যে কোনো প্রয়োজনে বিনা দ্বিধায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার দোয়া
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জীবনপথের নানা মোড়ে দাঁড়িয়ে কোন সিদ্ধান্তটি সঠিক, আর কোনটি ভুল—এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। বিয়ে, ক্যারিয়ার, ব্যবসা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের নানা টানাফোড়েন; সঠিক পথটি বেছে নেওয়া যেন এক কঠিন সমীকরণ! তবে ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, জীবনের এই দোটানায় হারিয়ে না গিয়ে একমাত্র মহান স্রষ্টার ওপর ভরসা করতে। নিজস্ব জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে সুপ্রিম অথরিটির কাছে নিজের সমস্ত পথ ছেড়ে দেওয়ার মাঝেই রয়েছে প্রকৃত প্রশান্তি।
সিদ্ধান্ত গ্রহণের এই দোলাচলে পথ হারানোর ভয় তাড়াতে কীভাবে আল্লাহর শরণাপন্ন হবেন এবং দোয়ার পাশাপাশি ইসলামের নির্দেশিত সঠিক উপায়ে সিদ্ধান্ত নেবেন—চলুন জেনে নেওয়া যাক সেই আলোকিত গাইডলাইন।
দৈনন্দিন ছোটখাটো দ্বিধায় সাধারণ দোয়া
দৈনন্দিন জীবনের ছোট খাটো বিষয়ে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হলে নিজের ভাষায় পরম করুণাময়ের কাছে মনের আবেগ খুলে দোয়া করা যায়। এ ক্ষেত্রে অনেকে এই সংক্ষিপ্ত নিবেদনটি পড়ে থাকেন—
اللَّهُمَّ خِرْ لِي وَاخْتَرْ لِي
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা খির লি ওয়াখতার লি।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমার জন্য কল্যাণকরটি নির্বাচন করুন এবং আমার জন্য তা বেছে দিন।’
গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সূচনাপঞ্জি: সালাতুল ইস্তেখারা
জীবনের মোড় ঘোরানো বড় সিদ্ধান্তগুলোর সামনে দাঁড়ালে ইসলাম আমাদের ‘ইস্তেখারা’ বা আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনার পথ দেখায়। এটি কেবল একটি আমল নয়, বরং বিশ্বজাহানের মালিকের দরবারে আত্মনিবেদনের এক অপূর্ব মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার সাহাবিদের সুরা শেখানোর মতোই পরম গুরুত্ব দিয়ে এই আমলটি তালিম দিতেন।
হাদিসে এসেছে, হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের সব বিষয়ে ইস্তেখারা করার শিক্ষা দিতেন, যেমন তিনি আমাদের কুরআনের সুরা শেখাতেন।’ (বুখারি ১১৬৬)
কীভাবে করবেন ইস্তেখারা?
যেকোনো বড় বিষয়ের ফয়সালা করার আগে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করতে হয়। নামাজ শেষে আন্তরিক অনুভূতির সঙ্গে পাঠ করতে হয় ইস্তেখারার বিশেষ দোয়া।
ইস্তেখারার পূর্ণাঙ্গ রাসুল নির্দেশিত দোয়া
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ، وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَأَسْتَأْلِوكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيمِ، فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلاَ أَقْدِرُ، وَتَعْلَمُ وَلاَ أَعْلَمُ، وَأَنْتَ عَلاَّمُ الْغُيُوبِ، اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الأَمْرَ خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي... فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ، وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الأَمْرَ شَرٌّ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي... فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاصْرِفْنِي عَنْهُ، وَاقْدُرْ لِيَ الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ ثُمَّ أَرْضِنِي بِهِ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আস্তাখিরুকা বি-ইলমিকা, ওয়া আস্তাকদিরুকা বি-কুদরাতিকা, ওয়া আস-আলুকা মিন ফাদলিকাল আজিমি; ফাইন্নাকা তাকদিরু ওয়া লা আকদিরু, ওয়া তা’লামু ওয়া লা আ’লামু, ওয়া আনতা আল্লামুল গুয়ুব। আল্লাহুম্মা ইন কুনতা তা’লামু আন্না হাজাল আমরা (এখানে নিজের প্রয়োজনের কথা মনে মনে ভাববে বা উচ্চারণ করবে) খাইরুন লি ফি দ্বীনি ওয়া মাআশি ওয়া আকিবাতি আমরি, ফাকদুরহু লি ওয়া ইয়াসসিরহু লি, ছুম্মা বারিক লি ফিহি। ওয়া ইন কুনতা তা’লামু আন্না হাজাল আমরা শাররুন লি ফি দ্বীনি ওয়া মাআশি ওয়া আকিবাতি আমরি, ফাসরিফহু আন্নি ওয়াসরিফনি আনহু, ওয়াকদুর লিয়াল খাইরা হাইসু কানা ছুম্মা আরদিনি বিহি।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার জ্ঞানের সাহায্যে আপনার কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করছি, আপনার কুদরতের সাহায্যে সক্ষমতা চাইছি এবং আপনার মহৎ অনুগ্রহের আবেদন জানাচ্ছি। কেননা আপনিই ক্ষমতাবান, আমি নই; আপনি সব জানেন, আমি কিছুই জানি না। আপনি অদৃশ্য জগতের সম্যক পরিজ্ঞাত। হে আল্লাহ! আপনার জ্ঞানে যদি এই কাজটি আমার দ্বীন, জীবিকা ও পরিণামের জন্য কল্যাণকর হয়, তবে তা আমার জন্য নির্ধারিত করুন, সহজ করে দিন এবং তাতে বরকত দিন। আর আপনার জ্ঞানে যদি এই কাজটি আমার দ্বীন, জীবিকা ও পরিণামের জন্য ক্ষতিকর হয়, তবে তা আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিন, আমাকেও তা থেকে ফিরিয়ে রাখুন। আর যেখানেই কল্যাণ থাকুক, আমার জন্য তা নির্ধারিত করে দিন এবং তাতে আমাকে সন্তুষ্ট রাখুন।’ (বুখারি ৬৩৮২)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সার্বিকভাবে তাঁর কাছে দোয়ার নির্দেশ দিয়ে ঘোষণা করেছেন—
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
‘আর তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা গাফির: আয়াত ৬০)
দোয়া এবং কর্মের সমন্বয়: সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইসলামের স্বর্ণালী নিয়ম
শুধু দোয়া করেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। ইসলাম আমাদের বিশ্বাস ও চেষ্টার নিখুঁত সমন্বয় শেখায়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার চূড়ান্ত মুহূর্তে যে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা চাই—
পরামর্শ বা শুরা গ্রহণ: রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে অত্যন্ত অভিজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। কুরআন মাজিদে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ
‘আর কাজে-কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ কর।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৫৯)
বাস্তবসম্মত চিন্তাভাবনা: বিষয়টি আপনার জন্য কতটা লাভজনক বা ক্ষতিকর হতে পারে, সেটির সব দিক খতিয়ে দেখা।
তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা: সব রকম চিন্তাভাবনা ও পরামর্শের পর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার পর আর পেছনে ফেরা যাবে না, ভরসা রাখতে হবে কেবল স্রষ্টার ওপর।
فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
‘অতঃপর যখন তুমি কোনো সংকল্প করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৫৯)
সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর যদি ফলাফল মনের মতো নাও হয়, তবুও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ মানুষের জ্ঞান সীমিত, আর আল্লাহর বিচার ও প্রজ্ঞা অসীম। আমরা যা সাময়িক ক্ষতি মনে করি, তার নেপথ্যে বড় কোনো কল্যাণ লুকিয়ে থাকতেও পারে।
আমাদের প্রতিটি চাওয়া ও পাওয়ার পেছনের আসল সিদ্ধান্তদাতা এক ও একক সত্তা—আল্লাহ তাআলা। সিদ্ধান্তের আকার বড় হোক বা ছোট, নিজের অহংকার আর আলগা বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত না নিয়ে দোয়ার মাধ্যমে প্রভুর ওপর নিজেকে সঁপে দেওয়াতেই বুদ্ধিমানের পরিচয়। সঠিক ইবাদত, অভিজ্ঞদের পরামর্শ ও পূর্ণ তাওয়াক্কুলের সমন্বয়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত মানুষকে ভুল পথের হতাশা থেকে রক্ষা করে এবং অন্তরে বয়ে আনে চিরন্তন প্রশান্তি।

