রমজানের ২৪তম তারাবিহ
মানুষ ও জিন জাতিকে সৃষ্টির পেছনে আল্লাহর উদ্দেশ্য কী?
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬, ০৬:১২ পিএম
তারাবিহ নামাজ। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আজ ১৩ মার্চ, ২৩ রমজান। সন্ধ্যায় পড়া হবে ২৪তম তারাবিহ। ২৪ রোজার প্রস্তুতিতে তারাবিহ পড়বেন রোজাদার মুমিন মুসলমান। আজকের তারাবিহতে পড়া হবে সুরা যারিয়াত, সুরা তুর, সুরা নঝম, সুরা ক্বামার, সুরা রাহমান এবং সুরা ওয়াক্বিয়াসহ সুরা হাদিদ। এসব সুরায় মানুষের জন্য তৈরি করা মহান রবের অসংখ্য নেয়ামতরাজির বর্ণনা পড়া হবে। হাফেজে কুরআনদের কণ্ঠে থাকবে অনেক সতর্কবার্তার তেলাওয়াতও। সে সঙ্গে ২৭তম পারার তেলাওয়াত শেষ হবে। আজকের তারাবিহতে মানুষ ও জিন জাতিকে সৃষ্টির পেছনে মহান আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্য কী? তাও পড়া হবে আজ। সংক্ষেপে সুরাগুলোর আলোচ্য বিষয় তুলে ধরা হলো—
সুরা যারিয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা মানুষ এবং জিন জাতিকে তার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন মর্মে ঘোষণা দেন। যেন মানুষ জীবনের প্রতিটি কাজই মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন—
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
‘আমার ইবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা যারিয়াত : আয়াত ৫৬)
সুরা যারিয়াত : আয়াত ৩১-৬০
সুরাটি মক্কায় অবতীর্ণ। একত্ববাদ, নবুয়ত ও হাশরের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে সুরাটিতে। প্রিয় নবী (সা.)-এর নবুয়ত এবং হাশরের ময়দানের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। এ সুরায় মানবজাতিকে আল্লাহ তাআলা শুধু ইবাদত-বন্দেগির জন্য সৃষ্টি করেছেন সে ঘোষণাও রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
‘আমার ইবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা যারিয়াত : আয়াত ৫৬)
আল্লাহ তাআলা মানুষের কাছে জীবিকা চান না। অর্থ-সম্পদ, টাকা-পয়সা চান না। চান শুধু ইবাদত-বন্দেগি ও আনুগত্য। এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে। আবার যারাই আল্লাহর হুকুম পালন তথা অবাধ্যতায় লিপ্ত হবে তাদের কঠিন পরিণতির কথা বর্ণনায় শেষ হবে সুরা যারিয়াত। আল্লাহ তাআলা বলেন—
مَا أُرِيدُ مِنْهُم مِّن رِّزْقٍ وَمَا أُرِيدُ أَن يُطْعِمُونِ - إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ
‘আমি তাদের কাছে জীবিকা চাই না এবং এটাও চাই না যে, তারা আমাকে আহার্য যোগাবে। আল্লাহ তাআলাই তো জীবিকাদাতা শক্তির আধার, পরাক্রান্ত।’ (সুরা যারিয়াত: আয়াত ৫৭-৫৮)
فَإِنَّ لِلَّذِينَ ظَلَمُوا ذَنُوبًا مِّثْلَ ذَنُوبِ أَصْحَابِهِمْ فَلَا يَسْتَعْجِلُونِ - فَوَيْلٌ لِّلَّذِينَ كَفَرُوا مِن يَوْمِهِمُ الَّذِي يُوعَدُونَ
‘অতএব, এই জালেমদের প্রাপ্য তাই, যা ওদের অতীত সহচরদের প্রাপ্য ছিল। কাজেই ওরা যেন আমার কাছে তা তাড়াতাড়ি না চায়। অতএব, কাফেরদের জন্যে দুর্ভোগ সেই দিনের, যেদিনের প্রতিশ্রুতি ওদেরকে দেওয়া হয়েছে।’ (সুরা যারিয়াত : আয়াত ৬০)
সুরা তুর (৪৯)
সুরা তুর মক্কা অবতীর্ণ হয়। সুরাটি ৪৯ আয়াত ও ২ রুকু। এটি কুরআনুল কারিমের ৫২তম সুরা। এ সুরায় কয়েকটি বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। আর তাহলো—
শপথ ও সতর্কবার্তা: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তুর পাহাড়, কিতাব এবং বিচার দিনের শপথ করে বলেছেন যে, শাস্তির বাণী সত্য এবং তা আসবেই।
পরকাল ও জান্নাত: ঈমানদারদের জন্য জান্নাতের নেয়ামত, পরিবার-পরিজনের সাথে পুনর্মিলন এবং তাদের কাজের পুরস্কারের বর্ণনা করা হয়েছে।
কাফেরদের পরিণতি: যারা সত্যকে মিথ্যা বলে, তাদের জন্য দোজখের আগুনের সতর্কবার্তা করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সান্ত্বনা: অবিশ্বাসী ও কাফেরদের মিথ্যাচারের বিপরীতে নবী করীম (সা.)-কে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ ও সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও মুমিনের ঈমানের মজবুতির জন্য তাওহিদ, রেসালাত এবং কেয়ামাতের ভয়াবহতার আলোচনা রয়েছে এ সুরায়।
সুরা নঝম (৬২)
সুরা নঝম মক্কায় অবতীর্ণ হয়। ৬২ আয়াতের সুরাটি ৩ রুকু বিশিষ্ট। এটি কুরআনুল কারিমের ৫৩তম সুরা। এ সুরায় আল্লাহ তাআলা বিশ্বনবী (সা.)-এর নবুয়ত ও রেসালাতের প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিটি কথাই যে মানবজাতির জন্য অনুসরণীয়, সে ঘোষণাও এসেছে এ সুরায়। বিশেষ করে বিশ্বনবীর পবিত্র জবান থেকে যা বের হয় তা শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ওহি, তাও বলা হয়েছে।
এছাড়াও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সত্য নবী হওয়া এবং তার প্রতি অবতীর্ণ ওহিতে সন্দেহ ও সংশয়ের অবকাশ না থাকার কথা বর্ণিত হয়েছে। অতপর মুশরিকদের নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছে।
সুরা ক্বামার (৫৫)
এ সুরাটি মক্কায় অবতীর্ণ। কুরআনুল কারিমের ৫৪তম সুরাটি ৫৫ আয়াত ও ৩ রুকু বিশিষ্ট। সুরাটিতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি বিশেষ মুযেজার উল্লেখ রয়েছে। যা বিশ্বনবী নবুয়তের দলিল হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। সুরা ক্বামারের অন্যতম আলোচ্য বিষয়গুলো হলো—
চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়া: প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে, ‘কেয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে এবং চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে।’
অবিশ্বাসীদের আচরণ: অবিশ্বাসীরা অলৌকিক ঘটনা দেখেও একে জাদু বলে প্রত্যাখ্যান করে এবং নবুয়তকে অস্বীকার করে।’
