শিশু-কিশোরদের নবীপ্রেম
Advertisement
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪৯ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমাদের নবীজি ছিলেন সবার প্রিয়। তিনি সব মুমিনের হৃদয়ের বাদশাহ, কোটি মানুষের প্রাণের স্পন্দন, হৃদয়-আকাশের চাঁদ। তাঁর খুশবুতে সারা জাহান মাতোয়ারা।
অন্যদের মতো শিশু-কিশোররাও নবীজিকে ভালোবাসতেন। নবীজির জন্য তাঁরা সবকিছু উজাড় করে দিতেন। বদর যুদ্ধের কথাই ধরা যাক। সে যুদ্ধে নবীপ্রেমে উজ্জীবিত দুই কিশোর রেখেছিলেন অনন্য অবদান।
১৩ ও ১৪ বছর বয়সি কিশোর মুয়াজ ও মুয়াওয়িজের বীরত্বের কাছে পরাস্ত হয়েছিলেন শত্রুপক্ষের প্রভাবশালী নেতা আবু জাহেল।
সে ঘটনার বিবরণ দিয়ে হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) বলেন, ‘আমি যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ডানে-বামে তাকিয়ে দেখি, অল্পবয়সি দুজন কিশোর। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, পাশে শক্তিশালী কেউ থাকলে তো ভালো হতো। এমন সময় তাদের একজন আমাকে জিজ্ঞেস করল, চাচা! আবু জাহেল কোনটি?
আমি বললাম, কেন?
কিশোর বলল, নবীজিকে নিয়ে সে বাজে কথা বলে। তাকে আমি উচিত শিক্ষা দিতে চাই। আমার জীবন গেলে যাক।’
এ কথার রেশ কাটতে না কাটতেই অপর পাশের কিশোরও একই প্রশ্ন করল। আমি আবু জাহেলকে দেখিয়ে দিলাম। তারা তখন এক মুহূর্ত বিলম্ব করল না। তীব্র গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল নবীজির দুশমনের ওপর। বড়দের আক্রমণের আগেই কিশোরদের হাতে পরাস্ত হলো নবীজির এক প্রকাশ্য শত্রু। (সহিহ বুখারি: ৩৯৮৮)
বদর যুদ্ধের একপর্যায়ে হজরত মুয়াজের ওপর শত্রুপক্ষ আঘাত হানে। তার হাত কেটে ঝুলে যায়। ঝুলে থাকা হাত নিয়ে যুদ্ধ করতে সমস্যা হচ্ছিল। তাই তিনি নিজেই নিজের ঝুলন্ত হাতটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। তখন শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল। তীব্র ব্যথায় তিনি কাতর ছিলেন।
কিন্তু কিশোর মুয়াজের হৃদয়ে নবীপ্রেমের আগুন ছিল তার চেয়েও তীব্র। অঙ্গ হারানোর ব্যথা নবীপ্রেমের পথে বাধা হতে পারেনি। কারণ, তিনি নিজের চেয়েও নবীজিকে বেশি ভালোবাসতেন।
নবীজির প্রতি এই কিশোরের ভালোবাসার কথা স্মরণ হলে আমরা অবাক হই। আমাদের হৃদয় সাহসে ভরে যায়।
যে বয়সে শিশু-কিশোররা খেলনা ও খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকে, কেউবা ছুটে বেড়ায় রঙিন প্রজাপতির পেছনে, সেই বয়সে হজরত আনাস (রা.)-এর সময় কেটেছে নবীজির সান্নিধ্যে। শিশু আনাস নবীজির কাছে পার করেছেন দীর্ঘ ১০টি বছর।
মুসনাদে আহমদের বর্ণনায় হজরত আনাস (রা.) বলেন—‘خدَمْتُ رسولَ اللهِ وأنا ابنُ عَشْرِ سنينَ’
অর্থাৎ, ‘নবীজির খেদমতে আসার সময় আমার বয়স ছিল ১০ বছর।’
আকৃত্রিম ভালোবাসা ছাড়া এই বয়সের কোনো শিশু কি কারও কাছে দীর্ঘ ১০ বছর থাকতে পারে? এ থেকে নবীজির প্রতি শিশু আনাসের ভালোবাসার পরিমাণ সহজেই অনুমান করা যায়।(সহিহ বুখারি: ৩৭৫৬)
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) তখন কিশোর। এক রাতে তিনি নবীজির কাছে ঘুমালেন। গভীর রাতে নবীজি যখন তাহাজ্জুদের জন্য উঠলেন, তখন ছোট্ট ইবনে আব্বাসও ঘুম থেকে উঠে গেলেন। নবীজি যেভাবে ওযু করলেন, তিনিও সেভাবে ওযু করলেন। নবীজি যেভাবে নামাজে দাঁড়ালেন, তিনিও তাঁর পাশে দাঁড়ালেন। এটাই ছিল কিশোর ইবনে আব্বাসের নবীপ্রেম।
আমাদের শিশু-কিশোরদের হৃদয়ে মোবাইল ও গেমসের আসক্তি আছে। কিন্তু তাদের হৃদয়ে কি নবীজির ভালোবাসা আছে?
আমরা যদি তাদের হৃদয়ে নবীজির ভালোবাসা জাগিয়ে দিতে পারি, তাহলে তারাই একদিন ইবনে আব্বাসের মতো রাতের ঘুমকে পরাজিত করে সুন্নাহর পথের পথিক হয়ে উঠবে।
মানুষ অনেক কিছুই বদলাতে পারে। কিন্তু আদর্শ বা চেতনা সহজে বদলাতে পারে না। অথচ নবীপ্রেমে হজরত আলী (রা.) ১০ বছর বয়সে পূর্বপুরুষদের আদর্শ ত্যাগ করে হয়ে যান একান্ত নবীপ্রেমিক।
বায়হাকির বর্ণনায় এসেছে— ‘أَسْلَمَ عَلِيٌّ وَهُوَ ابْنُ عَشْرِ سِنِينَ’
অর্থাৎ, ‘হজরত আলী (রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন তার বয়স ছিল ১০ বছর।’
১০ বছর বয়সী একটি বালকের জন্য তার পরিবার ও সমাজের বিপরীত স্রোতে হাঁটা অনেক কঠিন। অথচ তিনি সবকিছুকে নবীপ্রেমের কাছে উপেক্ষা করলেন।
নবীপ্রেমের অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন হজরত রাফে ইবনে খাদিজ ও সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.)। যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তাঁদের একজনের অনুমতি হয়েছিল, কিন্তু অন্যজনের হয়নি। ফলে দ্বিতীয়জন নিজের সক্ষমতা প্রমাণের জন্য কুস্তিতে অপরজনকে পরাজিত করে দেন।
তাদের বয়স ছিল ১৪-১৫ বছর। কিন্তু তাদের বয়সের স্বল্পতা নবীপ্রেমকে ছোট করতে পারেনি। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তারা নবীজির সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল ছিলেন। তাদের হৃদয়ে ছিল নবীপ্রেম। বয়স ছোট হলেও ভালোবাসা ছিল বিশাল।
আমাদের সামনে আজ নবীজি নেই। কিন্তু আছে তার সুন্নাহ। তাই জীবনের পরতে পরতে সুন্নাহ অনুসরণের শপথ গ্রহণ করি। সর্বক্ষেত্রে নবীজির আদর্শকে আঁকড়ে থাকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করি। তবেই ফুলে-ফলে ভরে উঠবে আমাদের জীবন। আসবে সফলতা ও শান্তি।
লেখক: শিক্ষক, শেখ জনূরুদ্দীন (রহ.) দারুল কুরআন চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসা, ঢাকা


