Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

কোন সাহাবি প্রথম মসজিদে বাতি জ্বালানোর প্রচলন করেছিলেন?

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম

কোন সাহাবি প্রথম মসজিদে বাতি জ্বালানোর প্রচলন করেছিলেন?

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

ইসলামের ইতিহাস কেবল যুদ্ধজয়, রাষ্ট্র পরিচালনা কিংবা ইবাদতের ঘটনাপঞ্জি নয়; বরং এটি এমন সব মহান মানুষের জীবনের গল্প, যারা নিজেদের চরিত্র, জ্ঞান, আত্মত্যাগ ও কর্মের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর জন্য স্থায়ী দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর সাহাবিগণ ছিলেন সেই সৌভাগ্যবান প্রজন্ম, যাদের হাতে ইসলামের আলো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায়।

এই সাহাবিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হজরত তামিম ইবন আউস আদ-দারি (রা.)। তিনি ছিলেন একজন ক্বারি, ইবাদতগুজার, জ্ঞানী, মুজাহিদ এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। ইসলামের ইতিহাসে তার নাম বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে— মসজিদে প্রথম বাতি জ্বালানোর প্রচলন, রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর জন্য প্রথম মিম্বর তৈরির প্রস্তাব এবং মসজিদে নিয়মিত ওয়াজ-নসিহতের সূচনার সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে থাকার কারণে। তার জীবন আমাদের শেখায়, একজন মানুষের আন্তরিকতা ও দূরদর্শিতা কীভাবে যুগের পর যুগ মুসলিম সমাজকে উপকৃত করতে পারে।

বংশপরিচয় ও ইসলাম গ্রহণ

হজরত তামিম ইবন আউস আদ-দারি (রা.) ফিলিস্তিন অঞ্চলের প্রসিদ্ধ বনু আদ-দার গোত্রের সন্তান ছিলেন। তার কুনিয়াত ছিল আবু রুকাইয়্যা। ইসলাম গ্রহণের আগে তিনি খ্রিস্টধর্ম অনুসরণ করতেন এবং ধর্মীয় জ্ঞানেও পারদর্শী ছিলেন।

নবুয়তের সংবাদ জানতে পেরে তিনি তার কয়েকজন স্বজনসহ মক্কায় এসে রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরে নবীজির নির্দেশ অনুযায়ী মদিনায় হিজরত করে ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন।

জ্ঞান, তাকওয়া ও ইবাদতে অনন্য

তামিম আদ-দারি (রা.) ছিলেন সাহাবিদের অন্যতম আলেম, ক্বারি এবং হাফেজে কুরআন। তিনি কুরআন তিলাওয়াতে অত্যন্ত মুগ্ধকর কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন।

তার ইবাদতের গভীরতা ছিল বিস্ময়কর। বর্ণিত আছে, এক রাতে তিনি সালাতে দাঁড়িয়ে সুরা আল-মায়িদার একটি আয়াত—

إِن تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِن تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

— বারবার তিলাওয়াত করতে করতে পুরো রাত কাটিয়ে দেন। আল্লাহর ভয়, আশা ও বিনয়ের এমন অপূর্ব সমন্বয় তার ইবাদতের বৈশিষ্ট্য ছিল।

দাজ্জাল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ হাদিসের বর্ণনাকারী

হজরত তামিম আদ-দারি (রা.)-এর সবচেয়ে প্রসিদ্ধ অবদানগুলোর একটি হলো দাজ্জাল ও জাসসাসাহ সম্পর্কিত ঘটনা।

সমুদ্রযাত্রার সময় নিজের দেখা সেই বিস্ময়কর ঘটনার বিবরণ তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর কাছে তুলে ধরেন। নবীজি (সা.) তা সাহাবিদের সামনে বর্ণনা করে বলেন, তামিমের বর্ণনা আমার পূর্বে দাজ্জাল সম্পর্কে যা বলেছি, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই ঘটনাটি সহিহ মুসলিমে বিস্তারিতভাবে সংরক্ষিত রয়েছে এবং ইসলামী আকিদার আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

