Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

কাউকে টাকা ধার দেওয়া-নেওয়া সম্পর্কে যা বললেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ১১:১৪ পিএম

কাউকে টাকা ধার দেওয়া-নেওয়া সম্পর্কে যা বললেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

শায়খ আহমাদুল্লাহ। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

Advertisement

মানুষের জীবনে এমন অনেক সময় আসে, যখন প্রয়োজন পূরণে অন্যের সহযোগিতার দরকার হয়। কখনো ব্যবসার প্রয়োজনে, কখনো চিকিৎসার জন্য, আবার কখনো পারিবারিক সংকট মোকাবিলায় ঋণ বা ধার নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। ইসলাম মানবজীবনের এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করেনি; বরং ঋণ গ্রহণ ও ঋণ প্রদানের জন্য সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা নির্ধারণ করেছে। একদিকে যেমন প্রকৃত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ঋণ গ্রহণকে বৈধ করা হয়েছে, অন্যদিকে ঋণ পরিশোধে অবহেলা, তালবাহানা এবং অসততাকে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে। একইসঙ্গে অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ঋণ দেওয়াকে সওয়াবপূর্ণ ও মহৎ আমল হিসেবে উৎসাহিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে মূল্যবান দিকনির্দেশনা তুলে ধরেছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ।

শায়খ আহমাদুল্লাহকে প্রশ্ন করা হয়— কাউকে টাকা ধার দেওয়া-নেওয়ার ইসলামি বিধান কী?

শায়খ আহমাদুল্লাহ এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন— ‘শরীয়া দৃষ্টিকোন থেকে টাকা ধার নেওয়া, কারো কাছ থেকে ঋণ নেওয়া এটা জায়েজ আছে যদি কারো প্রয়োজন হয়। খোদ নবী করীম (সা.) ঋণ গ্রহণ করেছেন, সাহাবিদের মধ্যে ঋণ গ্রহণ করা দেওয়া— এগুলো প্রচলন ছিল। অতএব কারো প্রয়োজন হলে ঋণ গ্রহণ করতে কারো কাছ থেকে কোনো অসুবিধা নেই। তবে ঋণ হতে হবে প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে। যেন তেন কারণে একান্ত প্রয়োজন না হলে মানুষের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া— এটা খুব ভালো কোনো কাজ না।

মানুষের কাছে ঋণের জন্য হলেও যে হাত পাতা হয়, চাওয়া হয়; সে চাওয়াটা হবে একান্ত প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে। যদিও এটা তার কাছ থেকে দান বা দক্ষিণা চাওয়া নয় বরং ঋণ চাওয়া। কিন্তু তারপরও এটা যখন প্রয়োজন হবে তখনই চাওয়া উচিত।

তিনি বলেন, আজকাল দেখা যায় অনেকে ঠুনকো কোনো কারণে যেটা আসলে খুব বেশি একান্ত প্রয়োজনের সীমানায় ফেলার মতো না; সে রকম বিষয়ের জন্য যেন তেনো কারণে ঋণ করে। অতএব জরুরতের ভিত্তিতে কোনো প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে ঋণ গ্রহণ করা ঋণ নেওয়া এটা জায়েজ আছে তবে তার জন্য শর্ত হলো— সুদমুক্ত ঋণ নেওয়া। এবং সেই সাথে শর্ত হলো— ঋণ আদায়ে সদ্বিচ্ছা থাকতে হবে।

আজকাল অনেকে ঋণ নেন কিন্তু আদায় করার ব্যাপারে সদ্বিচ্ছা নেই। কারো কাছ থেকে সরাসরি চাইতে অসুবিধা, সে জন্য  ঋণের কথা বলে চান, ওনার নিয়ত হলো দেবেন না। যে তার অনেক আছে, ডাইরেক্ট চাই কীভাবে। এ জন্য ঋণের কথা বলে চাই। অর্থাৎ ঋণ নেওয়ার সময় নিয়তই হলো এটা আর ফেরত দেবো না। তো এ রকম উদ্দেশ্যে যদি ঋণ গ্রহণ করা হয় তাহলে সেটা জায়েজ নেই।

তিনি আরও বলেন, পরিশোধ করার পাক্কা এরাদা আছে, নিয়ত আছে, প্ল্যান-পরিকল্পনা আছে এবং সুধভিত্তিক কোনো ঋণ নিচ্ছেন না এ রকম যদি হয় তাহলে সেক্ষেত্রে একান্ত জরুরতের ভিত্তিতে ঋণ গ্রহণ করা জায়েজ আছে।

আর যিনি ঋণ দেবেন, তার জন্য এটা সর্বাবস্থায় প্রসংশনীয়; বিশেষ করে কাউকে যদি ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে তার কোনো বিপদ দূর হয়, তার কোনো কষ্ট দূর হয়, তার কোনো বিশেষ উপকার হয়; তাহলে সেক্ষেত্রে ঋণ দেওয়াটা এটা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি কাজ। 

অনেক ওলামায়ে কেরাম ঋণ দেওয়াটাকে মুস্তাহাব বলেছেন। 

বিশেষ করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দান করার চাইতেও ঋণ দেওয়ার সওয়াবের পরিমাণ বেশি বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত রয়েছে। এখন প্রশ্ন ওঠতে পারে— দানের ক্ষেত্রে তো একটা মানুষকে পুরোপুরি দিয়ে দেওয়া হয়। আর ঋণের ক্ষেত্রে তো পুরোপুরি দেওয়া হয় না। তাহলে পুরোপুরি দিয়ে দিলে তার চাইতে আবার ঋণের ফজিলত সওয়াব বেশি কীভাবে হতে পারে।

এর উত্তর হলো— এটা সব ক্ষেত্রে সাধারণ অর্থে হয়তো প্রযোজ্য না। এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা মুহাদ্দিসিনেকেরাম দিয়েছেন। এর একটা প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যা হলো— কোনো ব্যক্তিকে দান করা হয়েছে; এ দানটা না হলে তার যে অনেক অসুবিধা হতো এ রকম না। এমত পরিস্থিতিতে বা এ ধরনের পরিস্থিতিতে যে দান হয়ে থাকে সেই দানের তুলনায় ওই ঋনের সওয়াব বেশি, যে ঋণ একটা মানুষের অনেক উপকার করবে। তার অনেক বড় বিপদ থেকে রক্ষা হবে। তাহলে একজনকে আপনি দশ বিশ পঞ্চাশ একশ টাকা দান করলেন; এটা না করলেও আসলে এটা তার তেমন কিছু হতো না; এটা নেয়াতে তার উপকার হয়েছে কিন্তু আহামরি কিছু না। আর এর বিপরীতে একই পরিমাণ টাকা যদি আরেকজনকে ঋণ দেওয়া হয়, তাহলে তার বিরাট উপকার হবে। এমত পরিস্থিতিতে প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে কোনো কোনো জায়গায় দানের চাইতে ঋণের, ঋণ দেওয়ার উপকারিতা ঋণ গ্রহীতার জন্য প্রযোজ্য হয়; সে রকম পরিস্থিতিতে দানের চাইতেও ঋণের সওয়াব বেশি হবে। আল্লাহই ভালো জানেন।

শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, তাহলে খোলাসা কথা হলো— জরুরত হলে কোনো বিশেষ প্রয়োজন হলে কারো কাছ থেকে ধার নেওয়া, ঋণ নেওয়া জায়েজ আছে; কিন্তু সেটা পরিশোধ করার সদ্বিচ্ছা থাকতে হবে। ঋণ দেওয়ার অনেক মানুষের সদ্বিচ্ছা আছে, অনেকে ঋণ দিতে চান কিন্তু ঋণ গ্রহিতারা তালবাহানা করেন, পরিশোধ করতে চান না, ঘুরান; এ বদঅভ্যাস এবং এই খারাপ কালচার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে ঋণ দেওয়ার যে আমলটা আছে, এটা সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এবং মানুষ সুদী ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যেতে হচ্ছে। তো এই জন্য যারা ঋণ নিয়ে সেটা তালবাহানা করেন, ঘুরান, দিতে চান না; তারা মূলত সুদকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে একটা ভূমিকা রাখছেন। ব্যাপারটা অনেকটা এ রকম।

নবী করীম (সা.) বলেছেন—

‘একজন স্বচ্ছল মানুষ, সে ঋণ নেওয়ার পরে যদি তালবাহানা করে এবং দিতে না চায়, ঘুরাঘুরি করায়; তাহলে সেক্ষেত্রে সেটা স্পষ্ট জুলুম।’

এ জন্য কারো কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার পর সেটা পরিশোধ করার জন সদ্বিচ্ছা থাকতে হবে। স্পষ্ট সময় দেওয়ার জন্য নিয়ত থাকতে হবে, পরিকল্পনা থাকতে হবে; তাহলে ঋণ নেওয়াটা জায়েজ আছে।

ঋণ কোনো খেলাচ্ছলে নেওয়ার বিষয় নয়; এটি মানুষের হক এবং একটি গুরুতর আমানত। তাই প্রয়োজন ছাড়া ঋণ গ্রহণ করা যেমন অনুচিত, তেমনি ঋণ নিয়ে পরিশোধে গড়িমসি করাও বড় ধরনের অন্যায় ও জুলুম। একজন মুমিনের উচিত ঋণ গ্রহণের সময় তা পরিশোধের দৃঢ় নিয়ত ও বাস্তব পরিকল্পনা রাখা। অন্যদিকে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের উচিত বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং যথাসম্ভব সুদমুক্ত ঋণের মাধ্যমে তাদের কষ্ট লাঘব করা। ব্যক্তি ও সমাজ উভয় পর্যায়ে এই ইসলামী সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে, মানুষের কষ্ট কমবে এবং সুদভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতাও হ্রাস পাবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে মানুষের হক আদায় করার, আমানত রক্ষা করার এবং ইসলামের সুন্দর অর্থনৈতিক শিক্ষার ওপর চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

সূত্র: শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিডিও থেকে নেওয়া।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম