হেবা ও ওয়ারিশি সম্পদের মধ্যে পার্থক্য কী?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সম্পত্তির মালিকানা তৈরি ও তা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়তে নান্দনিক ও ভারসাম্যপূর্ণ বিধান রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত ও গুরুত্বপূর্ণ দুটি মাধ্যম হলো—হেবা (জীবদ্দশায় দান) এবং মিরাস (উত্তরাধিকার সম্পত্তি)। যদিও দুটির শেষ ফল সম্পত্তি লাভ করা, তবুও অধিকার পাওয়ার সময়, মালিকের ইচ্ছার স্বাধীনতা এবং বণ্টনের নিয়মে এদের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে।
সহজ কথায়, একজন মানুষ বেঁচে থাকতে স্বানন্দে যাকে খুশি নিজের সম্পত্তি দিয়ে দেওয়া হলো ‘হেবা’, আর মৃত্যুর পর শরিয়ত অনুযায়ী স্বজনদের মাঝে সম্পদ ভাগ হয়ে যাওয়া হলো ‘মিরাস’। আসুন, গল্প আর ছন্দের মতো সহজ ভাষায় বিষয় দুটি বুঝে নেওয়া যাক।
১. অধিকার শুরুর সময়কাল
হেবা এবং মিরাসের প্রথম বড় পার্থক্য হলো—সম্পত্তি কখন হস্তান্তর হচ্ছে?
হেবা (জীবদ্দশায় দান): এটি জীবিত মানুষের বিষয়। একজন জীবিত ব্যক্তি সুস্থ মস্তিষ্কে তার নিজের স্থাবর বা অস্থাবর যেকোনো সম্পত্তি বিনিময় ছাড়াই অন্যকে উপহার দিতে পারেন।
মিরাস (উত্তরাধিকার সম্পত্তি): জীবিত অবস্থায় কারও সম্পত্তিকে মিরাস বা উত্তরাধিকার বলা যায় না। মালিকের মৃত্যুর পরই কেবল মিরাসের আলোচনা আসে।
২. ইচ্ছার স্বাধীনতা ও প্রয়োগ
কার ইচ্ছায় সম্পত্তি কাকে দেওয়া হবে, এখানেও রয়েছে বিস্তর তফাত।
হেবা (জীবদ্দশায় দান): হেবা পুরোটাই দাতার ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তিনি বেঁচে থাকতে কাকে কতটুকু দেবেন, তা পুরোপুরি তার নিজের সিদ্ধান্ত।
মিরাস (উত্তরাধিকার সম্পত্তি): উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে মরহুমের নিজস্ব ইচ্ছার কোনো দাম নেই। জীবিত থাকতে কেউ যদি তার কোনো সন্তানকে ত্যাজ্যও করতে চান, মৃত্যুর পর শরিয়তের নির্ধারিত অংশ থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না। কারণ মিরাস কোনো মানুষের বানানো নিয়ম নয়, এটি সরাসরি মহান আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
یُوۡصِیۡكُمُ اللّٰهُ فِیۡۤ اَوۡلَادِكُمۡ ٭ لِلذَّكَرِ مِثۡلُ حَظِّ الۡاُنۡثَیَیۡنِ
‘আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন— এক ছেলের অংশ দুই মেয়ের অংশের সমান।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১১)
৩. সম্পত্তি কে বা কারা পাবেন?
সম্পত্তি কার হাতে যাচ্ছে, সেই গ্রহীতার পরিচয়েও রয়েছে স্পষ্ট ভিন্নতা।
হেবা (জীবদ্দশায় দান): হেবা করার জন্য গ্রহীতাকে নিজের ওয়ারিশ বা নিকটাত্মীয় হতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। স্ত্রী, বন্ধু, যেকোনো বাইরের মানুষ কিংবা কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠানকেও পুরো সম্পত্তি হেবা করে দেওয়া যায়।
মিরাস (উত্তরাধিকার সম্পত্তি): মরহুমের ছেড়ে যাওয়া সম্পত্তি কেবল শরিয়তসম্মত নির্দিষ্ট ওয়ারিশদের মধ্যেই বণ্টিত হবে। কে কতটুকু পাবেন, তা ইসলামি ফারায়েজের নিয়মেই ঠিক হয়। হাদিসে পাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
أَلْحِقُوا الْفَرَائِضَ بِأَهْلِهَا، فَمَا بَقِيَ فَهُوَ لِأَوْلَى رَجُلٍ ذَكَرٍ
‘ফারায়েজ (নির্ধারিত অংশ) তার হাকদারদের কাছে পৌঁছে দাও। এরপর যা অবশিষ্ট থাকবে, তা সবচেয়ে নিকটবর্তী পুরুষ আত্মীয়ের।’ (বুখারি ৬৭৩৭, মুসলিম ১৬১৫)
৪. সম্পত্তির পরিমাণ ও বণ্টন ব্যবস্থা
কতটুকু সম্পত্তি কীভাবে দেওয়া যাবে, তার নিয়মও আলাদা।
হেবা (জীবদ্দশায় দান): হেবা করার সময় ওয়ারিশদের নির্দিষ্ট হারের অনুপাত মানার কোনো প্রয়োজন নেই। মালিক চাইলে তার সম্পত্তির পুরোটা বা কিছু অংশ হেবা করতে পারেন। (তবে সব সন্তানকে সমান নজরে দেখা সুন্নাত)।
মিরাস (উত্তরাধিকার সম্পত্তি): মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে প্রথমে দাফন-কাফনের খরচ এবং ঋণ পরিশোধ করতে হয়। অসিয়ত থাকলে তা পূরণ করার পর বাকি যা থাকে, তা ফারায়েজ অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
৫. মালিকানার নতুন অধ্যায়
আইনি ও শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পত্তি হস্তান্তরের মুহূর্তটি আলাদা।
হেবা (জীবদ্দশায় দান): দাতা হস্তান্তর করলেন আর গ্রহীতা তা গ্রহণ করলেন—ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গেই গ্রহীতার নামে নতুন মালিকানা তৈরি হয়ে গেল।
মিরাস (উত্তরাধিকার সম্পত্তি): মূল মালিকের জীবনের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই শরিয়তের স্বয়ংক্রিয় নিয়মে ওয়ারিশদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরিশেষে বলা যায়, হেবা হলো পরম মায়ায় বেঁচে থাকা অবস্থায় নিজের ইচ্ছায় সম্পত্তি উপহার দেওয়া। আর মিরাস হলো মানুষের মৃত্যুর পর সৃষ্টিকর্তার নিজের হাতে তৈরি এক সুষম বণ্টনব্যবস্থা। জীবদ্দশায় দান ও হস্তান্তর হেবার প্রাণ, আর মৃত্যুর পর ফারায়েজের বিধান কার্যকর হওয়া মিরাসের মূল ভিত্তি। ইসলামি আইনের এই চমৎকার ভারসাম্য রক্ষা করে চললে পরিবারে শান্তি ও সম্প্রীতি চিরকাল বজায় থাকে।