পূর্ববর্তী জাতিগুলোর কাহিনী: ‘নূহ (আ.), আদ জাতি, সামুদ জাতি এবং লুত (আ.)-এর জাতির অবাধ্যতা ও তাদের ওপর আল্লাহর শাস্তির বর্ণনা।’
কুরআন সহজ করা: ‘মানুষের উপদেশ গ্রহণের জন্য আল্লাহ কুরআনকে সহজ করে দিয়েছেন।’
কেয়ামতের ভয়াবহতা: ‘কেয়ামতের দিন মানুষ কবর থেকে বিক্ষিপ্ত পঙ্গপালের মতো বের হবে।’
সুরা রাহমান (৭৮)
কুরআনুল কারিমের ৫৫নং সুরাটি ৭৮ আয়াত ও ৩ রুকু বিশিষ্ট। মদিনায় অবতীর্ণ শ্রুতিমধূর ও ব্যাপক পরিচিত ও তিলাওয়াতকৃত সুরা আর রহমানে দুনিয়া ও আখিরাতের আল্লাহর অনন্ত অসীম নিয়ামাতের বর্ণনা করা হয়েছে। এ সুরার মূল বক্তব্য হলো—
> বিশ্বলোকের গোটা ব্যবস্থাপনা এক আল্লাহর ছাড়া আর কারো কতৃত্ব নেই;
> গোটা বিশ্বলোকের ব্যবস্থাপনা পূর্ণ ভারসাম্যের সঙ্গে ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কোনোভাবে এ ভারসাম্য বিনষ্ট হবে না;
> আল্লাহ তাআলার কুদরত ও বিস্ময়কর কার্যকলাপের কথা বলার সঙ্গে মানব-দানবরা আল্লাহর যে নিয়ামাত ভোগ করছে, তার দিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে;
> মানুষ ও জিন জাতিকে তার কর্মের হিসাবের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। এ সুরায় পৃথিবীর নাফরমান মানুষ ও জিনের মর্মান্তিক পরিণতির কথা বলা উল্লেখ করা হয়েছে।
> মানব ও দানবদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে, পরকালকে ভয় করেছে, তাদেরকে প্রদেয় নিয়ামাতের বিস্তারিত বিবরণ পেশ করা হয়েছে এ সুরায়।
সুরা ওয়াক্বিয়া (৯৬)
সুরাটি মক্কায় অবতীর্ণ। ৯৬ আয়াতের সুরাটি ৩ রুকু বিশিষ্ট এবং কুরআনুল কারিমের ৫৬তম সুরা। আল্লাহ তাআলার অনন্ত অসীম শক্তি ও অপূর্ব মহিমার বিস্তারিত বিবরণ স্থান পেয়েছে সুরা ওয়াক্বিয়ায়। বিশেষ করে পরকালে মানুষের সমগ্র জীবনের কর্মকাণ্ডের পরিণতি অবশ্যই ভোগ করতে হবে।
জন্মের ন্যায় মৃত্যু যেমন সত্য, ঠিক মৃত্যুর ন্যায় পরকাল, হাশরের ময়দানে পুনরুত্থানও সত্য। যার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে এ সুরায়। সর্বোপরি এ সুরার শেষে আখিরাতের আলোচনা বর্ণনা করা হয়েছে।
সুরা হাদিদ (২৯)
মদিনায় অবতীর্ণ সুরা হাদিদে ইসলামি শরিয়তের বুনিয়াদি বিধি-নিষেধ এবং মৌলিক আক্বিদা তথা তাওহিদ সম্পর্কে হিদায়াত রয়েছে এবং উত্তম চরিত্র অর্জনে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এ সুরার মূল বক্তব্য হলো—
> বিশ্বজগৎ এক আল্লাহর সৃষ্টি, তিনি ভূ-মণ্ডল ও নভোমণ্ডল সব কিছুর একচ্ছত্র অধিপতি। সবকিছুই তার কর্তৃত্বাধীন। তাঁর কর্তৃত্বের কোনো কিছুতেই শরিক নেই।
> সত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য; আল্লাহর দ্বীনকে কায়েম করার জন্য মানুষের কর্তব্য হলো- আত্মত্যাগের পরিচয় দেয়া।
> দুনিয়ার ধন-সম্পদ, সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্য নিতান্ত ক্ষণস্থায়ী বিষয়। দুনিয়ার এ ক্ষণস্থায়ী জীবনকে পরকালীন চিরস্থায়ী জীবনের সম্বল সংগ্রহে ব্যয় করাই কল্যাণকামী মানুষের কর্তব্য।