মসজিদে প্রথম বাতি জ্বালানোর প্রচলন

ইসলামের ইতিহাসে হজরত তামিম আদ-দারি (রা.)-এর একটি স্মরণীয় অবদান হলো— মসজিদে প্রথম প্রদীপ বা বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা করা। বর্ণিত আছে, তার একজন সেবক মসজিদে তেলভর্তি প্রদীপ জ্বালালে রাসুলুল্লাহ (সা.) আনন্দ প্রকাশ করেন। এর আগে মসজিদে সাধারণত খেজুর পাতার আগুনের মাধ্যমে সামান্য আলো করা হতো।

এই উদ্যোগ মুসলিম সমাজে মসজিদের সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা এবং মুসল্লিদের সুবিধার বিষয়ে ইসলামের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর জন্য প্রথম মিম্বর নির্মাণের প্রস্তাব

রাসুলুল্লাহ (সা.) বয়সের কারণে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে খুতবা দিতে কষ্ট অনুভব করলে হজরত তামিম আদ-দারি (রা.) বিনয়ের সঙ্গে একটি মিম্বর নির্মাণের প্রস্তাব দেন।

নবীজি (সা.) সম্মতি দিলে তাঁর জন্য দুই ধাপবিশিষ্ট একটি মিম্বর প্রস্তুত করা হয়। পরবর্তীকালে এই মিম্বর ইসলামী সভা, জুমার খুতবা ও দাওয়াহর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়।

মসজিদে নিয়মিত ওয়াজ-নসিহতের সূচনা

খলিফা হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে হজরত তামিম আদ-দারি (রা.) বারবার অনুমতি চান যেন তিনি মসজিদে মানুষকে কুরআনের শিক্ষা, নসিহত এবং সৎকাজের আহ্বান জানাতে পারেন।

প্রথমে হজরত ওমর (রা.) দ্বিধায় থাকলেও পরে তার জ্ঞান, তাকওয়া ও আন্তরিকতার প্রতি আস্থা রেখে জুমার আগে মানুষকে উপদেশ দেওয়ার অনুমতি দেন। খলিফা হজরত ওসমান (রা.)-এর সময় এই সময়সীমা আরও বৃদ্ধি করা হয়। এ থেকেই মুসলিম সমাজে মসজিদকেন্দ্রিক শিক্ষামূলক আলোচনা ও নসিহতের একটি নিয়মতান্ত্রিক ধারা গড়ে ওঠে।

জিহাদ ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

হজরত তামিম আদ-দারি (রা.) শুধু একজন আলেমই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন সাহসী মুজাহিদও। রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর যুগ থেকে শুরু করে পরবর্তী খলিফাদের আমলেও তিনি বিভিন্ন অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। আল্লাহর পথে ব্যবহৃত ঘোড়ার যত্ন নেওয়ার ব্যাপারেও তিনি অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন।

তিনি বলতেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর কাছ থেকে তিনি শুনেছেন— আল্লাহর পথে ব্যবহৃত ঘোড়ার জন্য যে ব্যক্তি নিজ হাতে খাদ্যের ব্যবস্থা করে, আল্লাহ প্রতিটি দানার বিনিময়ে তাকে একটি করে নেকি দান করেন। এই শিক্ষা তার বিনয়, আন্তরিকতা এবং জিহাদের প্রতি গভীর ভালোবাসার পরিচয় বহন করে।

ইবাদতে আত্মনিবেদন

হজরত তামিম আদ-দারি (রা.)-এর জীবনের আরেকটি অনন্য দিক ছিল তার গভীর ইবাদত। বর্ণিত আছে, একবার ভুলবশত তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করতে না পারায় তিনি নিজেকে কঠোরভাবে আত্মসমালোচনা করেন এবং দীর্ঘ সময় রাতের ইবাদতের মাধ্যমে নিজের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করেন। এ ঘটনা আমাদের শেখায়, নেককার মানুষেরা নিজেদের ছোট ভুলকেও বড় মনে করেন এবং আল্লাহর কাছে আরও বেশি ফিরে আসেন।

ইন্তেকাল

হজরত তামিম আদ-দারি (রা.) ৪০ হিজরিতে শামে (সিরিয়া অঞ্চল) ইন্তেকাল করেন। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, তাকে ফিলিস্তিনের বাইত জিবরিন অঞ্চলে দাফন করা হয়। তিনি এমন এক জীবন রেখে গেছেন, যার আলো যুগের পর যুগ মুসলিম উম্মাহকে পথ দেখিয়ে যাচ্ছে।

হজরত তামিম আদ-দারি (রা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়, ইসলামের সেবা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়; বরং জ্ঞানচর্চা, ইবাদত, দাওয়াহ, মসজিদের উন্নয়ন এবং মানুষের কল্যাণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমেও করা যায়। তিনি ছিলেন এমন একজন সাহাবি, যিনি নিজের প্রজ্ঞা, আন্তরিকতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে ইসলামি সমাজে একাধিক কল্যাণকর প্রথার সূচনা করেছিলেন।

আজকের মুসলিম সমাজও তার জীবন থেকে অনেক শিক্ষা নিতে পারে— মসজিদের প্রতি ভালোবাসা, কুরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক, আন্তরিক ইবাদত, জ্ঞানার্জনের প্রতি আগ্রহ এবং মানুষের হিদায়াতের জন্য নিরলস প্রচেষ্টা। একজন মুমিনের প্রকৃত মর্যাদা তার পদ-মর্যাদায় নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রেখে যাওয়া কল্যাণকর কর্মে। হজরত তামিম আদ-দারি (রা.)-এর জীবন সেই সত্যেরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে তাদের আদর্শ অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

‘আল্লাহ ভালো রেখেছেন’ এ কথা বলার শরয়ি বিধান কী?

‘আল্লাহ ভালো রেখেছেন’ এ কথা বলার শরয়ি বিধান কী?

ইসলামে যাদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধন হারাম

ইসলামে যাদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধন হারাম

যে তিন কাজ মানুষকে জাহান্নামে ঠেলে দেবে

যে তিন কাজ মানুষকে জাহান্নামে ঠেলে দেবে

কিভাবে বুঝবেন আপনার কলব জিন্দা?

কিভাবে বুঝবেন আপনার কলব জিন্দা?

নিরপরাধ মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে কেমন অপরাধ?

নিরপরাধ মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে কেমন অপরাধ?

রিজিক আটকে গেছে, টেনশন পিছু ছাড়ছে না? কী করবেন

রিজিক আটকে গেছে, টেনশন পিছু ছাড়ছে না? কী করবেন

আরও পড়ুন

ব্যবসার আয় বছরের মাঝে বাড়লে যাকাত দেবেন যেভাবে

ব্যবসার আয় বছরের মাঝে বাড়লে যাকাত দেবেন যেভাবে

ফরজ গোসলে নাকের কতটুকু ভেতরে পানি পৌঁছাতে হবে?

ফরজ গোসলে নাকের কতটুকু ভেতরে পানি পৌঁছাতে হবে?

গায়ের জোরে অন্যের জমি ভোগ-দখল, ইসলামে কী শাস্তি?

গায়ের জোরে অন্যের জমি ভোগ-দখল, ইসলামে কী শাস্তি?

পুরুষের কি নারীর মতো লম্বা চুল রাখা জায়েজ? যা বললেন আহমাদুল্লাহ

পুরুষের কি নারীর মতো লম্বা চুল রাখা জায়েজ? যা বললেন আহমাদুল্লাহ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম