Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

দাম্পত্য জীবনের শান্তি ও শৃঙ্খলায় নবীজির (স.) ৬ সতর্কবাণী

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম

দাম্পত্য জীবনের শান্তি ও শৃঙ্খলায় নবীজির (স.) ৬ সতর্কবাণী

ছবি: সংগৃহীত

দাম্পত্য জীবন কেবল ভালোবাসার বন্ধনই নয়, এটি পারস্পরিক অধিকার, দায়িত্বশীলতা ও বিশ্বস্ততার এক পবিত্র মেলবন্ধন। একটি সুশৃঙ্খল ও সুখের সংসার গড়ে তুলতে ইসলাম স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের ওপর সুনির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব অর্পণ করেছে। তবে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে কখনো কখনো এমন কিছু আচরণ প্রকাশ পায়, যা দাম্পত্যের আস্থা নষ্ট করে এবং সংসারে অশান্তি ডেকে আনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন হাদিসে এমন কিছু বিষয় নিয়ে সতর্ক করেছেন, যা স্বামীর অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে। প্রিয়নবী (সা.)-এর এসব সতর্কবার্তা কোনো একতরফা অভিযোগ নয়, বরং একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবার গঠনের সুনির্দিষ্ট কিছু দিকনির্দেশনা।

১. স্বামীর অবাধ্য হওয়া ও অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা

দাম্পত্য জীবনে সামান্য কোনো বিষয়ে মতবিরোধ বা অসন্তুষ্টি তৈরি হলে স্বামীর দীর্ঘদিনের ভালোবাসা, ত্যাগ ও উপকার পুরোপুরি অস্বীকার করা থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

أُرِینَا النَّارَ فَإِذَا أَکْثَرُ أَهْلُهَا النِّسَاءُ، يَکْفُرْنَ» قِیلَ: أَیَکْفُرْنَ بِاللَّهِ؟ قَالَ: «یَکْفُرْنَ الْعَشِیرَ، وَیَکْفُرْنَ الْإِحْسَانَ، لَوْ أَحْسَنْتَ إِلَی إِحْدَاهُنَّ الدَّهْرَ، ثُمَّ رَأَتْ مِنْکَ شَیْئًا، قَالَتْ: مَا رَأَیْتُ مِنْکَ خَیْرًا قَطُّ

‘আমাকে জাহান্নাম দেখানো হলো। আমি দেখলাম যে, তার অধিকাংশ অধিবাসীই নারী। কারণ, তারা অকৃতজ্ঞ হয়।’ জিজ্ঞাসা করা হলো, তারা কি আল্লাহর সঙ্গে কুফরি করে? তিনি বললেন, ‘তারা স্বামীর অকৃতজ্ঞ হয় এবং ভালো ব্যবহার অস্বীকার করে। তুমি যদি দীর্ঘকাল তাদের কোনো একজনের প্রতি ইহসান (উপকার) করতে থাকো, আর সে তোমার মধ্যে সামান্য অপছন্দনীয় কিছু দেখতে পায়, তবে বলে ফেলে— ‘আমি কখনো তোমার কাছ থেকে ভালো ব্যবহার পাইনি।’ (বুখারি ২৯)

অতএব, সাময়িক অভিমান বা ক্ষোভের বশে স্বামীর আগের সব ভালো কাজ অস্বীকার করা কিংবা অভিশাপের ভাষা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা একজন মুমিন নারীর একান্ত কর্তব্য।

২. বৈধ কারণ ছাড়া দাম্পত্য আহ্বানে অস্বীকৃতি জানানো

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার পবিত্র শারীরিক ও মানসিক সম্পর্ক উভয়েরই অন্যতম একটি বৈধ অধিকার। কোনো গ্রহণযোগ্য ও বৈধ ওজর (কারণ) ছাড়া স্বামীর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করার পরিণতির বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা রয়েছে। হাদিসে পাকে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন—

إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَلَمْ تَأْتِهِ، فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا، لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ

‘স্বামী স্ত্রীকে তার বিছানায় (সহবাসের জন্য) ডাকল, আর স্ত্রী তা অস্বীকার করল এবং স্বামী তার ওপর রাগ করে রাত কাটাল—তবে সকাল পর্যন্ত ফেরেশতারা ওই নারীর ওপর লানত (অভিশাপ) করতে থাকেন।’ (বুখারি ৫১৯৩)

অবশ্য শারীরিক অসুস্থতা বা অন্য কোনো বৈধ ওজর থাকলে বিষয়টি ভিন্ন। ইসলাম কখনো জোর-জবরদস্তির অনুমতি দেয় না, বরং দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তি পারস্পরিক সদাচরণ ও সম্মানের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

৩. স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোজা রাখা

নফল ইবাদত-বন্দেগির ক্ষেত্রেও বিবাহিত নারীর জন্য স্বামীর অধিকার ও সুবিধার বিষয়টি বিবেচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে দাম্পত্য সম্পর্কে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। হাদিসে পাকে এসেছে— হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন—

لَا تَصُومُ الْمَرْأَةُ وَبَعْلُهَا شَاهِدٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ

‘স্বামী উপস্থিত থাকলে তার অনুমতি ছাড়া কোনো নারী যেন (নফল) রোজা না রাখে।’ (সহিহ বুখারি: ৫১৯২)

উল্লেখ্য যে, এই বিধানটি শুধুমাত্র ‘নফল রোজার’ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ফরজ রোজা বা রমজানের রোজার বিধান সম্পূর্ণ আলাদা এবং তা পালনের জন্য স্বামীর অনুমতির প্রয়োজন হয় না।

৪. স্বামীর অনুমতি ছাড়া ঘরে কাউকে প্রবেশ করতে না দেওয়া

সংসারের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পবিত্রতা এবং নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ঘরের ভেতরে কার প্রবেশাধিকার থাকবে আর কার থাকবে না, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা আবশ্যক। হাদিসে পাকে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন—

لَا يَحِلُّ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تَصُومَ وَزَوْجُهَا شَاهِدٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ، وَلَا تَأْذَنَ فِي بَيْتِهِ إِلَّا بِإِذْنِهِ

‘...এবং সে যেন স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার ঘরে অন্য কাউকে প্রবেশ করতে না দেয়।’ (বুখারি ৫১৯৫)

এটি মূলত সংসারের পারস্পরিক আস্থা, নিরাপত্তা এবং পারিবারিক গোপনীয়তা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা।

৫. উপযুক্ত বা যথার্থ কারণ ছাড়া তালাক বা বিচ্ছেদ চাওয়া

দাম্পত্য জীবনে ছোটখাটো ভুলত্রুটি বা মতবিরোধ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যার সমাধানের চেষ্টা না করে সামান্য কারণে বা ক্ষোভের বশে বিচ্ছেদের দাবি তোলা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হাদিসে পাকে এসেছে, হজরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন—

أَيُُّمَا امْرَأَةٍ سَأَلَتْ زَوْجَهَا طَلَاقًا مِنْ غَيْرِ بَأْسٍ، فَحَرَامٌ عَلَيْهَا رَائِحَةُ الْجَنَّةِ

‘যে কোনো নারী কোনো বিশেষ অসুবিধা (যথার্থ কারণ) ছাড়াই স্বামীর কাছে তালাক চায়, তার জন্য জান্নাতের সুঘ্রাণও হারাম হয়ে যায়।" (আবু দাউদ ২২২৬)

এখানে ‘যথার্থ কারণ’ কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদি নির্যাতন, অধিকারহানি, নিরাপত্তাহীনতা বা অসহনীয় কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে ইসলামে বিচ্ছেদের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বিনা কারণে বা সামান্য অভিমানে তালাক চাওয়া মারাত্মক গুনাহের কাজ।

৬. স্বামীকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া

দাম্পত্য জীবনে অকারণে স্বামীকে মানসিক বা শারীরিকভাবে কষ্ট দেওয়া এবং সংসারের পরিবেশ বিষাক্ত করে তোলা থেকে বিরত থাকার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন—

لَا تُؤْذِي امْرَأَةٌ زَوْجَهَا فِي الدُّنْيَا، إِلَّا قَالَتْ زَوْجَتُهُ مِنَ الْحُورِ الْعِينِ: لَا تُؤْذِيهِ، قَاتَلَكِ اللَّهُ! فَإِنَّمَا هُوَ عِنْدَكِ دَخِيلٌ، يُوشِكُ أنْ يُفَارِقَكِ إِلَيْنَا

‘দুনিয়ার কোনো নারী যখন তার স্বামীকে কষ্ট দেয়, তখন জান্নাতের হুরদের মধ্য থেকে তার সম্ভাব্য স্ত্রী বলে ওঠে, ‘তাকে কষ্ট দিও না, আল্লাহ তোমার সর্বনাশ করুন! সে তো তোমার কাছে অল্প সময়ের জন্যই মেহমান, শীঘ্রই সে তোমাকে ছেড়ে আমাদের কাছে চলে আসবে।’ (তিরমিজি ১১৭৪)

এই হাদিসটি স্বামীকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া থেকে সতর্ক করে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, স্বামীর পক্ষ থেকে হওয়া কোনো অন্যায় জুলুম বা অবিচার নীরবে সহ্য করতে হবে। ইসলাম স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই একে অপরের প্রতি সদাচরণ করার নির্দেশ দিয়েছে।

আলোচ্য হাদিসগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কোনো একতরফা কর্তৃত্ব বা শোষণের বিষয় নয়, বরং এটি পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও অধিকারের সুষম বিন্যাস। ইসলাম যেমন স্ত্রীকে স্বামীর কিছু অধিকার আদায়ের তাগিদ দিয়েছে, তেমনি স্বামীকেও নির্দেশ দিয়েছে স্ত্রীর প্রতি ন্যায়পরায়ণ হতে, তার অধিকার রক্ষা করতে এবং জুলুম থেকে বিরত থাকতে। একটি সুন্দর, টেকসই ও সুখের দাম্পত্য জীবন কেবল ভালোবাসার ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি কৃতজ্ঞতাবোধ, বিশ্বস্ততা, দায়িত্বশীলতা এবং খোদাভীতির মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম