Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য: জান্নাত লাভের পাথেয়

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৬:১১ পিএম

মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য: জান্নাত লাভের পাথেয়

মুত্তাকিদের জন্য মহাপুরস্কার। ছবি: সংগৃহীত

মুত্তাকি হওয়া শুধু কিছু ইবাদত পালনের নাম নয়; বরং এটি এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যেখানে একজন বান্দা সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে এবং তার অসন্তুষ্টি থেকে বেঁচে থাকে। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের জন্য এমন জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন, যার বিস্তৃতি আসমান ও জমিনের সমান। তাই একজন মুমিনের জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হওয়া উচিত মুত্তাকিদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং জান্নাতের উপযুক্ত পাথেয় সংগ্রহ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَسَارِعُوا إِلَىٰ مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ

‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা এবং সেই জান্নাতের দিকে দ্রুত ধাবিত হও, যার প্রশস্ততা আসমান ও জমিনের সমান; যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৩)

জান্নাত ও মাগফিরাতের প্রতিযোগিতা

দ্রুত ক্ষমার দিকে অগ্রসর হওয়া

শুধু দুনিয়াবী সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা ভোগ-বিলাসে প্রতিযোগিতা নয়; বরং একজন মুমিনের প্রকৃত প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত আল্লাহর ক্ষমা, সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভের জন্য। মুত্তাকিরা সর্বদা নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট থাকেন।

ইবাদতে প্রশান্তি খোঁজা

মুত্তাকিরা নামাজ ও ইবাদতকে বোঝা মনে করেন না; বরং এটিকে আত্মার প্রশান্তি, হৃদয়ের প্রশস্ততা এবং জীবনের প্রকৃত সুখের উৎস হিসেবে গ্রহণ করেন। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

وَجُعِلَتْ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلَاةِ

‘আমার চোখের শীতলতা (প্রশান্তি) রাখা হয়েছে সালাতের মধ্যে।’ (নাসাঈ ৩৯৩৯)

সুন্নাহভিত্তিক জীবনধারা

মুত্তাকিরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে জীবন পরিচালনা করেন। রাতের প্রথম ভাগে ঘুমানো, ফজরের আগে জেগে ওঠা, তাহাজ্জুদ আদায় করা, পরিমিত খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন শারীরিক ও মানসিক শক্তির অন্যতম উৎস। আল্লাহ তাআলা বলেন—

لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ

‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ২১)

মুত্তাকিদের ৬টি মৌলিক গুণ

১. সকল অবস্থায় দানশীলতা

মুত্তাকিরা সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা—উভয় অবস্থাতেই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করেন। তারা জানেন, দান সম্পদ কমায় না; বরং বরকত বৃদ্ধি করে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ

‘যারা স্বচ্ছলতা ও অভাব—উভয় অবস্থায় ব্যয় করে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৪)

২. ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ

রাগ মানুষের বিবেককে আচ্ছন্ন করে ফেলে। মুত্তাকিরা ক্রোধের সময় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ

‘যারা নিজেদের ক্রোধ সংবরণ করে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৪)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ

‘প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (বুখারি ৬১১৪, মুসলিম ২৬০৯)

৩. মানুষকে ক্ষমা করে দেওয়া

মুত্তাকিরা প্রতিশোধপরায়ণ হন না। মানুষের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়ার মাধ্যমে তারা আল্লাহর ক্ষমা লাভের আশা করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ

‘যারা মানুষকে ক্ষমা করে দেয়; আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৪)

৪. ভুলের পর দ্রুত তওবা

মুত্তাকিরা নিষ্পাপ নন; তবে তাদের বিশেষত্ব হলো, ভুল হয়ে গেলে তারা অহংকারে অটল থাকে না। বরং দ্রুত আল্লাহর কাছে ফিরে আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ

‘আর যারা কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেলে কিংবা নিজেদের প্রতি জুলুম করে, তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৫)

৫. পাপের উপর অটল না থাকা

তওবার অন্যতম শর্ত হলো পাপের উপর জেদ ধরে না থাকা। মুত্তাকিরা ভুল বুঝতে পারলে তা থেকে ফিরে আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَىٰ مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ

‘এবং তারা জেনে-বুঝে নিজেদের কৃতকর্মের উপর অটল থাকে না।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৫)

৬. সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করা

মুত্তাকিদের হৃদয় আল্লাহর স্মরণে সজীব থাকে। সুখে, দুঃখে, বিপদে কিংবা সফলতায় তারা আল্লাহকে ভুলে যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন—

فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ

‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫২)

মুত্তাকিদের জন্য মহাপুরস্কার

আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের জন্য যে পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন, তা পৃথিবীর কোনো সম্পদের সঙ্গে তুলনীয় নয়। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—

أُولَٰئِكَ جَزَاؤُهُم مَّغْفِرَةٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَجَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا

‘তাদের প্রতিদান হলো তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং এমন জান্নাত, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে; সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৬)

মুত্তাকি হওয়া কোনো নির্দিষ্ট পোশাক, পরিচয় বা বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়; বরং এটি এমন এক হৃদয়ের অবস্থা, যা সর্বদা আল্লাহকে ভয় করে, তার সন্তুষ্টি কামনা করে এবং ভুল হলে দ্রুত তার দিকে ফিরে আসে।

সচ্ছলতা ও অভাব— উভয় অবস্থায় দানশীল হওয়া, ক্রোধ সংবরণ করা, মানুষকে ক্ষমা করা, পাপের পর দ্রুত তওবা করা, সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা এবং সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করা— এসবই মুত্তাকিদের পরিচয়।

আসুন, আমরা দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে আল্লাহর মাগফিরাত ও জান্নাত লাভের প্রতিযোগিতায় শামিল হই। কেননা সফল সেই ব্যক্তি, যে মুত্তাকি হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। তাইতো মুমিনের মুখ ফুটে বেরিয়ে আসে—

اللّٰهُمَّ اجْعَلْنَا مِنَ الْمُتَّقِينَ

‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে মুত্তাকিদের অন্তর্ভুক্ত করে দিন।’ আমিন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম