضَانَ الَّذِیۡۤ اُنۡزِلَ فِیۡهِ الۡقُرۡاٰنُ هُدًی لِّلنَّاسِ وَ بَیِّنٰتٍ مِّنَ الۡهُدٰی وَ الۡفُرۡقَانِ

‘রমজান মাস, যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে। (সুরা বাকারা: আয়াত ১৮৫)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—

اِنَّاۤ اَنۡزَلۡنٰهُ فِیۡ لَیۡلَۃِ الۡقَدۡرِ

‘নিশ্চয়ই আমি এটি (কুরআন) নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। (সুরা আল কদর: আয়াত ১)

সুতরাং ভাগ্যরজনী বা ভাগ্য যে রাতে নির্ধারিত হয় তা যে শাবানের ১৫ তারিখের রাত বা শবে বরাত নয় এতে কোনো সন্দেহ নেই। যদিও ইসলামে এ রাতটিরও বিশেষ ফজিলত রয়েছে। এ রাতে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীবাসীর দিকে দয়ার দৃষ্টি দেন এবং বহুসংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করে দেন। হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

نَّ اللَّهَ لَيَطَّلِعُ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلاَّ لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ ‏

‘আল্লাহ তাআলা মধ্য শাবানের রাতে পৃথিবীবাসীর দিকে দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া তাঁর সৃষ্টির সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে মাজাহ ১৩৯০)

আরেকটি হাদিসে এসেছে-

إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَقُومُوا لَيْلَهَا وَصُومُوا يَوْمَهَا ‏.‏ فَإِنَّ اللَّهَ يَنْزِلُ فِيهَا لِغُرُوبِ الشَّمْسِ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا فَيَقُولُ أَلاَ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ فَأَغْفِرَ لَهُ أَلاَ مُسْتَرْزِقٌ فَأَرْزُقَهُ أَلاَ مُبْتَلًى فَأُعَافِيَهُ أَلاَ كَذَا أَلاَ كَذَا حَتَّى يَطْلُعَ الْفَجْرُ ‏

‘মধ্য শাবানের রাতে তোমরা নামাজ আদায় করো এবং দিনে রোজা রাখ। এ দিন সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর আল্লাহ পৃথিবীর নিকটতম আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, কে আছো আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী, আমি তাকে ক্ষমা করবো। কে আছো রিজিকপ্রার্থী, আমি তাকে রিজিক দান করবো। কে আছো রোগমুক্তি প্রার্থনাকারী, আমি তাকে নিরাময় দান করবো। কে আছো এই এই প্রার্থনাকারী… ফজরের সময় হওয়া পর্যন্ত তিনি এভাবে ডাকেন।’ (ইবনে মাজাহ ১৩৮৮)

সারকথা হলো— শাবান মাসের মধ্যরজনী একটি ফজিলতপূর্ণ ও বরকতময় রাত, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন, বহু গুনাহগারকে ক্ষমা করেন এবং তাওবা-ইস্তিগফারের দরজা উন্মুক্ত করে দেন। তবে কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে একথা সুস্পষ্ট যে, এ রাতকে ‘ভাগ্যরজনী’ বলা এবং এতে আগামী এক বছরের ভাগ্য নির্ধারিত হয়— এমন ধারণার কোনো শক্ত ভিত্তি নেই। ভাগ্য নির্ধারণের বিষয়টি কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী লাইলাতুল কদরের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা রমজান মাসে অবস্থিত।

অতএব, শবে বরাতকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্ত বিশ্বাস পোষণ না করে আমাদের করণীয় হলো— এ রাতকে ক্ষমা প্রার্থনা, আত্মশুদ্ধি, তাওবা-ইস্তিগফার ও নফল ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করা। একই সঙ্গে সুন্নাহসম্মত নাম ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ ব্যবহারের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং কুরআন-সুন্নাহর সীমারেখার ভেতর থেকেই ইবাদত-বন্দেগি করা। আল্লাহ তাআলাই আমাদের সঠিক বোঝাপড়া ও আমলের তৌফিক দান করুন— আমিন।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম