স্বামীকে ‘ভাই’ ডাকলে কি তালাক হয়ে যায়?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৭:০৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসলামে বিবাহ কেবল একটি পারিবারিক বা সামাজিক চুক্তি নয়; এটি ভালোবাসা, পারস্পরিক মর্যাদা ও দয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত এক সুদৃঢ় সুন্নতি বন্ধন। একটি সুখী দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক আচরণ, সৌন্দর্যবোধ এবং কথাবলার শালীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সমাজে প্রায়ই এক ধরনের বিভ্রান্তি দেখা যায়—কোনো স্ত্রী যদি স্বামীকে রসিকতা বা অভ্যাসবশত ‘ভাই’ ডেকে ফেলেন, অথবা স্বামী স্ত্রীকে ‘বোন’ বলেন, তবে কি তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে যায়? এটি নিয়ে পরিবারে অযথা ভয় ও সংশয় তৈরি হয়। ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে এর সঠিক ও স্পষ্ট বিধান নিচে তুলে ধরা হলো—
১. মূল বিধান: স্বামীকে ‘ভাই’ বললে কি তালাক হয়ে যায়?
উত্তর— না, স্বামীকে ‘ভাই’ কিংবা স্ত্রীকে ‘বোন’ বললে কোনো অবস্থাতেই তালাক হয়ে যায় না। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, তালাক হওয়ার জন্য তালাকের সুনির্দিষ্ট শব্দ বা স্পষ্ট নিয়ত থাকতে হয়। কেবল ‘ভাই’ বা ‘বোন’ সম্বোধন তালাকের কোনো শব্দ নয়। তাই সাধারণ অবস্থায় এভাবে ডাকার কারণে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটার বা বৈবাহিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
২. ইসলামি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি ও শরিয়তের বিধান
হানাফি ফিকহের বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ‘রদ্দুল মুহতার’-এ স্ত্রীকে ‘বোন’, ‘মা’ বা ‘মেয়ে’ বলে সম্বোধন করার বিধান স্পষ্ট করা হয়েছে। তাই ফিকহের সিদ্ধান্ত হলো— স্বামী-স্ত্রীর একে অপরকে ‘ভাই’ বা ‘বোন’ বলে সম্বোধন করা মাকরূহ বা অনুচিত।
কারণ: এ ধরনের ডাক স্বামী-স্ত্রীর প্রকৃত সম্পর্কের সাথে সাংঘর্ষিক এবং তা বৈবাহিক মর্যাদার পরিপন্থী। তবে এটি মাকরূহ হলেও এর দ্বারা বৈবাহিক আকদ (চুক্তি) ভঙ্গ হয় না।
فِقْهِ হানাফির দলিল:
وَيُكْرَهُ قَوْلُهُ: أَنْتَ أُمِّي وَيَا ابْنَتِي وَيَا أُخْتِي وَنَحْوُهُ
‘স্বামী তার স্ত্রীকে ‘তুমি আমার মা’, ‘হে আমার মেয়ে’, ‘হে আমার বোন’— এ জাতীয় কথা বলা মাকরূহ।’ (রদ্দুল মুহতার ৩/৪৭০)
৩. হাদিস ও ফিকহি তাহকিক (গবেষণা)
সুনানে আবু দাউদে এ বিষয়ক একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে—
عَنْ أَنَّ رَجُلًا قَالَ لِامْرَأَتِهِ: يَا أُخَيَّةُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «أُخْتُكَ هِيَ؟» فَكَرِهَ ذَلِكَ وَنَهَى عَنْهُ
‘এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বলল, ‘হে আমার ছোট বোন!’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘সে কি তোমার বোন?’ তিনি এ ধরনের সম্বোধন অপছন্দ করলেন এবং তা থেকে নিষেধ করলেন।’ (আবু দাউদ ২২১০)
ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী যেহেতু মহানবী (সা.) এই সম্বোধন অপছন্দ করেছেন, তাই এটি এড়িয়ে চলাই শরিয়তের পরামর্শ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও স্ত্রীদের সাথে স্নেহ ও আদরের ডাকনামে কথা বলতেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি হজরত আয়েশা (রা.)-কে ভালোবেসে সংক্ষিপ্ত করে ‘আয়িশ’ বলে ডাকতেন—
يَا عَائِشُ، هَذَا جِبْرِيلُ يُقْرِئُكِ السَّلَامَ
‘হে আয়িশ! এই যে জিবরাইল (আ.), তিনি তোমাকে সালাম জানাচ্ছেন।’ (বুখারি ৩৭৬৮)
যেভাবে একে অপরকে সম্বোধন করা উত্তম—
- সুন্দর কোনো ডাকনামে বা আদরের নামে।
- সন্তানের সাথে মিলিয়ে (যেমন: ‘অমুকের বাবা’ বা ‘অমুকের মা’)।
- নিজের বা পারিবারিক সম্মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেকোনো ভাষায়।
দাম্পত্য জীবনে হাসি-ঠাট্টা ও ভালোবাসার সুযোগ ইসলামে রয়েছে, তবে যেসব শব্দ বা সম্বোধন শরিয়তে মাকরূহ বা অনুচিত, সেগুলোকে অভ্যাসে পরিণত না করাই শ্রেয়। স্বামীকে ‘ভাই’ কিংবা স্ত্রীকে ‘বোন’ ডাকলে তালাক হয় না—এ বিষয়ে অহেতুক আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই; তবে সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা ও শরিয়তের সংশয় মুক্ত থাকতে এমন শব্দ ব্যবহার থেকে বিরত থেকে সুন্দর, সুন্নতি ও ভালোবাসাপূর্ণ সম্বোধন চর্চা করাই একজন মুমিনের পরিচয়।

