Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

হজের পর নতুন জীবন— গুনাহমুক্ত পথচলার অঙ্গীকার

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ০৭:৫৮ পিএম

হজের পর নতুন জীবন— গুনাহমুক্ত পথচলার অঙ্গীকার

হজের পর নতুন জীবন। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

হজ শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় আত্মিক বিপ্লব। লাখো মানুষের সঙ্গে একই পোশাকে, একই ময়দানে দাঁড়িয়ে মানুষ উপলব্ধি করে— একদিন তাকে তার রবের সামনে এভাবেই উপস্থিত হতে হবে। তাই হজের প্রকৃত সফলতা কেবল মক্কা-মদিনায় কয়েকটি দিন কাটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং হজ থেকে ফিরে জীবনের প্রতিটি দিনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করার মধ্যেই এর প্রকৃত সার্থকতা।

অনেকেই হজ থেকে ফিরে নতুন উদ্দীপনায় জীবন শুরু করেন। কিন্তু প্রকৃত হাজি তিনি, যার চরিত্র, আমল, চিন্তা ও জীবনাচরণে হজের প্রভাব স্থায়ীভাবে প্রতিফলিত হয়। হজের মাধ্যমে অর্জিত পবিত্রতা ও তাকওয়াকে ধরে রাখাই হলো হজ কবুল হওয়ার অন্যতম আলামত।

 হজের প্রতিদান: নবজাতকের মতো পবিত্রতা

কবুল হজ মানুষের অতীতের গুনাহ মুছে দেয়। ফলে সে হজ থেকে ফিরে আসে এক নবজাতক শিশুর মতো পবিত্র, নির্মল ও গুনাহমুক্ত হয়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ، رَجَعَ كَيَوْمٍ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ

‘যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ পালন করে এবং হজের সময় অশ্লীল কথা, কুকর্ম ও গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকে, সে এমন নিষ্পাপ অবস্থায় ফিরে আসে, যেমন ছিল সেদিন, যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিলেন।’ (বুখারি ১৫২১, মুসলিম ১৩৫০)

এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, হজ একজন মানুষকে গুনাহমুক্ত জীবনের নতুন সূচনা করার সুযোগ দেয়।

তাকওয়াই হজের মূল শিক্ষা

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَتَزَوَّدُوا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى

‘তোমরা পাথেয় সংগ্রহ কর; আর সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৯৭)

হজের প্রতিটি কর্মই তাকওয়ার শিক্ষা দেয়। তাই হজ থেকে ফিরে প্রথম দায়িত্ব হলো আল্লাহভীতিকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা।

হজের পর গুনাহমুক্ত জীবন গড়ার ৭টি করণীয়

১. ফরজ ইবাদতে অবহেলা না করা

হজের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো— পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রোজা, জাকাতসহ সব ফরজ বিধান যথাযথভাবে পালন করা। আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ

‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আল-আনকাবুত: আয়াত ৪৫)

২. অতীতের গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ তওবা করা

যে গুনাহের জন্য হজের আগে অনুতপ্ত ছিলেন, হজের পর যেন আর কখনো সে পথে ফিরে না যান। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

‘হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার।’ (সুরা আন-নূর: আয়াত ৩১)

৩. কুরআনের সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলা

হজের পর প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ বোঝার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কুরআনই একজন মুমিনের জীবন পরিচালনার সর্বোত্তম পথনির্দেশ।

৪. নেককারদের সান্নিধ্যে থাকা

মানুষ তার বন্ধু ও পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই দ্বীনদার, আল্লাহভীরু মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ

‘মানুষ তার বন্ধুর আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।’ (তিরমিজি ২৩৭৮)

৫. মানুষের হক আদায়ে সচেতন হওয়া

হজ কবুল হওয়ার অন্যতম আলামত হলো মানুষের প্রতি আচরণে পরিবর্তন আসা। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও সমাজের মানুষের হক যথাযথভাবে আদায় করতে হবে।

৬. নফল ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলা

তাহাজ্জুদ, নফল রোজা, দান-সদকা ও অধিক জিকির বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্য দান করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ

‘আমার বান্দা নফল আমলের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি।’ (বুখারি ৬৫০২)

৭. হজের স্মৃতি নয়, হজের শিক্ষা ধরে রাখা

অনেকেই হজের স্মৃতি সংরক্ষণ করেন, কিন্তু হজের শিক্ষা ভুলে যান। প্রকৃত সফলতা হলো হজের পরেও বিনয়, তাকওয়া, ধৈর্য ও ইখলাস বজায় রাখা।

হজ কবুল হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত

ইসলামি মনীষীরা বলেন, কোনো নেক আমল কবুল হওয়ার অন্যতম আলামত হলো সেই আমলের পর আরও বেশি নেক কাজে অটল থাকা এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকা। তাই হজের পর যদি একজন মানুষের চরিত্র ও আমলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, তবে এটি তার জন্য সুসংবাদের বিষয়।

হজ মানুষের জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া এক মহান সুযোগ— নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগ। হজ শেষে যদি আমরা আগের মতোই গুনাহে নিমজ্জিত হয়ে যাই, তাহলে হজের শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যাবে। কিন্তু যদি আমরা নামাজ আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, তওবা, নেক আমল ও তাকওয়ার মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করি, তাহলে হজ আমাদের জন্য হবে জান্নাতের পথে এক উজ্জ্বল সূচনা।

আসুন, হজ থেকে ফিরে আমরা শুধু ‘হাজি’ উপাধি অর্জন না করি; বরং এমন জীবন গড়ি, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের সফলতার সাক্ষ্য বহন করবে। হজের প্রকৃত স্মারক হলো পরিবর্তিত জীবন, আর কবুল হজের সবচেয়ে বড় আলামত হলো গুনাহ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর পথে অবিচল থাকা।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

যে দোয়ায় কেউ খালি হাতে ফিরে না

যে দোয়ায় কেউ খালি হাতে ফিরে না

আত্মীয়-স্বজন জালেম হলে আপনার আচরণ কেমন হবে?

আত্মীয়-স্বজন জালেম হলে আপনার আচরণ কেমন হবে?

অপমানের বিপরীতে মুমিনের জবাবের ভাষা কী হবে?

অপমানের বিপরীতে মুমিনের জবাবের ভাষা কী হবে?

বাবা-মায়ের গুনাহের দায় কি সন্তানের ওপর পড়ে?

বাবা-মায়ের গুনাহের দায় কি সন্তানের ওপর পড়ে?

ক্ষুধার্ত মানুষের তৃপ্তিময় হাসি যখন শ্রেষ্ঠ ইবাদত

ক্ষুধার্ত মানুষের তৃপ্তিময় হাসি যখন শ্রেষ্ঠ ইবাদত

ফরজ গোসলের সময় নাকের ভেতরে পানি কতদূর পৌঁছাতে হবে?

ফরজ গোসলের সময় নাকের ভেতরে পানি কতদূর পৌঁছাতে হবে?

আরও পড়ুন

যে দোয়ায় কেউ খালি হাতে ফিরে না

যে দোয়ায় কেউ খালি হাতে ফিরে না

আত্মীয়-স্বজন জালেম হলে আপনার আচরণ কেমন হবে?

আত্মীয়-স্বজন জালেম হলে আপনার আচরণ কেমন হবে?

অপমানের বিপরীতে মুমিনের জবাবের ভাষা কী হবে?

অপমানের বিপরীতে মুমিনের জবাবের ভাষা কী হবে?

পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ, শরিয়তে শাস্তির কী বিধান

পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ, শরিয়তে শাস্তির কী বিধান

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম