মাসবুক ব্যক্তির নামাজ: ভুল হলে সাহু সিজদার বিধান ও সঠিক নিয়ম কী?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম
নামাজ। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রশ্ন— মাসবুক ব্যক্তি ইমামের সালাম ফেরানোর পর নিজের ছুটে যাওয়া নামাজ পড়ার সময় যদি কোনো ভুল করে, তাহলে কি তার সাহু সিজদা দিতে হবে?
ইসলামি শরিয়তে জামাতে নামাজ আদায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে অনেক সময় দেখা যায়, জামাত শুরু হওয়ার পর কোনো মুসল্লি এসে শরিক হন। ফিকহের পরিভাষায় এমন ব্যক্তিকে ‘মাসবুক’ বলা হয়। মাসবুক ব্যক্তি কীভাবে তার বাকি নামাজ শেষ করবেন এবং এই সময়ে কোনো ভুল হলে তার সমাধান কী—তা জানা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অত্যন্ত জরুরি। চলুন, চমৎকার এ বিষয়ে ইসলামি বিধান ও দিকনির্দেশনা জেনে নেওয়া যাক।
মাসবুক ব্যক্তির নিজের ভুলে সাহু সিজদার বিধান
ইমাম সালাম ফেরানোর পর মাসবুক ব্যক্তি যখন তার ছুটে যাওয়া নামাজ শেষ করার জন্য দাঁড়ান, তখন তিনি মূলত ‘মুনফারিদ’ বা একা নামাজ আদায়কারীর হুকুমে গণ্য হন।
- একা পড়ার সময় ভুল হলে: ছুটে যাওয়া অংশ আদায়ের সময় যদি মাসবুক ব্যক্তির দ্বারা এমন কোনো ভুল হয় যার কারণে সাহু সিজদা ওয়াজিব হয়, তবে তাকে অবশ্যই নামাজের শেষে সাহু সিজদা দিতে হবে।
- ইমামের পেছনে থাকার সময় ভুল হলে: ইমামের পেছনে থাকা অবস্থায় (মুক্তাদি থাকাকালে) মাসবুক ব্যক্তির নিজের কোনো ভুল হলে সেটির জন্য পৃথকভাবে সাহু সিজদা দিতে হবে না। কারণ, তখন সে ইমামের অনুসরণে ছিল।
ইমামের সাহু সিজদায় মাসবুক ব্যক্তির করণীয়
ইমাম যদি নামাজে কোনো ভুল করে সাহু সিজদা দেন, তবে মাসবুক ব্যক্তিকেও ইমামের সাথে সেই সাহু সিজদায় শরিক হতে হবে।
জরুরি সতর্কতা: সাহু সিজদা দেওয়ার আগে ইমাম যখন প্রথম সালাম ফেরান, তখন মাসবুক ব্যক্তি কিন্তু সালাম ফেরাবে না। কেবল সিজদায় শরিক হবে। এ বিষয়ে তাবেয়ি ইবরাহিম নাখঈ (রহ.) সুন্দর এক হিদায়াত দিয়েছেন—
‘ইমাম নামাজে কোনো ভুল করে ফেলার পর কেউ যদি এসে ইমামের সঙ্গে শরিক হয়, সে যেন ইমামের সঙ্গে সাহু সিজদায় শরিক হয়; এরপর তার ছুটে যাওয়া রাকাত আদায় করে।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ৪৫৯২)
পরবর্তীতে আদায় করা: কোনো কারণে মাসবুক ব্যক্তি যদি ইমামের সঙ্গে সাহু সিজদায় শরিক হতে না পারে, তবে নিজের ছুটে যাওয়া অংশ শেষ করে একদম শেষে সাহু সিজদা দিলেও নামাজ আদায় হয়ে যাবে।
সাহু সিজদা না দিলে: কিন্তু যদি কেউ ইমামের সঙ্গেও শরিক না হয় এবং শেষেও সাহু সিজদা না দেয়, তবে সেই ত্রুটিপূর্ণ নামাজটি পুনরায় আদায় করা ওয়াজিব হবে।
সাহু সিজদা কী এবং কেন দেওয়া হয়?
নামাজের সাধারণ ভুলত্রুটি সংশোধনের জন্য শরিয়ত নির্ধারিত বিশেষ দুটি সিজদাকে ‘সাহু সিজদা’ বলা হয়।
সিজদা আদায়ের নিয়ম
শেষ বৈঠকে আত-তাহিয়্যাতু পড়ার পর কেবল ডান পাশে সালাম ফেরাতে হয়। এরপর অতিরিক্ত দুটি সিজদা আদায় করে পুনরায় শেষ বৈঠকে বসতে হয়। তারপর আত-তাহিয়্যাতু, দরুদ শরিফ ও দোয়ায়ে মাসুরা পড়ে ডান ও বাম উভয় পাশে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করতে হয়।
সাহু সিজদা কখন ওয়াজিব হয়?
- নামাজের কোনো ওয়াজিব ভুলবশত ছুটে গেলে।
- কোনো ফরজ পরপর দুবার আদায় করে ফেললে।
- কোনো ওয়াজিবের স্থান বা ক্রম পরিবর্তন করলে।
- কোনো ফরজ বা ওয়াজিব আদায়ে বিলম্ব করলে।
সাহু সিজদার মাধ্যমে এই ভুলগুলোর ক্ষতিপূরণ হয় এবং নামাজ পরিপূর্ণতা পায়। তবে এসব ভুল হওয়া সত্ত্বেও সাহু সিজদা না দিলে সেই নামাজ পুনরায় পড়া বাধ্যতামূলক।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে সাহু সিজদা
নামাজে ভুল হলে তা সংশোধনের জন্য সাহু সিজদার বিধান শরিয়ত আমাদের শিক্ষা দিয়েছে। নিচে এ সম্পর্কিত কুরআন ও হাদিসের প্রামাণ্য উদ্ধৃতি দেওয়া হলো—
১. আল-কুরআনের নির্দেশনা
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা আল্লাহর জিকির বা নামাজে ভুল থেকে বেঁচে থাকার এবং তা সঠিকভাবে আদায়ের তাগিদ দিয়েছেন:
وَاذْكُر رَّبَّكَ إِذَا نَسِيتَ
‘আর যখন তুমি ভুলে যাও, তখন তোমার রবকে স্মরণ করো।’ (সুরা আল-কাহফ, আয়াত: ২৪)
২. হাদিসের স্পষ্ট নির্দেশনা
সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
إِذَا زَادَ الرَّجُلُ أَوْ نَقَصَ فِي صَلاَتِهِ، فَلْيَسْجُدْ سَجْدَتَيْنِ
‘যদি কোনো ব্যক্তি তার নামাজে কোনো কিছু বাড়িয়ে ফেলে বা কমিয়ে ফেলে, তবে সে যেন দুটি সিজদা (সাহু সিজদা) আদায় করে।’ (মুসলিম ১২৮৩)
নামাজ হলো মুমিনের জন্য শ্রেষ্ঠ ইবাদত। ভুল মানুষের সহজাত বিষয়, তাই নামাজে ভুল হলে কীভাবে তা সংশোধন করতে হয়— তা শরিয়ত অত্যন্ত সহজ ও সুন্দরভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে। বিশেষ করে মাসবুক ব্যক্তি যেন তাড়াহুড়ো না করে ইমামের অনুসরণ বজায় রাখেন এবং পরবর্তীতে একা পড়ার সময় সচেতন থাকেন, সেটাই কাম্য। সঠিক নিয়মে সাহু সিজদা আদায়ের মাধ্যমে আমাদের নামাজকে নিখুঁত ও আল্লাহর দরবারে কবুলযোগ্য করে তোলার তৌফিক আল্লাহ তাআলা আমাদের দান করুন। আমিন।

