অন্যায়ের প্রতিবাদে নবীজির (সা.) শেখানো শিষ্টাচারের অনন্য দৃষ্টান্ত
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানুষের সমাজে অন্যায়, জুলুম ও অবিচার নতুন কোনো বিষয় নয়। যুগে যুগে সত্য ও ন্যায়ের অনুসারীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন এবং জুলুমের প্রতিরোধ করেছেন। ইসলামও একজন মুমিনকে অন্যায়ের সামনে নীরব দর্শক হয়ে থাকতে শিক্ষা দেয় না। বরং অন্যায়ের প্রতিবাদকে ঈমানের দাবি হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে সেই প্রতিবাদ যেন আবেগনির্ভর, প্রতিহিংসাপরায়ণ কিংবা বিশৃঙ্খল না হয়—সেদিকেও ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে।
আজকের পৃথিবীতে প্রতিবাদের নামে অনেক সময় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, গালিগালাজ, অপপ্রচার কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে দিতে দেখা যায়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের এমন এক আদর্শ শিখিয়েছেন, যেখানে প্রতিবাদ হবে সত্যের পক্ষে, ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে, শিষ্টাচারের সঙ্গে এবং মানুষের কল্যাণকে সামনে রেখে। একজন মুমিনের প্রতিবাদ কখনো নতুন অন্যায়ের জন্ম দেয় না; বরং অন্যায় দূর করে সমাজে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে।
অন্যায়ের প্রতিবাদ ইমানের দায়িত্ব
ইসলাম জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াকে ইমানের অপরিহার্য দাবি হিসেবে বিবেচনা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَا يُحِبُّ اللّٰهُ الْجَهْرَ بِالسُّوٓءِ مِنَ الْقَوْلِ إِلَّا مَنْ ظُلِمَ ۚ وَكَانَ اللّٰهُ سَمِيعًا عَلِيمًا
‘আল্লাহ প্রকাশ্যে মন্দ কথা বলা পছন্দ করেন না। তবে যার ওপর জুলুম করা হয়েছে, তার কথা ভিন্ন। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১৪৮)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, জুলুমের শিকার ব্যক্তি নিজের অধিকার আদায়ের জন্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার রাখে। তবে তা হতে হবে ন্যায়সংগত ও সীমার মধ্যে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذٰلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ
‘তোমাদের কেউ যদি কোনো অন্যায় দেখে, তবে সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে মুখের মাধ্যমে প্রতিবাদ করে। আর যদি সেটিও সম্ভব না হয়, তবে অন্তরে তা ঘৃণা করে। আর এটাই ইমানের দুর্বলতম স্তর।’ (মুসলিম ৪৯)
এখানে ‘হাত দিয়ে প্রতিহত করা’ বলতে বৈধ কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনের কথা বোঝানো হয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। তারা মুখে, লেখনীর মাধ্যমে, আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে।
নীরবতা সবসময় সমাধান নয়
অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ নীরব থাকা ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ، أَوْ لَيُوشِكَنَّ اللّٰهُ أَنْ يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عِقَابًا مِنْهُ، ثُمَّ تَدْعُونَهُ فَلَا يُسْتَجَابُ لَكُمْ
‘তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজে বাধা দেবে। অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের ওপর শাস্তি পাঠাবেন। তখন তোমরা দোয়া করবে, কিন্তু তা কবুল করা হবে না।’ (তিরমিজি ২১৬৯)
এ হাদিস আমাদের শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত অবস্থান নেওয়া একটি সামাজিক ও ইমানি দায়িত্ব।
প্রতিবাদেও রয়েছে শিষ্টাচার ও সীমারেখা
ইসলাম কখনোই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নতুন অন্যায় সৃষ্টি করার অনুমতি দেয় না। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, নিরীহ মানুষের ক্ষতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস কিংবা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللّٰهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ
‘তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৯০)
প্রতিবাদের ভাষাও হতে হবে মার্জিত ও সংযত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَا كَانَ الرِّفْقُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ، وَلَا نُزِعَ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ
‘যে কাজে নম্রতা থাকে, তা সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়। আর যে কাজ থেকে নম্রতা তুলে নেওয়া হয়, তা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে পড়ে।’ (আবু দাউদ ৪৮০৮)
প্রজ্ঞাপূর্ণ প্রতিবাদের অনন্য শিক্ষা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বাস্তব জীবনে প্রতিবাদের এক অনন্য পদ্ধতি শিখিয়েছেন। এক ব্যক্তি প্রতিবেশীর অত্যাচারের অভিযোগ করলে তিনি তাকে ঘরের আসবাবপত্র বাইরে এনে রাখতে বলেন। লোকজন কারণ জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেশীর অন্যায়ের কথা জানান। সমাজের মানুষের নিন্দা শুনে অত্যাচারী প্রতিবেশী লজ্জিত হয়ে নিজের আচরণ সংশোধন করে। (আবু দাউদ ৫১৫৩)
এই ঘটনা প্রমাণ করে, সব প্রতিবাদ সংঘর্ষের মাধ্যমে হয় না; অনেক সময় ধৈর্য, সামাজিক সচেতনতা ও প্রজ্ঞাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিবাদ।
ডিজিটাল যুগে প্রতিবাদের ইসলামী নীতি
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিবাদের অন্যতম বড় মাধ্যম। কিন্তু তথ্য যাচাই ছাড়া কোনো সংবাদ, ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا
‘হে মুমিনগণ! কোনো ফাসিক ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ৬)
একইভাবে অপমান, গালিগালাজ ও চরিত্রহনন থেকেও ইসলাম বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
‘প্রকৃত মুসলমান সে-ই, যার হাত ও জবান থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (বুখারি ১০)
অতএব, অনলাইন কিংবা অফলাইন—উভয় ক্ষেত্রেই একজন মুসলমানের প্রতিবাদ হবে তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল ও শালীন।
ন্যায়বিচারই ইসলামি প্রতিবাদের মূলনীতি
ইসলামে প্রতিবাদের উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নয়; বরং অন্যায় দূর করা এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ
‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার করতে বাধা না দেয়। ন্যায়বিচার কর; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা আল-মায়িদা: আয়াত ৮)
সত্যিকার ইসলামি প্রতিবাদ মানুষের সম্মান রক্ষা করে, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ সুগম করে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা একজন মুমিনের ইমানি দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত শিষ্টাচার, প্রজ্ঞা ও ন্যায়বিচারের আলোকে। একজন মুসলমানের প্রতিবাদ কখনো বিশৃঙ্খলা, প্রতিহিংসা কিংবা সীমালঙ্ঘনের প্রতীক হতে পারে না। বরং তা হবে সত্যের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী উচ্চারণ, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার একটি দায়িত্বশীল প্রয়াস।
আসুন, আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই—কিন্তু সংযম, প্রজ্ঞা, শালীনতা ও ন্যায়বিচারকে সঙ্গে নিয়ে। তাহলেই আমাদের প্রতিবাদ হবে ইবাদত, সমাজের জন্য কল্যাণকর এবং আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে প্রজ্ঞা, শিষ্টাচার ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে অবিচল থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।

