Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

গায়ে হলুদের সামগ্রী বিক্রির শরিয়তসম্মত বিধান কী?

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৩ পিএম

গায়ে হলুদের সামগ্রী বিক্রির শরিয়তসম্মত বিধান কী?

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

আধুনিক সামাজিক উৎসবে নানা ধরনের প্রথা ও আয়োজনের ছড়াছড়ি দেখা যায়, যার মধ্যে ‘গায়ে হলুদ’ অনুষ্ঠান অন্যতম। এই আনন্দঘন আয়োজনে বিভিন্ন ধরনের প্রসাধন, সাজসজ্জার সামগ্রী ও উপকরণের ব্যবসা প্রচলিত রয়েছে। তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে এসব উপকরণের ব্যবসা কতটা বৈধ বা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে মুমিন ব্যবসায়ীদের মনে নানা প্রশ্ন জাগে। ইসলামি বাণিজ্যিক নীতিমালায় পলের ব্যবহার, উপকারিতা এবং পাপ বা অনর্থক রসম-রেওয়াজে সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে ব্যবসার সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

পণ্য ও উপকরণের ধরনভেদে ব্যবসার শরিয়তি বিধান

বিশুদ্ধ ব্যবসার মূলনীতি

গায়ে হলুদের সামগ্রী বিক্রির ক্ষেত্রে পণ্যগুলো কোন প্রকৃতির, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব সামগ্রী কেবল নিজস্ব স্বকীয়তা ও শরিয়তবহির্ভূত ‘গায়ে হলুদ’ অনুষ্ঠানের জন্যই বিশেষভাবে তৈরি বা নির্দিষ্ট করা হয়, তা বিক্রি করা বা ভাড়া দেওয়া মাকরুহ বা অপছন্দনীয়। কারণ এর মাধ্যমে গুনাহের বা বিজাতীয় রসমের কাজে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করা হয়।

পক্ষান্তরে যেসব পণ্য মানুষের দৈনন্দিন বা স্বাভাবিক বৈধ কাজেও সমানভাবে ব্যবহার করা যায়, তা বিক্রি করায় কোনো বাধা বা সমস্যা নেই।

সাহায্য ও সহযোগিতার সীমারেখা

ইসলামে সৎ ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহায়তা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, পক্ষান্তরে পাপাচার বা সীমালঙ্ঘনের কাজে পারস্পরিক সহযোগিতা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন—

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ

‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সাহায্য করো; পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা আল-মায়েদা: আয়াত ২)

অমুসলিমদের ধর্মীয় বা বিশেষ প্রতীক বিক্রি

শরিয়তের ফিকহি কিতাবাদিতে অমুসলিমদের কিছু বিশেষ ধর্মীয় সামগ্রী বা পোশাক বিক্রির বৈধতার কথা উল্লেখ রয়েছে। যেমন ফিকহ শাস্ত্রের গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত হয়েছে—

لَا يَكْرَهُ بيعُ الزَّنَانِيرِ مِنَ النَّصْرَانِيِّ وَالْقَلَنْسُوَةِ مِنَ الْمَجُوسِيِّ

‘খ্রিস্টানদের জনার (কোমরের বিশেষ ফেট্টি) এবং মাজুসীদের (অগ্নিউপাসকদের) টুপি বিক্রি করা মাকরুহ বা অপছন্দনীয় নয়।’ (ফতোয়া শামি)

অন্যত্র ফতোয়ায় এসেছে—

وَبَيْعُ الزُّنَارِ مِنَ النَّصْرَانِيِّ وَبَيْعُ قَلَنْسُوَةِ الْمَجُوسِيِّ مِنَ الْمَجُوسِيِّ جَائِزٌ مِنْ غَيْرِ كَرَاهَةٍ

‘খ্রিস্টানের কাছে জনার এবং মাজুসীর কাছে মাজুসীর টুপি বিক্রি করা কোনো ধরনের মাকরুহ ছাড়াই জায়েজ।’ (ফতোয়া তাতারখানিয়া)

উপকারিতার ভিত্তিতে পণ্যের বৈধতা

কোনো বস্তু বা সামগ্রী যদি কাঠ, পিতল বা এ জাতীয় উপাদানে তৈরি হয় এবং তা দ্বারা শরিয়তসম্মত উপায়ে উপকৃত হওয়া সম্ভব হয়, তবে সর্বসম্মতিক্রমে তা বিক্রি করা জায়েজ। এ প্রসঙ্গে ফিকহের কিতাবে রয়েছে—

لِأَنَّهَا لَوْ كَانَتْ مِنْ خَشَبٍ أَوْ صُفْرٍ جَازَ اتِّفَاقًا فِيمَا يَظْهَرُ لِإِمْكَانِ الِانْتِفَاعِ بِهَا

‘কারণ, সেগুলোর সামগ্রী যদি কাঠ বা পিতল দিয়ে তৈরি হয়, তবে ظاهراً (দৃশ্যত) সর্বসম্মতিক্রমে তা বিক্রি করা জায়েজ; কেননা এগুলো দ্বারা (শরিয়তসম্মত উপায়ে) উপকৃত হওয়া সম্ভব।’ (ফতোয়া শামি)

অনুপযোগী বা খেলনা সামগ্রীর আর্থিক মূল্যায়ন

শরিয়তের দৃষ্টিতে যেসব বস্তুর কোনো বৈধ ও বাস্তব উপযোগিতা নেই, তার ক্রয়-বিক্রয় ও আর্থিক মূল্যায়ন শুদ্ধ নয়। যেমন—

اشْتَرَى ثَوْبًا أَوْ فَرَسًا مِنْ خَزَفٍ لِأَجْلِ اسْتِينَاسِ الصَّبِيِّ لَا يَصِحُّ وَلَا قِيمَةَ لَهُ

‘কোনো ব্যক্তি যদি কেবল শিশুর বিনোদনের জন্য মাটি বা চিনা মাটির তৈরি কোনো কাপড় বা ঘোড়া (পুতুল জাতীয় কিছু) ক্রয় করে, তবে সে ক্রয় বৈধ হবে না এবং তার কোনো আর্থিক মূল্যও নেই।’ (ফতোয়া শামি)

একইভাবে যেসব বস্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে মূল্যবান সম্পদ (মাল-ই মুতাকওয়্যিম) নয়। যেমন— মদ, শুকর কিংবা মাটির তৈরি ঘোড়া বা ষাঁড়ের মতো পুতুল জাতীয় বস্তু—সেগুলোর ক্রয়-বিক্রয় বাতিল বলে গণ্য হয়। (আদ-দররুল মুনতাকি)।

প্রাণীর ছবি ও মূর্তি তৈরির নিষেধাজ্ঞা

ইসলামে প্রাণীর ছবি বা মূর্তি তৈরি করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইমাম নববী (রহ.) এ বিষয়ে ইজমা বা ঐকমত্য বর্ণনা করে বলেন—

الْإِجْمَاعُ عَلَى تَحْرِيمِ تَصْوِيرِ الْحَيَوَانِ، وَقَالَ: سَوَاءٌ صَنَعَهُ لِمَا يُمْْتَهَنُ أَوْ لِغَيْرِهِ، فَصَنْعَتُهُ حَرَامٌ بِكُلِّ حَالٍ؛ لِأَنَّ فِيهِ مُضَاهَاةً لِخَلْقِ اللَّهِ تَعَالَى

‘প্রাণীর ছবি বা মূর্তি তৈরি করা হারাম হওয়ার ওপর ইজমা (ঐকমত্য) রয়েছে। ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন— তা ব্যবহার্য বস্তু হিসেবে তৈরি করা হোক কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে, সর্বাবস্থায় তা তৈরি করা হারাম। কারণ এর মধ্যে মহান আল্লাহর সৃষ্টির সদৃশ বা অনুকরণ করার অপচেষ্টা রয়েছে।’ (শরহে নববি) এটি কাপড়, বিছানা, মুদ্রা, পাত্র বা দেওয়াল—সর্বত্রই সমানভাবে প্রযোজ্য।

পরিশেষে, একজন প্রকৃত ইমানদারের জন্য সর্বোত্তম পথ হলো— সন্দেহজনক বিষয়, বিজাতীয় রসম-রেওয়াজ ও অনর্থক প্রথাকে উৎসাহিত করে এমন বিতর্কিত সামগ্রীর বাণিজ্য পরিহার করা। এর পরিবর্তে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, সন্দেহমুক্ত ও হালাল পণ্যের ব্যবসা পরিচালনা করাই একজন মুমিনের ব্যবসায়িক জীবনের মূল সৌন্দর্য, যা দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও বরকত বয়ে আনে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম