Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

আরাফার রোজা, স্থানীয় ৯ জিলহজ না সৌদি আরাফার দিন?

Advertisement

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ০৯:৩৫ পিএম

আরাফার রোজা, স্থানীয় ৯ জিলহজ না সৌদি আরাফার দিন?

Advertisement

জিলহজ ইসলামী বর্ষপঞ্জির অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ মাস। বিশেষ করে এর প্রথম দশ দিনকে আল্লাহ তাআলা এমন ফজিলত দান করেছেন, যা অন্য সময়ের তুলনায় অনন্য। 

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এমন কোনো দিন নেই, যাতে নেক আমল আল্লাহর কাছে জিলহজের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে অধিক প্রিয়। (সহিহ বুখারি) 

এই বরকতময় দিনগুলোর অন্যতম হলো ৯ জিলহজ, অর্থাৎ ইয়াওমে আরাফাহ। এদিন লাখো হাজি আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন। আর এই দিনকে ঘিরেই মুসলিম বিশ্বে প্রতি বছর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে আরাফার রোজা কি নিজ দেশের চাঁদ অনুযায়ী রাখতে হবে, নাকি সৌদি আরবে হাজিদের আরাফায় অবস্থানের দিন অনুযায়ী? 

রাসূলুল্লাহ (সা.) আরাফার রোজার ফজিলত সম্পর্কে বলেছেন, আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আরাফার দিনের রোজা পূর্বের এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে। (সহিহ মুসলিম) 

এই হাদিসের কারণেই আরাফার রোজা মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত হিসেবে বিবেচিত। 

তবে ফিকহি আলোচনায় মূল প্রশ্ন হলো ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ নির্ধারণের ভিত্তি কী? স্থানীয় চাঁদ, নাকি আরাফার ময়দানে হাজিদের অবস্থান? 

চার মাযহাবের ইমাম ও ফকিহদের আলোচনায় দেখা যায়, অধিকাংশ আলেম চাঁদ দেখার স্থানীয় পার্থক্যকে শরিয়তসম্মত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। 

হানাফি মাযহাবের ইমাম আবু হানিফা রহ. এর ফিকহি নীতিতে স্থানীয় চাঁদ দেখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। হানাফি ফিকহের বহু গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, দূরবর্তী অঞ্চলে চাঁদ দেখার ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। 

‘আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা’ ও ‘বাদায়েউস সানায়ে’ গ্রন্থে এ বিষয়ে আলোচনা পাওয়া যায়। 

মালিকি মাযহাবের ইমাম মালিক রহ. এর মতানুসারেও বিভিন্ন অঞ্চলে চাঁদ দেখার পার্থক্য বিবেচিত হতে পারে। মালিকি ফকিহরা স্থানীয় বাস্তবতা ও অঞ্চলভিত্তিক চাঁদ দেখাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। 

শাফেয়ি মাযহাবের ইমাম শাফেয়ি রহ. স্পষ্টভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের চাঁদ দেখার পার্থক্যকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইমাম নববী রহ. ‘শরহ সহিহ মুসলিম’ এ উল্লেখ করেন, এক অঞ্চলের চাঁদ দেখা অপর অঞ্চলের জন্য আবশ্যক নয় বিশেষত যখন ভৌগোলিক দূরত্ব অনেক বেশি হয়। শাফেয়ি মাযহাবে এ মতটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। 

হাম্বলি মাযহাবের ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. থেকেও এমন মত পাওয়া যায় যে, বিভিন্ন অঞ্চলের চাঁদ ভিন্ন হতে পারে। পরবর্তী হাম্বলি আলেমদের মধ্যে ইবনে তাইমিয়্যা রহ. এবং ইবনুল কাইয়্যিম রহ. স্থানীয় চাঁদ দেখার মতকে শক্তিশালী করেছেন। 

ইমাম নববী রহ. বলেন, প্রতিটি অঞ্চলের জন্য তাদের নিজস্ব চাঁদ দেখার বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। 

একইভাবে ইবনে তাইমিয়্যা রহ. উল্লেখ করেন, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে চাঁদ উদয়ের সময় ভিন্ন হওয়া স্বাভাবিক, শরিয়তও এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করেনি। 

সমসাময়িক যুগের বিশিষ্ট আলেম শাইখ আবদুল আজিজ ইবনে বায রহ. এবং শাইখ মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমিন রহ. ও স্থানীয় চাঁদের ভিত্তিতে আরাফার রোজা পালনের পক্ষে মত দিয়েছেন। 

তাদের মতে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ‘চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে ঈদ করো’ হাদিসটি রোজা ও ঈদের সময় নির্ধারণের মৌলিক নীতি। 

অন্যদিকে কিছু আলেমের মত হলো, ‘ইয়াওমে আরাফাহ’র মূল সম্পর্ক যেহেতু আরাফার ময়দানে হাজিদের অবস্থানের সঙ্গে, তাই সৌদি আরবে যেদিন হাজিরা আরাফায় অবস্থান করবেন, সেদিনই রোজা রাখা উত্তম। তবে অধিকাংশ ফকিহ এই মতকে তুলনামূলক দুর্বল বা সীমিত মত হিসেবে বিবেচনা করেছেন। 

ফিকহি গবেষণায় দেখা যায়, ইসলামের ইতিহাসে মতপার্থক্য থাকলেও উম্মাহর ঐক্য ও পারস্পরিক সম্মানকে সবসময় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তাই এ বিষয়কে কেন্দ্র করে বিভেদ সৃষ্টি করা বা একে অপরকে ভুল বলা ইসলামের আদবের পরিপন্থী। 

বাংলাদেশের অধিকাংশ আলেম, মুফতি ও ইসলামিক গবেষক স্থানীয় চাঁদের ভিত্তিতে ৯ জিলহজ অনুযায়ী আরাফার রোজা রাখার পক্ষেই মত দিয়েছেন। ফলে বাংলাদেশে ঘোষিত ৯ জিলহজেই রোজা পালন করাই অধিক প্রচলিত ও গ্রহণযোগ্য আমল। 

মূলত আরাফার রোজার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। এই রোজা শুধু একটি তারিখের প্রশ্ন নয়, বরং এটি মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার এক আধ্যাত্মিক ইবাদত। 

আজকের বিভক্ত, ভোগবাদী ও আত্মকেন্দ্রিক পৃথিবীতে আরাফার রোজা মুসলমানদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃত সফলতা সম্পদ বা ক্ষমতায় নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে। 

তাই এই ইবাদতের প্রকৃত চেতনা হওয়া উচিত তাকওয়া, তওবা, বিনয় ও উম্মাহর ঐক্য রক্ষা করা, বিভেদ সৃষ্টি করা নয়। 

লেখক: শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম