Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

আল্লাহর ভালোবাসা লাভের সহজ পথ

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৩:৫৯ পিএম

আল্লাহর ভালোবাসা লাভের সহজ পথ

আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার একমাত্র পথ— রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ। ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ ভালোবাসা চায়। কেউ মানুষের ভালোবাসা চায়, কেউ সম্পদের, কেউ সম্মানের। কিন্তু একজন মুমিনের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ আকাঙ্ক্ষা হলো— আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করা। কারণ আল্লাহ যার প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং যাকে ভালোবাসেন, তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার সব দরজা খুলে যায়।

অনেকেই মনে করেন, শুধুমাত্র আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি করলেই যথেষ্ট। কিন্তু কুরআন আমাদের শেখায়, আল্লাহর ভালোবাসা কেবল মুখের দাবির বিষয় নয়; বরং এর একটি বাস্তব প্রমাণ রয়েছে। সেই প্রমাণ হলো— রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ। আল্লাহ তাআলা বলেন—

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللّٰهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللّٰهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللّٰهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

‘(হে রাসুল!) আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমার অনুসরণ কর। তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ৩১)

আল্লাহর ভালোবাসার মানদণ্ড

এই আয়াতকে অনেক মুফাসসির ‘আয়াতুল মিহনাহ’ বা ভালোবাসার দাবির পরীক্ষার আয়াত বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ কেউ যদি সত্যিই আল্লাহকে ভালোবাসে, তবে তার জীবনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের প্রতিফলন অবশ্যই দেখা যাবে।

শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়াহ (রহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ করবে, সে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করবে; আর যে তার অনুসরণ থেকে বিমুখ হবে, সে আল্লাহর ভালোবাসার দাবিতে সত্যবাদী নয়।’

কেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ আল্লাহর ভালোবাসার শর্ত?

কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) হলেন আল্লাহর মনোনীত পথপ্রদর্শক। আল্লাহ তাআলা বলেন—

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللّٰهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ

‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ২১)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—

مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللّٰهَ

‘যে রাসুলের আনুগত্য করল, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৮০)

অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা লাভের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহই হলো নিরাপদ ও নিশ্চিত পথ।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ করলে কী লাভ হবে?

১. আল্লাহর ভালোবাসা অর্জিত হবে

আল্লাহ তাআলা বলেন—

يُحْبِبْكُمُ اللّٰهُ

‘আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন।’

আল্লাহর ভালোবাসা এমন এক মর্যাদা, যার চেয়ে বড় কোনো সফলতা নেই।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

إِذَا أَحَبَّ اللَّهُ الْعَبْدَ نَادَى جِبْرِيلَ: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحْبِبْهُ

‘যখন আল্লাহ কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তিনি জিবরিলকে ডাকেন এবং বলেন— আমি অমুককে ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাসো।’ (বুখারি ৩২০৯, মুসলিম ২৬৩৭)

২. গুনাহ ক্ষমা করা হবে

আল্লাহ বলেন—

وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ

‘এবং তিনি তোমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেবেন।’

মানুষ ভুল করবে, পাপ করবে—এটাই মানবস্বভাব। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ মানুষকে আল্লাহর ক্ষমার দিকে নিয়ে যায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّ اللّٰهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২২২)

৩. জান্নাত লাভের পথ সহজ হবে

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبَى

‘সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে শুধু সে ছাড়া যে অস্বীকার করবে।’

সাহাবিগণ বললেন, ‘কে অস্বীকার করবে?’

তিনি বললেন—

مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبَى

‘যে আমার আনুগত্য করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্যতা করবে সে-ই (জান্নাতকে) প্রত্যাখ্যান করল।’ (বুখারি ৭২৮০)

আল্লাহ যাদের ভালোবাসেন

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন যাদের তিনি ভালোবাসেন—

১. মুত্তাকীগণ

إِنَّ اللّٰهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ৭৬)

২. সৎকর্মশীলগণ

إِنَّ اللّٰهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৯৫)

৩. ধৈর্যশীলগণ

وَاللّٰهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ

‘আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৪৬)

৪. ন্যায়পরায়ণগণ

إِنَّ اللّٰهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-মায়েদা: আয়াত ৪২)

এ আয়াত থেকে আমাদের শিক্ষা

১. আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি যথেষ্ট নয়; তার প্রমাণ দিতে হবে।

২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ ছাড়া আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন সম্ভব নয়।

৩. সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করলে গুনাহ ক্ষমা হয়।

৪. প্রকৃত সফলতা হলো আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করা।

৫. ঈমানের পূর্ণতা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যের মাধ্যমে আসে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ

‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।’ (বুখারি ১৫, মুসলিম ৪৪)

আমাদের করণীয়

> প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত করা।

> রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী ও সুন্নাহ অধ্যয়ন করা।

> ফরজ ও ওয়াজিব ইবাদতের পাশাপাশি সুন্নাহ আমলের প্রতি যত্নবান হওয়া।

> চরিত্র, আচার-আচরণ ও লেনদেনে রাসূল ﷺ-কে অনুসরণ করা।

> নিয়মিত দরুদ শরিফ পাঠ করা।

> গুনাহ থেকে তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।

> পরিবার ও সমাজে সুন্নাহভিত্তিক জীবন গড়ে তোলা।

আল্লাহর ভালোবাসা কোনো কল্পনামাত্র নয়; এটি অর্জনের সুস্পষ্ট পথ কুরআন আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে। সেই পথ হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আন্তরিক অনুসরণ। যে ব্যক্তি তার সুন্নাহকে নিজের জীবনব্যবস্থা বানাবে, আল্লাহ তাকে ভালোবাসবেন, তার গুনাহ ক্ষমা করবেন এবং তাকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করবেন।

সুতরাং আসুন, আমরা শুধু আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি না করে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণের মাধ্যমে সেই ভালোবাসার সত্যতা প্রমাণ করি। কারণ আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা অর্জনই একজন মুমিনের জীবনের সর্বোচ্চ সাফল্য এবং আখিরাতের চিরস্থায়ী মুক্তির চাবিকাঠি।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .