Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

ফ্রান্সে ইসলামের পদচারণা: কখন ও কীভাবে?

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ১০:১২ পিএম

ফ্রান্সে ইসলামের পদচারণা: কখন ও কীভাবে?

প্যারিসের গ্র্যান্ড মসজিদের প্রধান ফটক। ছবি: সংগৃহীত

আজকের ফ্রান্স শুধু ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রই নয়, বরং এটি ইউরোপের বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর অন্যতম আবাসস্থল। খ্রিষ্টধর্মের পর ইসলাম বর্তমানে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম। তবে ফ্রান্সে ইসলামের উপস্থিতি কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়। প্রায় তেরো শতাব্দী ধরে যুদ্ধ, অভিবাসন, উপনিবেশবাদ, সামাজিক পরিবর্তন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে ইসলাম ফরাসি সমাজে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। ইতিহাসের নানা বাঁক পেরিয়ে গড়ে ওঠা এই যাত্রা আজ ফ্রান্সকে ইউরোপে মুসলিম উপস্থিতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

উমাইয়া যুগে ফ্রান্সে ইসলামের প্রথম আগমন

ফ্রান্সে ইসলামের প্রথম পদচিহ্ন অষ্টম শতাব্দীতে দেখা যায়। উমাইয়া খেলাফতের বাহিনী ইবেরিয়ান উপদ্বীপ (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) জয় করার পর দক্ষিণ ফ্রান্সে প্রবেশ করে। ৭৩২ খ্রিষ্টাব্দে বিখ্যাত ট্যুরসের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পিছু হটলেও সেপ্টিমানিয়া অঞ্চলে তাদের প্রভাব ৭৫৯ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল।

পরবর্তীতে আন্দালুসিয়ার মুসলিম শক্তি দক্ষিণ ফ্রান্সের ফ্রাক্সিনেটুম অঞ্চলে একটি শক্তিশালী দুর্গ গড়ে তোলে। ৮৮৭ সালে মুসলিম বাহিনী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি দখল করে ‘আমিরাত অব ফ্রাক্সিনেট’ প্রতিষ্ঠা করে, যা প্রায় এক শতাব্দী ধরে, অর্থাৎ ৯৭৫ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল।

মধ্যযুগের আরও পরে, ১৫৪৩-৪৪ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের বিখ্যাত নৌসেনাপতি খায়রুদ্দিন বারবারোসার নেতৃত্বে তুলোঁ শহর সাময়িকভাবে অটোমান নৌঘাঁটিতে পরিণত হয়। সেই সময় শহরের প্রধান ক্যাথেড্রালকে অস্থায়ীভাবে মসজিদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। আবার ১৬০৯ থেকে ১৬১৪ সালের মধ্যে স্পেন থেকে বিতাড়িত প্রায় ৫০ হাজার মরিস্কো ফ্রান্সে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

ঔপনিবেশিক যুগ ও মুসলিম উপস্থিতির বিস্তার

ফ্রান্সে স্থায়ী মুসলিম জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি শুরু হয় ঔপনিবেশিক যুগে। ১৮৩০ সালে আলজেরিয়া, ১৮৮১ সালে তিউনিসিয়া এবং ১৯১২ সালে মরক্কো ফরাসি শাসনের অধীনে আসে। এই তিন অঞ্চলকে একত্রে বলা হতো ‘মাগরিব’।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) মুসলিম উপস্থিতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়। প্রায় তিন লাখ উত্তর আফ্রিকান মুসলিমকে ফরাসি সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের একটি বড় অংশ যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করেন এবং অনেকে প্রাণ উৎসর্গ করেন।

যুদ্ধ শেষে অনেক মুসলিমকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হলেও প্রায় ৮০ হাজার মানুষ ফ্রান্সেই থেকে যান। মুসলিম সৈনিকদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯২০ সালে ফরাসি পার্লামেন্ট প্যারিসে একটি বৃহৎ মসজিদ নির্মাণের জন্য বিশেষ আইন পাস করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক ‘গ্রান্দ মস্কে দ্য প্যারিস’ (Grande Mosquée de Paris)। বিশেষ করে ভার্দুনের যুদ্ধে নিহত মুসলিম সৈনিকদের স্মরণে এই মসজিদ নির্মিত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও নতুন অভিবাসন প্রবাহ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও মুসলিম অভিবাসনকে ত্বরান্বিত করে। ১৯৪২ সালে উত্তর আফ্রিকায় মিত্রবাহিনীর অভিযান শুরুর পর প্রায় এক লাখ মুসলিম ফ্রি ফরাসি বাহিনীতে যোগ দেন। যুদ্ধ শেষে তাঁদের অনেকেই ফ্রান্সে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

১৯৪৫ সালে ফ্রান্সে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ। কিন্তু ১৯৬২ সালে আলজেরিয়ার স্বাধীনতার সময় তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় চার লাখে।

হার্কি ও শ্রমিক অভিবাসনের প্রভাব

আলজেরিয়ার স্বাধীনতার পর মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির পেছনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল।

প্রথমত, হার্কিদের আগমন। হার্কিরা ছিলেন সেই আলজেরীয় মুসলিম, যারা স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ফরাসি বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন। স্বাধীনতার পর তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো হয়। প্রায় ২০ হাজার হার্কি ও তাঁদের পরিবার ফ্রান্সে আশ্রয় নেন, যার মোট সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৭৫ হাজার।

দ্বিতীয়ত, শ্রমিক অভিবাসন। যুদ্ধোত্তর শিল্পায়নের কারণে ফ্রান্সে ব্যাপক শ্রমশক্তির প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৬২ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ শ্রমিক, বিশেষ করে আলজেরিয়া ও মরক্কো থেকে, ফ্রান্সে পাড়ি জমান।

১৯৭৪: অভিবাসন নীতির মোড় পরিবর্তন

১৯৭৩ সালের বৈশ্বিক তেল সংকটের পর প্রেসিডেন্ট ভালেরি জিসকার দ্যেস্তাঁ ১৯৭৪ সালে অর্থনৈতিক অভিবাসন সীমিত করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু বাস্তবে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।

বরং অনেক অভিবাসী বুঝতে পারেন যে ভবিষ্যতে ফ্রান্সে আসা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফলে তাঁরা পরিবার-পরিজনকে নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭৬ সালে পারিবারিক পুনর্মিলন নীতি কার্যকর হওয়ার পর মুসলিম পরিবারগুলোর আগমন আরও বৃদ্ধি পায়।

১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁ ক্ষমতায় আসার সময় ফ্রান্সে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২০ লাখে পৌঁছে যায়।

বর্তমান ফ্রান্সে মুসলিম জনগোষ্ঠী

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মুসলিম জনসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

  • ১৯৪৫ সালে প্রায় ১ লাখ
  • ১৯৬০ সালে প্রায় ৪ লাখ
  • ১৯৭৫ সালে ১০ লাখের বেশি
  • ১৯৯৯ সালে প্রায় ৪১ লাখ ৫৫ হাজার

১৯৯৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী—

জাতীয় উৎস            সংখ্যা

আলজেরীয়            ১৫,৫০,০০০

মরক্কান                   ১০,০০,০০০

তিউনিসিয়ান           ৩,৫০,০০০

তুর্কি                        ৩,১৫,০০০

কৃষ্ণ আফ্রিকান ২,৫০,০০০

নবমুসলিম              ৪০,০০০

অবৈধ অভিবাসী    ৩,৫০,০০০

অন্যান্য                  ২,০০,০০০

মোট                        ৪১,৫৫,০০০

২০১৯-২০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফ্রান্সের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১০ শতাংশ মুসলিম। ১৯৮৫ সালে এই হার ছিল মাত্র ০.৫ শতাংশ।

মুসলিমদের ভৌগোলিক অবস্থান

ফ্রান্সের মুসলিম জনগোষ্ঠী মূলত বড় শহরকেন্দ্রিক।

Paris ও আশপাশের ইল-দ্য-ফ্রাঁস অঞ্চলে প্রায় ৩৮ শতাংশ

Marseille ও Nice অঞ্চলে প্রায় ১৩ শতাংশ

Lyon ও Grenoble অঞ্চলে প্রায় ১০ শতাংশ মুসলিম বসবাস করেন।

মসজিদ ও সাংগঠনিক বিকাশ

২০০১ সালে ফ্রান্সে ১,৫৫৮টি নামাজের স্থান ছিল। পরবর্তী সময়ে এ সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৮ সালে প্রায় ২,১২৫-এ পৌঁছায়। ২০০২ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Nicolas Sarkozy ফরাসি মুসলিমদের প্রতিনিধিত্বের জন্য Conseil Français du Culte Musulman গঠনের উদ্যোগ নেন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র ও মুসলিম সমাজের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের একটি কাঠামো গড়ে ওঠে।

ধর্মীয় চর্চায় নতুন জাগরণ

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ফ্রান্সের মুসলিম সমাজে ধর্মীয় অনুশীলনের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রতিদিন নামাজ আদায়: ১৯৮৯ সালে ৪১%, ২০২৫ সালে ৬২%

জুমার নামাজে অংশগ্রহণ: ১৬% থেকে বেড়ে ৩৫%

রমজানের রোজা পালন: ৬০% থেকে বেড়ে ৭৩%

এই পরিসংখ্যান দেখায় যে নতুন প্রজন্মের মুসলিমদের মধ্যেও ধর্মীয় পরিচয় ও চর্চা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

লায়িসিতে, হিজাব বিতর্ক ও রাষ্ট্র-ইসলাম সম্পর্ক

ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষতা বা ‘লায়িসিতে’ নীতি মুসলিম সমাজের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ককে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে। ১৯৮৯ সালে হিজাব পরার কারণে কয়েকজন মুসলিম ছাত্রীকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করার ঘটনা জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে স্কুলে দৃশ্যমান ধর্মীয় প্রতীক নিষিদ্ধ করার আইন পাস হয়, যার আওতায় হিজাবও পড়ে।

তবে একই সময়ে রাষ্ট্রকে মুসলিমদের হালাল খাদ্য, কবরস্থান, কারাগারে ইমাম নিয়োগ এবং ধর্মীয় সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কেও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

অতীতের ক্ষত ও পুনর্মিলনের প্রচেষ্টা

আলজেরিয়া যুদ্ধ এবং ঔপনিবেশিক ইতিহাসের স্মৃতি আজও ফরাসি সমাজে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। প্যারিসের বিভিন্ন স্থানে নিহত মুসলিম সৈনিক ও আলজেরীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকদের স্মরণে স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছে।

হার্কিদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রীয় সম্মান দিবস চালু করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ অতীতের জটিল ইতিহাসকে স্বীকার করে পারস্পরিক বোঝাপড়ার একটি নতুন অধ্যায় রচনার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়।

ফ্রান্সে ইসলামের ইতিহাস কেবল অভিবাসনের ইতিহাস নয়; এটি সভ্যতা, যুদ্ধ, ত্যাগ, সহাবস্থান এবং পরিচয়ের দীর্ঘ অভিযাত্রা। উমাইয়া যুগের প্রথম পদচিহ্ন থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপের বৃহত্তম মুসলিম সম্প্রদায়গুলোর একটিতে পরিণত হওয়া—এই পথচলা বহু শতাব্দীর। আজকের ফ্রান্সে ইসলাম শুধু একটি ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং দেশটির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভবিষ্যতেও ফরাসি সমাজ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও সহাবস্থানের মাধ্যমে আরও গভীর ও অর্থবহ হয়ে উঠবে—এটাই প্রত্যাশা।

—আইফপ, ব্রোকিং, উইকিপিডিয়া, মিডল ইস্ট ফোরাম অবলম্বনে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম