যেখানে যুক্তি থেমে যায়, সেখানেই তাওয়াক্কুলের সূচনা
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৫:০২ পিএম
আল্লাহর ওপর ভরসা— মুমিনের অটল শক্তি। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানুষের জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে, যখন চারপাশে কোনো সমাধান চোখে পড়ে না। সব দরজা যেন বন্ধ মনে হয়, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। ঠিক সেই সময় একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাওয়াক্কুল— আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও নির্ভরতা। তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়; বরং নিজের সাধ্যের সবটুকু চেষ্টা করে ফলাফলের দায়িত্ব আল্লাহর হাতে সঁপে দেওয়া। ইতিহাসের প্রতিটি নবীর জীবন আমাদের শেখায়, আল্লাহর ওপর ভরসা কখনো ব্যর্থ হয় না।
আল্লাহর ওপর ভরসা— মুমিনের অটল শক্তি
যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, সে কখনো একা নয়। কারণ তার সঙ্গে থাকেন সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক।
১. হজরত ইউসুফ (আ.) জানতেন না, তাঁর জন্য বন্ধ দরজাগুলো অলৌকিকভাবে খুলে যাবে। তবুও তিনি পাপের আহ্বান থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য প্রাণপণে দরজার দিকে ছুটে গিয়েছিলেন। তিনি আল্লাহকে ভয় করেছিলেন, আর আল্লাহ তার জন্য মুক্তির পথ তৈরি করেছিলেন।
২. হজরত মুসা (আ.) জানতেন না, সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত হয়ে পথ সৃষ্টি হবে। সামনে ছিল উত্তাল সাগর, পেছনে ফিরআউনের বিশাল বাহিনী। তবুও তিনি আল্লাহর নির্দেশে সামনে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল— আল্লাহ কখনো তার বান্দাকে পরিত্যাগ করেন না।
তারা জানতেন না কীভাবে আল্লাহ সাহায্য করবেন; কিন্তু তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন আল্লাহ অবশ্যই সাহায্য করবেন। এটাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।
কুরআনের ঘোষণা
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ ۚ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا
‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তবে তিনিই তার জন্য যথেষ্ট। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার ইচ্ছা পূর্ণ করেই থাকেন। আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর জন্য একটি নির্ধারিত পরিমাপ স্থির করে রেখেছেন।’ (সুরা আত-তালাক: আয়াত ৩)
আরও একটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
‘অতঃপর যখন তুমি দৃঢ় সংকল্প করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৫৯)
হাদিসের আলোকে তাওয়াক্কুল
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَوْ أَنَّكُمْ تَتَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرُزِقْتُمْ كَمَا يُرْزَقُ الطَّيْرُ، تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا
‘তোমরা যদি আল্লাহর ওপর প্রকৃত তাওয়াক্কুল করতে, তবে তিনি তোমাদের এমনভাবে রিজিক দিতেন যেমন তিনি পাখিদের রিজিক দেন। তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।’ (তিরমিজি ২৩৪৪, ইবনে মাজাহ ৪১৬৪)
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ، وَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ، وَلَا تَعْجِزْ
‘যা তোমার উপকারে আসে, তার প্রতি যত্নবান হও; আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর এবং কখনো দুর্বল হয়ে পড়ো না।’ (মুসলিম ২৬৬৪)
তাওয়াক্কুল মানে অলৌকিক ঘটনার অপেক্ষায় বসে থাকা নয়; বরং সৎ পথে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা এবং ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকা। ইউসুফ (আ.) দৌড়েছিলেন, মুসা (আ.) এগিয়ে গিয়েছিলেন— তারপর আল্লাহ তার অদৃশ্য সাহায্য পাঠিয়েছিলেন। তাই জীবনের প্রতিটি সংকট, দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার মুহূর্তে মনে রাখি— আল্লাহর পরিকল্পনা আমাদের কল্পনার চেয়েও উত্তম। যে হৃদয় আল্লাহর ওপর ভরসা করে, সে কখনো প্রকৃত অর্থে একা হয় না; কারণ তার অভিভাবক স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।

