যে দোয়ায় ঋণ ও অলসতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পার্থিব জীবনে মানুষের চলার পথে নানা ধরনের বাধা ও প্রতিকূলতা আসে। তবে অলসতা, দুশ্চিন্তা ও ঋণের বোঝা মানুষকে ভেতর থেকে একেবারে ভেঙে দেয়। জীবনকে থমকে দেয় এবং মানসিকভাবে পঙ্গু করে ফেলে। একজন প্রজ্ঞাবান মুমিনের কাছে ঋণের ভারের চেয়ে বড় কোনো চাপ হতে পারে না, কারণ এটি বান্দার হকের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব আত্মঘাতী মানসিক ও সামাজিক ব্যাধি থেকে বাঁচতে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আমাদের পরম করুণাময়ের দরবারে আশ্রয় চাওয়ার অনন্য ও অত্যন্ত কার্যকরী কিছু দোয়া শিখিয়ে গেছেন।
অলসতা ও ঋণের দাপট থেকে বাঁচার বিশেষ দোয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) অলসতা, পাপাচার ও ঋণের মতো বিষয়গুলো থেকে রেহাই পেতে নিয়মিত দোয়া করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) এই ফরিয়াদ পেশ করতেন—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْكَسَلِ، وَالْهَرَمِ، وَالْمَأْثَمِ، وَالْمَغْرَمِ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল কাসালি, ওয়ালহারামি, ওয়ালমা’ছামি, ওয়ালমাগরামি।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি অলসতা, চরম বার্ধক্য, গোনাহ এবং ঋণের বোঝা থেকে।’ (বুখারি ২৩৯৭, মুসলিম ৫৮৯)
দোয়ার বাক্যগুলোর গূঢ় অর্থ:
- মিনাল কাসালি (مِنَ الْكَسَلِ): কাজ করার অনিচ্ছা বা কর্মবিমুখতা থেকে রক্ষা পাওয়া।
- ওয়াল হারামি (وَالْهَرَمِ): বার্ধক্যের এমন অক্ষমতা ও জরাগ্রস্ততা, যা মানুষের স্বাভাবিক কাজ করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়।
- ওয়াল মা’ছামি (وَالْمَأْثَمِ): সমস্ত প্রকার গোনাহ বা পাপাচার থেকে বেঁচে থাকা।
- ওয়াল মাগরাম (وَالْمَغْرَمِ): ঋণের ভারী বোঝা, যা শোধ করতে না পেরে মানুষ কঠিন বিপদে পড়ে।
দুশ্চিন্তা, ভীরুতা ও ঋণের চাপ থেকে সার্বিক আশ্রয়
ঋণগ্রস্ত মানুষের ঈমান হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। কারণ ঋণের কারণে মানুষ প্রায়ই মিথ্যা কথা বলতে ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে বাধ্য হয়। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এ সংক্রান্ত একটি দোয়া খুব বেশি পাঠ করতেন—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ، وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি, ওয়াল আঝযি ওয়াল কাসালি, ওয়াল বুখলি ওয়াল ঝুবনি, ওয়া দালাআদ দাইনি, ওয়া গালাবাতির রিঝালি।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অপারগতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণের ভার এবং মানুষের দমনপীড়ন থেকে।’ (বুখারি ২৮৯৩)
ঋণ পরিশোধ ও ঋণদাতার প্রাপ্য সম্মানের সুন্নাহ
ঋণ গ্রহণ করলে তা যথাসময়ে সুদের ঝামেলামুক্তভাবে পরিশোধ করা এবং পাওনাদারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু রবিআ আল-মাখজুমি (রা.) বর্ণনা করেন, হুনাইনের যুদ্ধের সময় নবী করিম (সা.) তার কাছ থেকে ৩০ বা ৪০ হাজার দিরহাম ঋণ নিয়েছিলেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে তিনি সেই পাওনা মিটিয়ে দেন এবং তার জন্য বিশেষ দোয়া করে বলেন—
بَارَكَ اللَّهُ لَكَ فِي أَهْلِكَ وَمَالِكَ، إِنَّمَا جَزَاءُ السَّلَفِ الْحَمْدُ وَالأَدَاءُ
উচ্চারণ: ‘বারাকাল্লাহু লাকা ওয়া আহলিকা ওয়া মালিকা, ইন্নামা ঝাযায়ুস সালাফিল হামদু ওয়াল আদায়ু।’
অর্থ: ‘আল্লাহ তাআলা তোমার পরিবার ও সম্পদে বরকত দান করুন। নিশ্চয়ই ঋণের উত্তম প্রতিদান হলো তা সুন্দরভাবে পরিশোধ করা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।’ (ইবনে মাজাহ ২৪২৪, মুসনাদে আহমাদ ১৬৪১০)
আল্লাহর কাছে বান্দার হকের হিসাব অত্যন্ত সূক্ষ্ম। তাই কোনো ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় কারো ঋণ মাফ করে দেয় বা পরিশোধে সময় বাড়ায়, তবে তার জন্য পরকালে বিশাল পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
জীবনের সব ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী হওয়া এবং অলসতা ঝেড়ে ফেলে কর্মঠ হওয়া মুমিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো এসব দোয়া নিয়মিত পাঠ করার পাশাপাশি হালাল উপার্জনের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানোই সুন্নাতের দাবি। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে অলসতার অভিশাপ এবং ঋণের কঠিন বোঝা থেকে মুক্ত রেখে এক স্বাধীন, সম্মানিত ও পবিত্র জীবন দান করুন। আমিন।
