ইতিকাফের ডায়েরি
হে আল্লাহ, বাবার চোখের পানি তুমি সুখের করে দাও
Advertisement
রেজোয়ান কবির
প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬, ০৯:৫৪ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২৭ রমজান। ইমাম সাহেব তারাবি শেষে দীর্ঘ মোনাজাত করলেন। মসজিদের এক কোণায় সাদা কাপড়ে ঘেরা ইতিকাফের জন্য নির্দিষ্ট জায়গাটায় মোনাজাত শেষে আমরা বসে আছি। স্রষ্টার ইচ্ছায় এই রমজানে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জে-ব্লক মসজিদে ইতিকাফে বসেছি দুজন। আমার সঙ্গে অভিভাবক হিসেবে ইতিকাফরত রয়েছেন একজন অমায়িক ভদ্রলোক। উনার ছেলে ঈদের পর পড়াশোনার জন্য চলে যাবে দেশের বাইরে। বাবা-ছেলে মিলে মসজিদের মেঝেতে পাতানো বেডে বসে কথা বলছেন। আর পাশেই বসে নিউজপ্রিন্ট রঙের ডায়েরিটার বুকে মেটালিক পেন্সিল দিয়ে আমি লেখালেখি করছি...।
ইতিকাফ চলাকালীন মসজিদের বাইরে যাওয়া নিষেধ, তাই ইতিকাফের দিনগুলোতে বাবা বাসা থেকে প্রতিদিন আমার জন্য নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সেহরি নিয়ে মসজিদে আসেন। এরপর ইতিকাফের স্থানে সেহরি রেখে বাবা ইবাদত বন্দেগি করেন। একইভাবে এশার সালাত আদায়ের পূর্বেই আমার জন্য রাতের খাবার নিয়ে আসেন। রাতের খাবার শেষ হলে বাবা খাবারের খালি ব্যাগটি নিয়ে বাসায় চলে যান। প্রতিদিনের মতো ২৭ রমজানেও বাবা নামাজ শেষে খাবারের ব্যাগ নেওয়ার জন্য ইতিকাফের জায়গায় ঢোকেন।
আজ সবুজ পাঞ্জাবিতে বাবাকে দেখতে অনেক সুন্দর লাগছিল। তবে শুভ্র সফেদ দাড়িতে আচ্ছাদিত বাবার মুখটা মলিন দেখাচ্ছিল। বরাবরের মতো আমি বাবাকে সালাম দিলাম। সালামের জবাব দিয়ে উনি আমার পাশে এসে করমর্দনের জন্য হাত বাড়ালেন। বাবার সঙ্গে এমনটা খুব কম হয়, আমি কিছুটা বিস্মিত হয়ে উঠে দাঁড়ালাম। আকস্মিকভাবে বাবা আমাকে বুকে টেনে নিলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় কিছু সময়ের জন্য আমি নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলি। এই ছোট্ট জীবনে বাবার সঙ্গে অনেক স্মৃতি আমার। তবে আজকের মতো এমনটি জীবনে দ্বিতীয়বার ঘটেনি।
বাবা কাঁদছেন, এই কান্নার কারণ বাবা আর সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ জানার কথা নয়। বাবা-ছেলে দুজনের চোখ অশ্রুসিক্ত। কিছু সময়ের জন্য নিজেকে সামলে নিয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা, আপনি কি কোনো কিছু নিয়ে পেরেশানিতে আছেন?’
বাবার উত্তরটা ছিল অনেকটা, নিঃশব্দে- ‘না, বাবা’। এরপর খাবারের ব্যাগটা হাতে নিয়ে মসজিদের দরজার দিকে হাঁটতে লাগলেন। আমি ধীরে ধীরে তার পেছনে হাঁটা শুরু করলাম। আমার সীমানা প্রাচীর ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। বাবা মসজিদ থেকে বের হয়ে বাসার দিকে যাচ্ছেন।
জীবনে ঘটে যাওয়া অপ্রত্যাশিত এই ঘটনার সাক্ষী হয়ে মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে আমি বাবার চলে যাওয়া দেখছি। বাবার সেই কান্না হয়তো সুখের কিংবা দুঃখের, নিশ্চয়তা কিংবা অনিশ্চয়তার। তবে যাই হোক না কেন, আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন আমাকে সব সময় তাদের পাশে থাকার যে তৌফিক দিয়েছেন, সেজন্য তার শুকরিয়া আদায়ের সক্ষমতা হয় তো আমার নেই। তবে খুব করে স্বপ্ন দেখি- বাবা-মাকে নিয়ে হজে যাওয়ার, তাদের নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তর পাড়ি দেওয়ার। হে আল্লাহ, আমার বাবা-মাকে তুমি নেক হায়াত দান করো। আমি যেন তাদের নিয়ে আমার দেখা স্বপ্ন পূরণ করতে পারি। বাবা আছে বলে নির্ভারচিত্তে আজ তোমাকে (আল্লাহ) খুশি করতে ইতিকাফে বসেছি। হে আমার রব, বাবার চোখের পানি তুমি সুখের করে দাও। রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগিরা।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী, শিক্ষা উদ্যোক্তা ও পরিচালক- ‘কাগজবাড়ি’
