Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

বন্যায় ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারালে মুমিনের করণীয় কী?

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম

বন্যায় ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারালে মুমিনের করণীয় কী?

ছবি: সংগৃহীত

বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মুহূর্তের মধ্যেই মানুষের বহু বছরের কষ্টার্জিত সম্পদ, ঘরবাড়ি, ফসল ও জীবিকার উৎস ধ্বংস করে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অসহায়ত্ব, দুঃখ ও অনিশ্চয়তা স্বাভাবিক। কিন্তু একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি শুধু দুনিয়ার ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিটি বিপদের পেছনেই আল্লাহর হিকমত রয়েছে। কুরআন ও সহিহ হাদিস আমাদের শেখায়— ধৈর্য, আল্লাহর ওপর ভরসা এবং তার ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি একজন মুমিনের জন্য দুনিয়ার ক্ষতিকে আখিরাতের মহাপুরস্কারে পরিণত করতে পারে।

বন্যায় সম্পদ হারানো: একজন মুমিনের জন্য কী শিক্ষা?

ইসলামের দৃষ্টিতে বন্যায় ঘরবাড়ি বা সম্পদ হারানো একজন মুমিনের জন্য ধৈর্যের পরীক্ষা। তিনি ধৈর্য ধারণ করলে এটি গুনাহ মাফ, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আখিরাতে মহান প্রতিদানের কারণ হতে পারে। পাশাপাশি বন্যার পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারীর জন্য সহিহ হাদিসের আলোকে শহীদের মর্যাদা লাভের আশা করা যায়।

বিপদ ইমানের পরীক্ষা

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সম্পদের ক্ষতি সব সময় অমঙ্গলের নিদর্শন নয়; অনেক সময় এটি ঈমানের পরীক্ষা। কুরআনের বাণী—

وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ

‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫৫)

এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন—

الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ ۝ أُولَٰئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ

‘যারা বিপদে পড়ে বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই তার কাছেই ফিরে যাব। তাদের ওপর তাদের রবের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং তারাই সঠিক পথপ্রাপ্ত।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫৬–১৫৭)

সম্পদ আল্লাহর আমানত

দুনিয়ার সব সম্পদই মূলত আল্লাহর দেওয়া আমানত। তিনি তার হিকমত অনুযায়ী কাউকে সম্পদ দান করেন, আবার তার ইচ্ছায় তা ফিরিয়েও নেন। তাই সম্পদ হারিয়ে হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

মুসিবতের সময়ের দোয়া

হজরত উম্মে সালামাহ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি বিপদের সময় এ দোয়া পড়বে, আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করবেন।

إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَاخْلُفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا

উচ্চারণ: ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহুম্মা জুরনি ফি মুসিবাতি, ওয়াখলুফ লি খাইরাম মিনহা।’

অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং তার কাছেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার এই বিপদে আমাকে সওয়াব দান করুন এবং এর পরিবর্তে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন।’ (মুসলিম ৯১৮)

বিপদের প্রতিটি কষ্ট গুনাহ মাফের কারণ

বন্যার পানিতে ভিজে থাকা, আশ্রয়ের অভাব, ক্ষুধা, উদ্বেগ কিংবা দুশ্চিন্তা— মুমিনের প্রতিটি কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ তার গুনাহ ক্ষমা করে দেন। হাদিসের বাণী—

مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ

‘মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে ক্লান্তি, রোগ, দুশ্চিন্তা, শোক, কষ্ট কিংবা যন্ত্রণা আসে— এমনকি একটি কাঁটার আঘাতও— এর বিনিময়ে আল্লাহ তার গুনাহগুলো মাফ করে দেন।’ (বুখারি ৫৬৪১, মুসলিম ২৫৭৩)

বন্যায় মৃত্যু ও শহীদের মর্যাদা

বন্যায় সম্পদ হারানোর চেয়েও বড় কষ্ট হলো প্রিয়জনকে হারানো। সহিহ হাদিসে পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারীকে শহীদের মর্যাদাপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। হাদিসের বাণী—

الشُّهَدَاءُ خَمْسَةٌ: الْمَطْعُونُ، وَالْمَبْطُونُ، وَالْغَرِقُ، وَصَاحِبُ الْهَدْمِ، وَالشَّهِيدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ

‘শহীদ পাঁচ প্রকার— মহামারিতে মৃত ব্যক্তি, পেটের রোগে মৃত ব্যক্তি, পানিতে ডুবে মৃত ব্যক্তি, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃত ব্যক্তি এবং আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া ব্যক্তি।’ (বুখারি ২৮২৯, মুসলিম ১৯১৪)

তাই যদি কেউ বন্যার পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেন, তবে সহিহ হাদিসের আলোকে তার জন্য শহীদের মর্যাদা লাভের আশা করা যায়। তবে চূড়ান্ত প্রতিদান ও মর্যাদা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই নির্ধারণ করবেন।

বিপদ মানেই কি আল্লাহর গজব?

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলেই অনেকেই সেটিকে আল্লাহর গজব বা শাস্তি বলে মন্তব্য করেন। কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর আলোকে কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগকে নিশ্চিতভাবে আল্লাহর গজব বলা যায় না। এ ধরনের ঘটনা কারও জন্য সতর্কবার্তা হতে পারে, আবার কারও জন্য ইমানের পরীক্ষা, গুনাহ মাফ এবং মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যমও হতে পারে। তাই দুর্যোগের সময় নিজের আমল সংশোধন করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ইসলামের শিক্ষা।

আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ানোও ইবাদত

বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি মহান ইবাদতও। হাদিসের বাণী—

مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا نَفَّسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ

‘যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোনো মুমিনের একটি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন।’ (মুসলিম ২৫৮০)

তাই খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া একজন মুসলিমের জন্য অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।

ধৈর্যশীলদের জন্য রয়েছে সীমাহীন প্রতিদান

আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ

‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অগণিতভাবে দেওয়া হবে।’ (সুরা আয-যুমার: আয়াত ১০)

একজন মুমিনের কাছে বন্যায় হারিয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি বা সম্পদই জীবনের শেষ কথা নয়। যদি তিনি ধৈর্য ধারণ করেন, আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন এবং তার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করেন, তবে দুনিয়ার এই ক্ষতি আখিরাতে অসীম প্রতিদানের কারণ হতে পারে। পাশাপাশি বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের কষ্ট লাঘবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা এবং আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা একজন প্রকৃত মুমিনের দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বিপদে ধৈর্য ধারণ করার এবং মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .