Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

জুমার দিনে দোয়া কবুলের সেই পরম কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম

জুমার দিনে দোয়া কবুলের সেই পরম কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত

ছবি: সংগৃহীত

জুমার দিন প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে এক টুকরো জান্নাতি প্রশান্তি আর আলাদা আবহের বার্তা নিয়ে আসে। সপ্তাহের এই বিশেষ দিনে রহমতের যে অমূল্য বৃষ্টি ঝরে, তার অন্যতম বড় উপহার হলো এমন এক মুহূর্ত—যখন প্রভূর দরবারে তোলা কোনো বান্দার হাত খালি হাতে ফিরে যায় না। দিনভর কর্মব্যস্ততার ভিড়েও মুমিন হৃদয় ব্যাকুল হয়ে প্রভূর সেই পরম করুণাময় মুহূর্তটিকে খুঁজে ফেরে।

জুমার দিনের সেই পরম কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত

রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দিনের অপার ফজিলত সম্পর্কে বর্ণনা করে বলেছেন, এ দিনে একটি বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে, যা কোনো বিশ্বাসী বান্দা লাভ করলে তার চাওয়া কখনো অপূর্ণ থাকে না। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) জুমার দিনের আলোচনা করতে গিয়ে বললেন—

فِيهِ سَاعَةٌ لاَ يُوَافِقُهَا عَبْدٌ مُسْلِمٌ، وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّي، يَسْأَلُ اللَّهَ تَعَالَى شَيْئًا، إِلاَّ أَعْطَاهُ إِيَّاهُ» وَأَشَارَ بِيَدِهِ يُقَلِّلُهَا

‘এ দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, কোনো মুসলিম বান্দা যদি সে সময়ে সালাতরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কোনো কল্যাণের বস্তু প্রার্থনা করে, তবে আল্লাহ তাকে তা অবশ্যই দান করেন।’ এ কথা বলার সময় তিনি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিলেন যে, সে সময়টি অতি সংক্ষিপ্ত।’ (বুখারি ৯৩৫, মুসলিম ৮৫২)

ক্ষণটি ঠিক কখন: প্রাজ্ঞ আলেমদের জোরালো দুই মত

রহমতের এই বিশেষ সময়টি ঠিক কখন— তা নিয়ে ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত থাকলেও দুটি সময় সবচেয়ে প্রামাণ্য ও শক্তিশালী হিসেবে বিবেচিত হয়—

১. খতিবের আগমন থেকে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত: হযরত আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) এই সময়ের কথা উল্লেখ করেছেন—

أَسَمِعْتَ أَبَاكَ يُحَدِّثُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي شَأْنِ سَاعَةِ الْجُمُعَةِ؟ قُلْتُ: نَعَمْ، سَمِعْتُهُ يَقُولُ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «هِيَ مَا بَيْنَ أَنْ يَجْلِسَ الإِمَامُ إِلَى أَنْ تُقْضَى الصَّلاَةُ

‘আপনি কি আপনার পিতাকে জুমার দিনের দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্তটি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো হাদিস বর্ণনা করতে শুনেছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ! আমি তাকে বলতে শুনেছি, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইমামের মিম্বরে বসা থেকে নিয়ে সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত সময়ে তা নিহিত।’ (মুসলিম ৮৫৩, আবু দাউদ ১০৪৯)

তাই জুমার খুতবার সময় সমস্ত মনযোগ দিয়ে নীরব থেকে খুতবা শোনা এবং সালাত আদায়ের মধ্য দিয়ে পরম প্রভূর নৈকট্য খোঁজা প্রাক-শর্ত।

২. আসরের পর থেকে সূর্যাস্তের পূর্বক্ষণ: বহু সাহাবি ও বিশিষ্ট আলেমদের মতে, দোয়ার জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময় হলো আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়টি। হজরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন—

يَوْمُ الْجُمُعَةِ اثْنَتَا عَشْرَةَ سَاعَةً، لاَ يُوجَدُ فِيهَا عَبْدٌ مُسْلِمٌ يَسْأَلُ اللَّهَ شَيْئًا إِلاَّ آتَاهُ إِيَّاهُ، فَالْتَمِسُوهَا آخِرَ السَّاعَةِ بَعْدَ الْعَصْرِ

‘জুমার দিন বারোটি প্রহরে বিভক্ত। তার মধ্যে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে যা-ই প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাকে তা দান করেন। তোমরা আসরের শেষ প্রহরে তা সন্ধান করো।’ (আবু দাউদ ১০৪৮, নাসাঈ ১৩৮৯)

মাগরিবের অপেক্ষায় থেকে কাটুক দিনান্তের মুহূর্তগুলো

আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়টুকু জিকির, দরুদ ও দোয়ায় বুঁদ হয়ে থাকা পরম সৌভাগ্যের। মাগরিবের নামাজের অপেক্ষায় মসজিদে বসে থাকা কিংবা নিজের জায়গায় একাগ্রচিত্তে অবস্থান করাও এক প্রকার নামাজের মধ্যেই গণ্য হয়। কুরআনেও প্রভূর জিকিরে মন সঁপে দেওয়ার সুন্দর তাগিদ রয়েছে—

فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

‘অতঃপর নামাজ শেষ হলে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর, আর আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ (সুরা আল-জুমুআ: আয়াত ১০)

বিশিষ্ট ফকিহ ইমাম ইবনে আবদুল বার (রহ.) বলেছেন, দোয়া কবুলের পরম ব্যাকুলতা নিয়ে একজন মুমিনের উচিত উল্লিখিত দুটি সময়ের প্রতিটি সুযোগকে হাতছাড়া না করা এবং প্রভূর দরবারে ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ চেয়ে ফরিয়াদ করা। (আত-তামহিদ ১৯/২৪)

জুমার এই পবিত্র প্রহরগুলো শুধু সাধারণ কিছু সময় নয়, বরং তা প্রভূর পক্ষ থেকে পাঠানো এক অপার ভালোবাসা আর অনুগ্রহের ঝুড়ি। কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ের ওপর ভরসা করে বসে না থেকে জুমার খুতবার সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে একেবারে দিনান্তের রক্তিম সূর্য হেলে পড়া পর্যন্ত প্রতিটি প্রহরে হৃদয়ের আকুতি আল্লাহর দরবারে পেশ করা বুদ্ধিমানের কাজ। প্রভূর রহমতের দুয়ার খুলে যাওয়ার এই সুবর্ণ সুযোগগুলো আমাদের জীবনকে আলোয় ভরিয়ে দিক, হে পরম দয়াময়! আপনি আমাদের প্রতিটি ফরিয়াদ কবুল করুন। আমিন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম