বায়াত কী ও কেন? মানবজীবনে বায়াতের প্রয়োজনীয়তা
Advertisement
মুহাম্মাদ রুহুল্লাহ শাজুলি
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৬ পিএম
জেমিনি এআই
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানব জীবন এক মহা সমুদ্রের মতো, যেখানে প্রতিনিয়ত কাম-ক্রোধ, লোভ-লালসা ও শয়তানের প্ররোচনার তুফান ওঠে। এই উত্তাল তরঙ্গে নিজের ঈমান ও আমলকে সঠিক দিশায় টিকিয়ে রাখা সহজ কথা নয়। ঠিক যেমন একজন শিক্ষার্থীকে সঠিক পথ চলতে শিক্ষক বা মেন্টরের কাছে অনুগত হতে হয়, তেমনি দ্বীনের পথে অবিচল থাকতে আল্লাহর সঙ্গে আনুগত হওয়ার এক দৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক ও আধ্যাত্মিক অঙ্গীকার প্রয়োজন হয়। ইসলামের পরিভাষায় পরম সোপানের এই অঙ্গীকারই হলো বায়াত।
বায়াত কী?
বায়াত (بَيْعَةٌ) একটি আরবি শব্দ। আরবি ‘বাইউন’ (بَيْعٌ) মূলধাতু থেকে এসেছে। যার আক্ষরিক অর্থ ক্রয়-বিক্রয় বা চুক্তি করা কিংবা আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া।
ইসলামি পরিভাষায় বায়াত বলতে বোঝায়— আল্লাহর আনুগত্যের উদ্দেশ্যে কোনো যোগ্য ইসলামি নেতা, খলিফা কিংবা পরহেজগার বুজুর্গ/পীর-মুর্শিদের হাতে হাত রেখে আনুগত প্রকাশ করা, আত্মশুদ্ধি অর্জন করা, গুনাহ ত্যাগ করা এবং শরিয়তের বিধানাবলী অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার জন্য আল্লাহর নামে যে আত্মনিবেদনের অঙ্গীকার করা হয়। মূলত এই চুক্তির মাধ্যমে একজন বান্দা নিজের নফসের ওপর আল্লাহর হুকুম ও সুন্নাহর বিধানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চুক্তি সম্পাদন করে।
সহজ কথায়, এটি হচ্ছে নিজের ইচ্ছা ও জীবনকে আল্লাহর বিধান এবং তাঁর রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহর অনুগত করার এক আনুষ্ঠানিক চুক্তি। সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে চুক্তি। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে সাহাবিদের নেওয়া বায়াতকে সরাসরি তাঁর নিজের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি হিসেবে ঘোষণা করেছেন—
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ
‘নিশ্চয়ই যারা আপনার কাছে বায়াত গ্রহণ করে, তারা তো মূলত আল্লাহর কাছেই বায়াত গ্রহণ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর রয়েছে।’ (সুরা আল-ফাতহ: আয়াত ১০)
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: বায়াত কেন করা হয়?
ইসলামের ইতিহাসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় সাহাবিগণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে বায়াত হয়েছিলেন। প্রধানত যেসব কারণে বায়াত করা হতো, তাহলো—
১. বায়াতে আকাবা
ইসলাম গ্রহণ ও রাসুল (সা.)-কে সুরক্ষার শপথ। নবুয়তের একাদশ ও দ্বাদশ বছরে মক্কার অদূরে ‘আকাবা’ নামক স্থানে মদিনার (তৎকালীন ইয়াসরিব) আনসার সাহাবিদের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যে ঐতিহাসিক চুক্তি ও আনুগত্যের শপথ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, ইতিহাসে তা ‘বায়াতে আকাবা’ নামে পরিচিত।
ইসলামের ইতিহাসে এই বায়াত এক যুগান্তকারী মোড় এনে দিয়েছিল। এর মাধ্যমেই মক্কার চরম জুলুম-নির্যাতনের শিকার মুসলমানদের জন্য মদিনায় হিজরতের পথ সুগম হয় এবং প্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।
বায়াতে আকাবা মূলত দুই দফায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল—
প্রথম বায়াতে আকাবা (নবুয়তের ১২তম বছর)
নবুয়তের একাদশ বছরে হজ মৌসুমে মদিনার ‘খাজরাজ’ গোত্রের ৬ জন ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। এর পরের বছর (৬২১ খ্রিষ্টাব্দে) মদিনা থেকে ১২ জন মুসলমান মক্কার আকাবা নামক স্থানে এসে গোপনে নবিজি (সা.)-এর কাছে একটি বায়াত গ্রহণ করেন।
যেসব বিষয়ের ওপর বায়াত নেওয়া হয়েছিল—
- আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা।
- চুরি ও ব্যভিচার না করা।
- সন্তান হত্যা না করা।
- কারও ওপর মিথ্যা অপবাদ না দেওয়া।
- সৎ কাজে রাসুল (সা.)-এর অবাধ্য না হওয়া।
এটি ছিল মূলত আকিদা, ইমান ও চরিত্র গঠনের বায়াত। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের দ্বীন শেখানোর জন্য মুসাব ইবনে উমাইর (রা.)-কে প্রথম দাঈ হিসেবে মদিনায় পাঠান।
দ্বিতীয় বায়াতে আকাবা: সুরক্ষার মহাসপথ (নবুয়তের ১৩তম বছর)
প্রথম বায়াতের এক বছর পর (৬২২ খ্রিষ্টাব্দে) হজ মৌসুমে মুসাব ইবনে উমাইর (রা.)-এর দাওয়াতি পরিশ্রমে মদিনার ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন নারী (মোট ৭৫ জন) মক্কায় আসেন। শেষ রাতে আকাবার উপত্যকায় নবিজি (সা.)-এর সঙ্গে অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্যে তাদের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ ঘটে। নবিজি (সা.)-এর সঙ্গে তার পিতৃব্য আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবও (যিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি, কিন্তু ভাতিজার নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন) উপস্থিত ছিলেন।
এই বায়াতে নবীজি (সা.)-কে কেবল নেতা হিসেবে গ্রহণ করাই হয়নি, বরং তার পূর্ণ সুরক্ষা ও নিরাপত্তার কঠোর অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল। সুরক্ষার সেই ঐতিহাসিক শর্তাবলী—
- সুখে-দুঃখে নবিজি (সা.)-এর কথা শোনা ও মান্য করা।
- কষ্টে ও স্বাচ্ছন্দ্যে দ্বীনের জন্য অর্থ ব্যয় করা।
- সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা।
- আল্লাহর পথে সত্য কথা বলতে গিয়ে কারও সমালোচনার ভয় না করা।
- রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় হিজরত করবেন, তখন নিজেদের সন্তান ও স্ত্রী-পরিবারকে যেভাবে বিপদ থেকে রক্ষা করা হয়, ঠিক একইভাবে রাসুল (সা.)-কে সুরক্ষা দেওয়া এবং তার জন্য জীবন বাজি রেখে লড়াই করা।
কুরআন ও হাদিসের আলোয় বায়াতে আকাবা
এই বায়াতে আনসার সাহাবিরা রাসুল (সা.)-কে সুরক্ষার যে অঙ্গীকার করেছিলেন, তা শুধু মুখে ছিল না। সাহাবি হজরত বারা ইবনে আজিব (রা.) ও জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এই শপথের গভীরতা ফুটে ওঠে।
হাদিসের উপমা ও বারা ইবনে আজিব (রা.)-এর ভাষণ
হজরত আল-বারা ইবনে মা’রুর (রা.)। তিনি মদিনার আনসারদের বনু সালিমা গোত্রের সম্মানিত সরদার ছিলেন এবং তিনি দ্বিতীয় বায়াতে আকাবায় আনসারদের পক্ষ থেকে নবিজি (সা.)-এর হাত ধরে প্রথম বায়াত গ্রহণ করার গৌরব অর্জন করেন।
হজরত আব্বাসের ভাষণ
দ্বিতীয় বায়াতে আকাবার শেষ রাতে যখন মদিনার ৭৫ জন মুসলিম নবিজি (সা.)-এর সাথে গোপনে সাক্ষাৎ করেন, তখন নবিজি (সা.)-এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (যিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি) আনসারদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন—
‘হে খাজরাজ সম্প্রদায়! মোহাম্মদ আমাদের কাছে অত্যন্ত সম্মানে আছেন। তোমরা যদি তাকে তোমাদের দেশে নিয়ে গিয়ে নিরাপত্তা দিতে পারো, তবেই তাকে সাথে নাও। আর যদি বিপদের সময় তাকে শত্রুর হাতে সমর্পণ করার ভয় থাকে, তবে এখনই তাকে ছেড়ে দাও।’
দ্বিতীয় বায়াতে আকাবার সময় হজরত আব্বাসের এই কথার জবাবে মদিনার প্রখ্যাত সরদার ও আনসারি সাহাবি হজরত আল-বারা ইবনে মারুর (রা.) নবিজি (সা.)-এর হাত ধরে দৃঢ় কণ্ঠে পরম সাহসিকতার সাথে সুরক্ষার এই ঐতিহাসিক শপথ বাক্য পাঠ করেছিলেন—
نَعَمْ وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ نَبِيًّا، لَنَمْنَعَنَّكَ مِمَّا نَمْنَعُ مِنْهُ أُزُرَنَا، فَبَايِعْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَنَحْنُ وَاللَّهِ أَبْنَاءُ الْحُرُوبِ، وَأَهْلُ الْحَلَقِ، وَرِثْنَاهَا كَابِرًا عَنْ كَابِرٍ
উচ্চারণ: ‘নাআম, ওয়াল্লাজি বাআছাকা বিল-হাক্কি নাবিয়্যান, লেনামনাআন্নাকা মিম্মা নামনাউ মিনহু উজোরানা, ফাবায়িয়না ইয়া রাসুলাল্লাহ; ফানাহনু ওয়াল্লাহি আবনাউল হুরুবি, ওয়া আহলুল হালাকি, ওয়ারিছনাহা কাবিরাম আন কাবিরিন।’
অর্থ: ‘হ্যাঁ, যিনি আপনাকে সত্যসহকারে নবি হিসেবে প্রেরণ করেছেন তার কসম! আমরা আমাদের পরিবার-পরিজনকে যেভাবে রক্ষা করি, আপনাকেও ঠিক সেভাবে রক্ষা করব। সুতরাং আপনি আমাদের বায়াত গ্রহণ করুন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর কসম! আমরা যুদ্ধবিদ্যার সন্তান এবং অস্ত্রের ব্যবহারকারী বীরের জাতি, যা আমরা বংশানুক্রমিকভাবে পূর্বপুরুষদের থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছি।’ (সিরাতে ইবনে হিশাম ১/৪৬৩)
প্রতিদানের বিষয়ে প্রশ্ন ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জান্নাতের সুসংবাদ
হজরত আল-বারা (রা.)-এর বক্তব্যের পর আনসার সাহাবি আবু আল-হাইসাম ইবনুত তাইয়্যিহান (রা.) অথবা আস'আদ ইবনে জুরারাহ (রা.) দাঁড়িয়ে নবীজি (সা.)-কে এই ত্যাগের প্রতিদান সম্পর্কে প্রশ্ন করেন—
فَمَا لَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنْ وَفَيْنَا بِذَلِكَ؟
উচ্চারণ: ‘ফামা লানা ইয়া রাসুলাল্লাহি ইন ওয়া ফাইনা বিজালিকা?’
অর্থ: ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমরা যদি এই শপথ ও অঙ্গীকার পূর্ণ করি (এবং প্রয়োজনে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিই), তবে আমাদের জন্য কী রয়েছে?’
রাসুলুল্লাহ (সা.) মিটিমিটি হেসে একটি শব্দের এক ঐতিহাসিক উত্তর দিয়েছিলেন—
الْجَنَّةُ
উচ্চারণ: ‘আল-জান্নাহ।’
অর্থ: ‘জান্নাত।’
সাহাবিরা একবাক্যে আনন্দিত হয়ে বলে উঠেছিলেন—
ابْسُطْ يَدَكَ، فَبَسَطَ يَدَهُ فَبَايَعُوهُ
উচ্চারণ: ‘উবসোত ইয়াদাকা, ফাবাসাতা ইয়াদাহু ফাবায়াউহু।’
অর্থ: ‘আপনার হাত বাড়িয়ে দিন! অতঃপর তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন এবং সাহাবিগণ তার হাতে বায়াত গ্রহণ করলেন।’ (সিরাতে ইবনে হিশাম ১/৪৬৪, আর-রাহীকুল মাখতুম)
আনসারি সাহাবিদের এই আত্মত্যাগ ও সুরক্ষার প্রতিশ্রুতিকে স্মরণ করে আল্লাহ তাআলা কুরআনে তাদের ঈমান ও ত্যাগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন—
وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِن قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ
‘আর যারা হিজরতের আগেই মদিনাকে ঠিকানা বানিয়েছিল এবং ইমান এনেছিল, তারা হিজরতকারীদের ভালোবাসে এবং হিজরতকারীদের যা দেওয়া হয়, তার জন্য তারা নিজেদের অন্তরে কোনো চাহিদা অনুভব করে না। আর তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়, যদিও নিজেরা অভাবগ্রস্ত হয়।’ (সুরা আল-হাশর: আয়াত ৯)
বায়াতে আকাবা ছিল মূলত একটি বাঁক-বদলকারী ঘটনা। মক্কার অসহায়ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে দ্বীন প্রতিষ্ঠার যে সশস্ত্র সুরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় ভিত্তির প্রয়োজন ছিল, আনসারদের এই ঐতিহাসিক সুরক্ষার শপথের মাধ্যমেই তার শুভসূচনা ঘটেছিল।
২. বায়াতে রিদওয়ান: হুদাইবিয়ার প্রান্তরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়াই ও আনুগত্যের শপথ।
ষষ্ঠ হিজরিতে প্রখ্যাত হুদাইবিয়ার প্রান্তরে সাহাবিদের জীবন বাজি রেখে নেওয়া ঐতিহাসিক আত্মোৎসর্গের শপথই ইতিহাসে ‘বায়াতে রিদওয়ান’ নামে পরিচিত।
নবীজি (সা.) ১৪০০ সাহাবিকে নিয়ে উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে রওনা হন। কিন্তু কুরাইশরা তাদের বাধা দিলে তিনি পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য ওসমান (রা.)-কে দূত হিসেবে মক্কায় পাঠান। মক্কায় ওসমান (রা.) শত্রুদের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে তার শাহাদাতের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এই চরম বিপদে নবীজি (সা.) বাবলা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সাহাবিদের থেকে রক্তের বদলা ও শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার এক ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণ করান।
কুরআন মাজিদে বায়াতে রিদওয়ানের স্বীকৃতি
এই বায়াতে অংশগ্রহণকারী সাহাবিদের ওপর পরম করুণাময় আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে মহাগ্রন্থ কুরআনে বিশেষ আয়াত নাজিল করেন। আরবিতে ‘রিদওয়ান’ শব্দের অর্থ ‘সন্তুষ্টি’; তাই আল্লাহ তাআলার বিশেষ সন্তুষ্টি লাভের কারণে এই বায়াতকে ‘বায়াতে রিদওয়ান’ বলা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَّقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا
উচ্চারণ: ‘লাকাদ রাদিয়াল্লাহু আনিল মু'মিনিনা ইজ ইউবায়িউনাকা তাহতাশ শাজারাতি ফাআলিমা মা ফি কুলুবিহিম ফাআনজালাস সাকিনাতা আলাইহিম ওয়া আসাবাহুম ফাতহান কারিবা।’
অর্থ: ‘অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে বায়াত গ্রহণ করছিল। তাদের অন্তরে যা ছিল তা তিনি জানতেন; ফলে তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি নাজিল করলেন এবং তাদের জন্য এক নিকটবর্তী বিজয় নির্ধারিত করে দিলেন।’ (সুরা আল-ফাতহ: আয়াত ১৮)
হাদিসের আলোয় বায়াতে রিদওয়ানের মূল অঙ্গীকার
সাহাবি হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘বায়াতে রিদওয়ানের দিন আপনারা কিসের ওপর বায়াত নিয়েছিলেন? মৃত্যুর ওপর?’ তিনি উত্তরে বলেছিলেন—
لَمْ نُبَايِعْهُ عَلَى الْمَوْتِ، وَلَكِنْ بَايَعْنَاهُ عَلَى أَنْ لاَ نَفِرَّ
উচ্চারণ: ‘লাম নুবায়’হু আলাল মাউতি, ওয়ালাকিন বায়া’নাহু আলা আল-লা নাফিরা।’
অর্থ: ‘আমরা মৃত্যুর ওপর বায়াত হইনি; বরং আমরা শপথ করেছিলাম যে আমরা মাঠ ছেড়ে কখনো পলায়ন করব না (শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নবীজির আনুগত্যে অটল থাকব)।’ (মুসলিম ১৮৫৬)
তাৎপর্য ও প্রভাব
রাসুল (সা.)-এর সুসংবাদ— নবীজি (সা.) এই বায়াতে অংশগ্রহণকারীদের ভূয়সী প্রশংসা করে ঘোষণা করেন— ‘আজ যারা এই গাছের নিচে বায়াত হয়েছ, তাদের একজনও জাহান্নামে প্রবেশ করবে না (সুবহানাল্লাহ)।’ (মুসলিম ২৪৯৬)
মক্কা বিজয়ের গোড়াপত্তন— মুসলমানদের এই নজিরবিহীন ইমানি দৃঢ়তা দেখে কুরাইশরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং হজরত ওসমান (রা.)-কে মুক্তি দিয়ে ঐতিহাসিক ‘হুদাইবিয়ার সন্ধি’ স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়, যা পরবর্তীতে মক্কা বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে।
৩. আমল ও তাওবার বায়াত: পাপ পরিত্যাগ করে হেদায়েতের পথে চলার শপথ।
আমল ও তাওবার বায়াত হলো নিজের অতীত জীবনের যাবতীয় পাপ ও ভুলত্রুটির জন্য লজ্জিত হয়ে মহান আল্লাহর দরবারে খাঁটি মনে অনুশোচনা করা এবং একজন যোগ্য দ্বীনি রাহবারের হাত ধরে আজীবন সুন্নাহসম্মত উপায়ে সৎ ও চরিত্রবান জীবন পরিচালনার এক দৃঢ় আত্মিক প্রতিশ্রুতি।
ইসলামে এটি আত্মশুদ্ধি (তাজকিয়া-এ-নফস) এবং আত্মিক ব্যাধি দূর করার এক চমৎকার অনুঘটক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কুরআন মাজিদের আলোয় তওবা ও বায়াত
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের সর্বাবস্থায় খাঁটি তওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র দরবারে নারীদের আমল ও তওবার বায়াতের কাঠামো নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কোরআনের নির্দেশ—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا
উচ্চারণ: ‘ইয়া আইয়ু হাল্লাজিনা আমানু তুবু ইলাল্লাহি তাওবাতান নাসুহা।’
অর্থ: ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো—এক খাঁটি ও আন্তরিক তওবা।’ (সুরা আত-তাহরিম: আয়াত ৮)
আমল ও পাপ ত্যাগের বায়াত সম্পর্কে কুরআনের নির্দেশ—
یٰۤاَیُّهَا النَّبِیُّ اِذَا جَآءَكَ الۡمُؤۡمِنٰتُ یُبَایِعۡنَكَ عَلٰۤی اَنۡ لَّا یُشۡرِكۡنَ بِاللّٰهِ شَیۡئًا وَّ لَا یَسۡرِقۡنَ وَ لَا یَزۡنِیۡنَ وَ لَا یَقۡتُلۡنَ اَوۡلَادَهُنَّ وَ لَا یَاۡتِیۡنَ بِبُهۡتَانٍ یَّفۡتَرِیۡنَهٗ بَیۡنَ اَیۡدِیۡهِنَّ وَ اَرۡجُلِهِنَّ وَ لَا یَعۡصِیۡنَكَ فِیۡ مَعۡرُوۡفٍ فَبَایِعۡهُنَّ وَ اسۡتَغۡفِرۡ لَهُنَّ اللّٰهَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
উচ্চারণ: ‘ইয়া আইয়ুহান নাবিয়্যু ইজা জা-আকাল মু’মিনাতু ইউবায়িউনাকা আলা আল-লা ইউশরিকনা বিল্লাহি শাইআও ওয়া লা ইয়াসরিকনা ওয়া লা ইয়াজনিনা ওয়া লা ইয়াকতুলনা আওলাদাহুন্না ওয়া লা ইয়া’তিনা বিবুহতানিই ইয়াফতারিনাহু বায়না আয়দিহিন্না ওয়া আরঝুলিহিন্না ওয়া লা ইয়া’সিনাকা ফি মা’রুফিন ফাবায়ি’হুন্না ওস্তাগফির লাহুন্নাল্লাহ ‘
অর্থ: ‘হে নবী, যখন মুমিন নারীরা তোমার কাছে এসে এই মর্মে বায়াত করে যে, তারা আল্লাহর সাথে কোনো কিছু শরিক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, তারা জেনে শুনে কোনো অপবাদ রচনা করে রটাবে না এবং সৎকাজে তারা তোমার অবাধ্য হবে না। তখন তুমি তাদের বায়াত গ্রহণ কর এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আল-মুমতাহিনা: আয়াত ১২)
সুন্নাহ ও হাদিসের আলোয় আমল ও তাওবার বায়াত
রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু ইমান আনা বা জিহাদের জন্যই নয়, বরং সাহাবিদের থেকে দৈনন্দিন জীবনে শরিয়তের পাবন্দি করা এবং পাপ ত্যাগের ওপর বায়াত নিতেন।
সাহাবি হজরত শাদাদ ইবনে আউস (রা.) ও উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের একত্রিত করে বলেছিলেন—
بَايِعُونِي عَلَى أَنْ لاَ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيْئًا، وَلاَ تَسْرِقُوا، وَلاَ تَزْنُوا... فَمَنْ وَفَى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ
উচ্চারণ: ‘বায়িউনি আলা আল-লা তুশরিকু বিল্লাহি শাইআও, ওয়া লা তাসরিকু, ওয়া লা তাজ নু... ফামান ওয়াফা মিনকুম ফা-আজরুহু আলাল্লাহ।’
অর্থ: ‘তোমরা আমার কাছে এই মর্মে বায়াত গ্রহণ করো যে—আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না... তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে, তার প্রতিদান আল্লাহর জিম্মায়।’ (বুখারি ১৮, মুসলিম ১৭০৯)
৪. জীবন পরিবর্তনে আমল ও তাওবার বায়াতের ভূমিকা
- তাওবার স্থায়িত্ব— মানসিকভাবে কোনো যোগ্য ও বুজুর্গ আলেমের হাত ধরে বা তার সামনে তাওবার বায়াত হলে অন্তরে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও ইমানি দায়বদ্ধতা তৈরি হয়, যা মানুষকে পরবর্তীতে পাপাচারে ফিরে যেতে বাধা দেয়।
- আত্মিক রোগ নিরাময়— অহংকার, হিংসা, লোকদেখানোপনা (রিয়া) ও গিবতের মতো মারাত্মক আত্মিক ব্যাধিগুলো থেকে বেঁচে থাকতে একজন রুহানি চিকিৎসকের (শায়খ) তত্ত্বাবধান বা বায়াত দারুণ ভূমিকা রাখে।
- সুন্নাহমুখী জীবন— একজন বান্দাকে নিয়মিত নামাজ, জিকির-আজকার এবং নববি সুন্নাহ অনুসরণে অভ্যস্ত করে তোলাই আমল ও তাওবার বায়াতের মূল লক্ষ্য।
মানব জীবনে বায়াতের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?
আধুনিক যুগের জটিল সামাজিক ও সামাজিক জীবনযাত্রায় আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার জন্য বায়াতের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। নিচে মানব জীবনে এর মূল প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করা হলো—
- আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশক (মুরুব্বি) লাভ: একা একা দ্বীনের সঠিক পথ ধরে রাখা কঠিন। কোনো খাঁটি আলেমে দ্বীন বা শায়খের কাছে বায়াত হলে জীবন পরিচালনায় তিনি অভিভাবক হিসেবে ভুলত্রুটি শুধরে দেন।
- তাওবার ওপর অবিচল থাকা: মানুষ অনুসূচনা করে তাওবা করলেও বারবার পাপের দিকে ফিরে যায়। বায়াতের চুক্তি একজন মানুষকে প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দেয়, যা পাপ প্রতিরোধে ঢাল হিসেবে কাজ করে।
- নফসের রোগ ও অহংকার নিরাময়: হিংসা, অহংকার, গিবত ও রিয়া (লোকদেখানো আমল)—এই সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক রোগগুলো নিজ চেষ্টায় দূর করা দুষ্কর। অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মতো একজন রুহানি রাহবার বায়াতের মাধ্যমে এসব রোগ থেকে মুক্তির পথ বাতলে দেন।
- আনুগত্যের শৃঙ্খলা শিক্ষা: বায়াত মানুষকে সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলতে শেখায় এবং দ্বীনের যেকোনো ঐক্যবদ্ধ কাজে আমিরের বা নেতার আনুগত্যের চর্চা করায়।
হাদিস শরীফে সঠিক পথপ্রদর্শক ও দ্বীনি নেতৃত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছেন—
مَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِي عُنُقِهِ بَيْعَةٌ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً
‘যে ব্যক্তি তার ঘাড়ে (আনুগত্যের) কোনো বায়াত ছাড়া মৃত্যুবরণ করল, সে জাহেলিয়াতের মৃত্যু লাভ করল।’ (মুসলিম ১৮৫১)
বায়াত গ্রহণের ক্ষেত্রে জরুরি শর্তাবলি
আজকের সমাজে বায়াত ও পীর-মুরিদি নিয়ে নানা ভ্রান্তি দেখা যায়। তাই বায়াত হওয়ার আগে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা আবশ্যক—
- শরীয়তের পূর্ণ পাবন্দি: যার কাছে বায়াত হবেন, তাকে অবশ্যই কুরআন ও সুন্নাহর পূর্ণ অনুসারী ও পরহেজগার হতে হবে। শরিয়তবিরোধী কোনো কাজে কারো বায়াত হওয়া যাবে না।
- অন্ধ অনুকরণ নিষিদ্ধ: আল্লাহর অবাধ্য হয়ে কোনো মানুষের আনুগত্য করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন—
لاَ طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةِ اللَّهِ إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ
‘আল্লাহর অবাধ্যতায় কোনো আনুগত্য নেই। আনুগত্য কেবল সৎ কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।’ (বুখারি ৭১৪৫, মুসলিম ১৮৪০)
বায়াত মূলত কোনো নতুন নিয়ম বা ধর্মের বাড়তি অনুষঙ্গ নয়; বরং এটি ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার ওপর নিজেকে স্থায়ীভাবে সঁপে দেওয়ার এক আত্মিক প্রতিজ্ঞা। অন্তরের কলুষতা দূর করে আল্লাহর খাঁটি বান্দা হিসেবে গড়ে উঠতে এবং শয়তানের চক্রান্ত থেকে বাঁচতে সঠিক দ্বীনি অভিভাবকের সান্নিধ্য ও বায়াতের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আত্মশুদ্ধি, পরামর্শ ও আনুগত্যের সঠিক চর্চায় বায়াত মানব জীবনকে সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও পরকালীন মুক্তির উপযোগী করে তোলে।
