স্ত্রীকে কষ্ট দিতে তালাক না দেওয়ার বিধান কী?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২২ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রশ্ন: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। পারিবারিক বিরোধের কারণে স্ত্রীকে বাবার বাড়িতে রাখা হয়েছে। তাদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, মা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত মেয়েটি তার বাবার কাছেই থাকবে। কিন্তু এরপর থেকে স্বামী মেয়েকে তার মায়ের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে দিচ্ছেন না।
স্ত্রীকে জানানো হয়েছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তবে স্বামী মুখে কখনো তালাকের কথা বলেননি এবং এখন পর্যন্ত তালাকও দেননি।
এদিকে প্রায় এক বছর ধরে স্বামী স্ত্রীর ভরণপোষণ বা অন্য কোনো দায়িত্ব পালন করছেন না। তাদের মধ্যে স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্কও নেই বললেই চলে।
স্ত্রীর অভিযোগ, স্বামী ইচ্ছাকৃতভাবে তালাক না দিয়ে তাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে দিয়েছেন, যাতে তিনি অন্যত্র বিয়ে করতে না পারেন। এমন পরিস্থিতিতে স্ত্রী কী করবেন?
শরিয়ত অনুযায়ী তিনি কীভাবে এই বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে মুক্ত হতে পারেন?
উত্তর: ইসলাম অকারণে সংসার ভেঙে ফেলাকে উৎসাহিত করে না। তাই স্বাভাবিক অবস্থায় তালাক ইসলামে পছন্দনীয় নয়।
তবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এমন বিরোধ সৃষ্টি হলে, একসঙ্গে সংসার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং সংশোধনের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখন শরিয়ত বিচ্ছেদের পথও রেখেছে।
এক্ষেত্রে প্রথমে স্বামীকে বুঝিয়ে সংসার রক্ষার চেষ্টা করা উচিত। একান্তভাবে সম্ভব না হলে উভয় পরিবারের মুরব্বি, দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং বিশ্বস্ত আলেমের মাধ্যমে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এ প্রচেষ্টাতেও যদি কোনো সমাধান না হয়, তাহলে শরিয়তসম্মতভাবে বিচ্ছেদের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
স্ত্রীর করণীয়
সাধারণভাবে স্ত্রী নিজে থেকে স্বামীকে তালাক দিতে পারেন না। তবে স্বামী যদি কাবিননামা বা অন্য কোনো বৈধ উপায়ে স্ত্রীকে তালাকের অধিকার অর্পণ করে থাকেন, তাহলে সেই অধিকার অনুযায়ী স্ত্রী নিজের ওপর তালাক কার্যকর করতে পারেন।
বাংলাদেশে প্রচলিত কাবিননামার ১৮ নম্বর ধারায় স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে কি না, তা প্রথমে যাচাই করা প্রয়োজন। সেখানে যদি স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দিয়ে থাকেন এবং সেই ক্ষমতা প্রয়োগের শর্ত পূরণ হয়ে থাকে, তাহলে স্ত্রী স্বামীর নতুন করে অনুমতি নেওয়া ছাড়াই অর্পিত ক্ষমতা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
অন্যদিকে, কাবিননামায় এ ধরনের ক্ষমতা অর্পণ না করা থাকলে স্ত্রী নিজে থেকে তালাক কার্যকর করতে পারবেন না। সে ক্ষেত্রে স্বামীর সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ‘খুলা’ গ্রহণের চেষ্টা করা যেতে পারে। অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে মোহর ফেরত দেওয়া, মাফ করা বা অন্য কোনো সমঝোতার মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটানো যেতে পারে।
প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতিতে করণীয়
প্রায় এক বছর ধরে যদি স্বামী-স্ত্রীর স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন না থাকে, স্বামী স্ত্রীর ভরণপোষণ না দেন, দাম্পত্য অধিকার থেকে স্ত্রীকে বঞ্চিত করেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো সমাধানের উদ্যোগ না নেন, তাহলে বিষয়টি অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখা শরিয়তের উদ্দেশ্য নয়।
প্রথমে উভয় পরিবারের মুরব্বি ও বিশ্বস্ত আলেমের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার শেষ চেষ্টা করা উচিত। একই সঙ্গে কাবিননামা পরীক্ষা করে দেখতে হবে, স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে কি না।
যদি সেই ক্ষমতা না থাকে এবং স্বামী খুলা বা তালাক দিতেও রাজি না হন, তাহলে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ, মুফতি বা ইসলামী সালিশি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসানের শরিয়তসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজন হলে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ীও আইনি পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শুধু স্ত্রীকে অন্যত্র বিয়ে করা থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে তালাক না দিয়ে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা শরিয়তের কাম্য নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা তাদেরকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে আটকে রেখো না, যাতে সীমালঙ্ঘন করো।’ (সূরা আল-বাকারা: ২৩১)
অর্থাৎ স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে বৈবাহিক সম্পর্কে আটকে রাখা জায়েজ নয়। দাম্পত্য সম্পর্ক হয় সুন্দরভাবে বজায় রাখতে হবে, নতুবা সুন্দরভাবে বিচ্ছেদ করতে হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকারসমূহে পরিণত হবে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৭৮)
আরেক হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে আমার বান্দারা! আমি জুলুমকে আমার ওপর হারাম করেছি এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও তা হারাম করেছি। অতএব, তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম করো না।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৭৭)
সুতরাং স্ত্রীর শরিয়তসম্মত অধিকার আদায় না করে, ভরণপোষণ না দিয়ে, দাম্পত্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে এবং দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে দেওয়া অত্যন্ত নিন্দনীয় আচরণ।
বিশেষ করে শুধু স্ত্রীকে আটকে রাখার উদ্দেশ্যে তালাক না দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা জুলুমের শামিল হতে পারে এবং এর জন্য স্বামীকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
তবে শুধু স্বামী তালাক দিচ্ছেন না—এ কারণে স্ত্রী নিজে থেকে অন্যত্র বিয়ে করতে পারবেন না। প্রথম বৈবাহিক সম্পর্ক শরিয়তসম্মতভাবে শেষ হওয়া জরুরি।
তাই এ ধরনের পরিস্থিতিতে আবেগের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে কাবিননামা, পারিবারিক পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য শরিয়তি বিধান যাচাই করে একজন বিশ্বস্ত ও যোগ্য মুফতি বা শরিয়াহ বিশেষজ্ঞের সরাসরি পরামর্শ নেওয়াই উত্তম।
উত্তর দিয়েছেন: মুফতি তাওহীদুল ইসলাম, নায়েবে মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া, সাত মসজিদ, মুহাম্মদপুর, ঢাকা
