শুধু এক কন্যা থাকলে জীবদ্দশায় তাকে পূর্ণ সম্পদ দেওয়া যাবে কি?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সন্তান পিতা-মাতার কাছে পরম নিয়ামত। অনেক পরিবারে কেবল একটিমাত্র কন্যা সন্তান থাকে, যার ভবিষ্যৎ সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিয়ে মা-বাবা উদ্বিগ্ন থাকেন। এই চিন্তাভাবনা থেকে অনেকেই ভাবেন যে, বেঁচে থাকতেই নিজের সমস্ত সম্পত্তি একমাত্র মেয়ের নামে লিখে দিয়ে যাবেন কি না। তবে ইসলামি শরিয়তে ফারায়েজ বা উত্তরাধিকার আইনের পাশাপাশি জীবদ্দশায় সম্পদ হেবা বা দান করারও কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। কোনো পিতা কি তার জীবদ্দশায় একমাত্র মেয়েকে সব সম্পত্তি লিখে দিতে পারেন, আর মৃত্যুর পর সেই মেয়ে কি সম্পূর্ণ সম্পদের মালিক থাকবে—এ বিষয়ে ইসলামি ফিকহের স্পষ্ট নির্দেশনা জানা জরুরি।
১. জীবদ্দশায় সম্পদ দানের মূল শরয়ি বিধান
একজন সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তার জীবদ্দশায় নিজের অর্জিত সম্পদের পূর্ণ মালিক। শরিয়তের দৃষ্টিতে তিনি চাইলে জীবিত থাকা অবস্থায় তার সম্পদ যে কাউকে হেবা বা দান করে দিতে পারেন। এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পিতা যদি বেঁচে থাকা অবস্থায় তার একমাত্র কন্যা সন্তানকে সমুদয় সম্পত্তি লিখে দিয়ে যান এবং তার হস্তান্তর (কবজা) সম্পন্ন করে দেন, তবে তা জায়েজ হবে। মৃত্যুর পর সেই কন্যা সন্তানই উক্ত সমুদয় সম্পত্তির পূর্ণ ও বৈধ মালিক হিসেবে গণ্য হবে।
২. মানসিকতা ও নিয়তের গুরুত্ব: গুনাহ বনাম মালিকানা
কন্যা সন্তানকে সব সম্পদ লিখে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পিতার নিয়ত বা উদ্দেশ্য।
- বঞ্চিত করার উদ্দেশ্য না থাকলে: কোনো পিতা যদি কেবল মেয়ের মায়া বা তার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা ভেবে কোনো ওয়ারিশকে ঠকানোর নিয়ত ছাড়া সম্পদ লিখে দেন, তবে তা সম্পূর্ণ বৈধ ও অনিন্দনীয়।
- অন্যান্য ওয়ারিশদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্য থাকলে: যদি কোনো পিতা এই উদ্দেশ্যে মেয়েকে সব লিখে দেন যেন তার মৃত্যুর পর ভাই, ভাতিজা বা অন্যান্য বৈধ ওয়ারিশরা মিরাস বা উত্তরাধিকার সূত্রে কোনো অংশ না পায়, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে এমন কাজ করা অন্যায় ও চরম গুনাহের কাজ।
তবে মনে রাখতে হবে, পিতা অন্যায় নিয়তে অন্য ওয়ারিশদের বঞ্চিত করার কারণে নিজে মারাত্মক গুনাহগার হলেও, দাফতরিক ও শরয়িভাবে জীবিত থাকা অবস্থায় মেয়েকে দেওয়া সেই দান বাতিল হবে না; কন্যা সন্তান পুরো সম্পদের মালিকই থেকে যাবে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ওয়ারিশদের অহেতুক ক্ষতিসাধন বা বঞ্চিত করার মানসিকতা থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন—
مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصَىٰ بِهَا أَوْ دَيْنٍ غَيْرَ مُضَارٍّ ۚ وَصِيَّةً مِّنَ اللَّهِ
‘এ সবই পালিত হবে মৃতের কৃত ওসিয়ত পূরণ বা ঋণ পরিশোধের পর— যদি তা কারও জন্য ক্ষতিকর না হয়। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত নির্দেশ।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) উত্তরাধিকারীদের হক নষ্ট করার কঠোর পরিণতির কথা জানিয়ে ইরশাদ করেছেন—
مَنْ فَرَّ مِنْ مِيرَاثِ وَارِثِهِ قَطَعَ اللَّهُ مِيرَاثَهُ مِنَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
‘যে ব্যক্তি তার ওয়ারিশের উত্তরাধিকার বা প্রাপ্য অংশ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যাবে (বা তা বঞ্চিত করবে), কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তার উত্তরাধিকার কেটে দেবেন।’ (ইবনে মাজাহ ২৭০৩)
৩. ফিকহ ও ফাতাওয়ার কিতাবের সিদ্ধান্ত
সন্তানদের মাঝে সম্পদ বন্টন ও দানের ক্ষেত্রে ফিকহের বিশ্বস্ত গ্রন্থ আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়া-তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—
وَفِي الْهِنْدِيَّةِ: لاَ بَأْسَ بِهِ إِذَا لَمْ يُقْصِدْ بِهِ الإِضْرَارَ، وَإِنْ قَصَدَ بِهِ الإِضْرَارَ سَوَّى بَيْنَهُمْ، وَهُوَ الْمُخْتَارُ
‘এতে (সন্তানকে সম্পদ দেওয়া বা কম-বেশি করাতে) কোনো অসুবিধা নেই, যদি এর দ্বারা অন্য কাউকে ক্ষতি করার উদ্দেশ্য না থাকে। তবে যদি ক্ষতি করার উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে তাদের (সন্তানদের) মধ্যে সমতা রক্ষা করবে— আর এটিই পছন্দনীয় (বা গ্রহণযোগ্য) মত।’ (আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া: ৪/৩৯১)
অর্থাৎ, সন্তান বা আত্মীয়দের কোনো কিছু প্রদান বা উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি কাউকে বঞ্চিত করা বা অপকার করার মানসিকতা না থাকে, তবে বিশেষ প্রয়োজনে কাউকে প্রাধান্য দেওয়া বা পুরোটা দেওয়াতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু নিয়ত যদি থাকে ওয়ারিশদের আক্রোশবশত বঞ্চিত করা, তবে সব সন্তানের মাঝে কিংবা নীতিগত সমতা রক্ষা করাই ইসলামি ফিকহের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য।
মেয়ের ভবিষ্যৎ চিন্তা করা প্রাকৃতিগত ও অভিভাবকসুলভ দায়িত্ব হলেও, তা করতে গিয়ে যেন দ্বীনি আমানতদারিতা ও পরকালের জবাবদিহিতা হারিয়ে না যায়। একজন ইমানদার পিতার উচিত নিয়তকে খাঁটি রাখা। কেবল স্বজনদের ঠকানোর কু-মনোভাব থেকে দূরে থেকে যদি তিনি মেয়েকে জীবদ্দশায় কিছু দান করেন, তবে তা শরিয়তসম্মত হবে। তবে সর্বোত্তম পন্থা হলো আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা এবং আল্লাহর নির্ধারিত বণ্টন ব্যবস্থার ওপর ভরসা রেখে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া।

