জুমার দিনের হারিয়ে যাওয়া ৮ সুন্নত ও আমল
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৯ এএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন জুমাবার হলো উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য সাপ্তাহিক ঈদ ও অফুরন্ত বরকতের দিন। কুরআন ও হাদিসে এ দিনের অপরিসীম ফজিলত ও মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে। তবে সময়ের বিবর্তনে এবং যান্ত্রিক ব্যস্ততার কারণে আজ জুমার দিনটি অনেকের কাছে কেবল দু’রাকাত ফরজ নামাজ আদায় ও গোসলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দিনটিকে ঘিরে কিছু বিশেষ আমল ও সুন্নতের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন, যা আজ প্রায় বিস্মৃত। নিচে দলিলের আলোকে জুমার সেই উপেক্ষিত ও গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতগুলো তুলে ধরা হলো—
১. ফজরের নামাজে বিশেষ দুটি সুরা তেলাওয়াত
জুমার দিনের সূচনা হয় ফজরের নামাজ দিয়ে। এ দিনের ফজরের জামাতে দুটি বিশেষ সুরা তেলাওয়াত করা সুন্নত, যা বর্তমানে অনেক স্থানেই অনুপস্থিত। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত—
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقْرَأُ فِي فَجْرِ يَوْمِ الْجُمُعَةِ الم تَنْزِيلُ (السَّجْدَةَ) وَهَلْ أَتَى عَلَى الإِنْسَانِ
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনে ফজরের নামাজে ‘সুরা আস-সাজদা’ এবং ‘সুরা আল-ইনসান’ তেলাওয়াত করতেন। (আবু দাউদ ১০৭৪)
২. আগেভাগে মসজিদে যাওয়া
খুতবা শুরু হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে মসজিদে পৌঁছানো বর্তমান সময়ের একটি সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ জুমার দিন যত আগে মসজিদে যাওয়া যায়, এর সওয়াব তত বেশি। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَن اغْتَسَلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ غُسْلَ الْجَنَابَةِ ثُمَّ رَاحَ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَدَنَةً...
‘জুমার দিন মসজিদের দরজায় ফেরেশতারা অবস্থান করেন এবং ক্রমানুসারে আগে আগমনকারীদের নাম লিখতে থাকেন। যে সবার আগে আসে সে ওই ব্যক্তির মতো, যে একটি মোটাতাজা উট কুরবানি করে। এরপর যে আসে সে ওই ব্যক্তি, যে একটি গাভী কুরবানি করে। অতঃপর মেষ কুরবানি করার ন্যায়। এরপর আগমনকারী ব্যক্তি মুরগি দানকারীর ন্যায়। তারপর আগমনকারী ব্যক্তি একটি ডিম দানকারীর ন্যায়। এরপর ইমাম যখন বের হন, তখন ফেরেশতাগণ তাদের লেখা বন্ধ করে দেন এবং মনোযোগ সহকারে খুতবা শুনতে থাকেন।’ (বুখারি ৯২৯)
৩. পায়ে হেঁটে মসজিদে যাওয়া
যানবাহনের সহজলভ্যতার যুগে পায়ে হেঁটে মসজিদে যাওয়ার অভ্যাস প্রায় উঠেই গেছে। অথচ সুযোগ থাকলে পায়ে হেঁটে জুমার নামাজে যাওয়ার রয়েছে বিশেষ পুরস্কার। হজরত আউস ইবনে আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি—
مَنْ غَسَّلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَاغْتَسَلَ ثُمَّ بَكَّرَ وَابْتَكَرَ وَمَشَى وَلَمْ يَرْكَبْ...
‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে পায়ে হেঁটে মসজিদে আসবে, ইমামের কাছাকাছি বসবে, এরপর মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনবে এবং খুতবার সময় কোনো অনর্থক কথা বলবে না, সে মসজিদে আসার প্রতি কদমে এক বছর রোজা ও এক বছর রাতের ইবাদতের সওয়াব পাবে।’ (আবু দাউদ ৩৪৫)
৪. মিসওয়াক ও সুগন্ধি ব্যবহার
আজকাল সাবান বা টুথপেস্ট ব্যবহার করা হলেও ‘মিসওয়াক’ একটি স্বতন্ত্র ও অত্যন্ত গুরুত্ববহ সুন্নত, যা অনেকে অবহেলা করেন। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
غُسْلُ يَوْمِ الْجُمُعَةِ عَلَى كُلِّ مُحْتَلِمٍ وَسِسَاكٌ وَيَمَسُّ مِنْ الطِّيبِ مَا قَدَرَ عَلَيْهِ
‘জুমার দিন প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির গোসল ও মিসওয়াক করা কর্তব্য এবং সামর্থ্য থাকলে সে যেন সুগন্ধি ব্যবহার করে।’ (মুসলিম ৮৪৬)
৫. বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা
জুমার দিনে প্রিয়নবি (সা.)-এর ওপর অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করা একটি বিশেষ সুন্নত আমল, যা ব্যস্ততার কারণে অনেকে ভুলে যান। হজরত আউস ইবনে আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ مِنْ أَفْضَلِ أَيَّامِكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ... فَأَكْثِرُوا عَلَيَّ مِنَ الصَّلَاةِ فِيهِ
‘জুমার দিন তোমরা আমার ওপর বেশি করে দরুদ পড়ো। কারণ, তোমাদের দরুদগুলো আমার কাছে পেশ করা হয়।’ সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের দরুদ কীভাবে আপনার কাছে উপস্থাপন করা হবে, অথচ আপনার দেহ তো মাটির সাথে মিশে যাবে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা নবীদের দেহ ভক্ষণ করা মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন।’ (আবু দাউদ ১০৪৭)
৬. সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করা
জুমার দিনের অন্যতম বরকতময় আমল হলো সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করা। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْكَهْفِ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَضَاءَ لَهُ مِنَ النَّوْرِ مَا بَيْنَ الْجُمُعَتَيْنِ
‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পাঠ করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় নূরে আলোকিত হয়ে থাকবে।’ (বাইহাকি ৫৭৯৩)
৭. খুতবার সময় সম্পূর্ণ নীরব থাকা
খুতবার সময় সম্পূর্ণ চুপ থাকা ওয়াজিব। কেবল নিজে চুপ থাকাই যথেষ্ট নয়, পাশের কাউকে চুপ করতে বলাও এই আদবের পরিপন্থি। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا قُلْتَ لِصَاحِبِكَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَنْصِتْ وَالْامامُ يَخْطُبُ فَقَدْ لَغَوْتَ
‘জুমার দিন ইমাম যখন খুতবা দেবেন, তখন তুমি যদি তোমার পাশের সঙ্গীকে বলো 'চুপ করো', তবে তুমি একটি অনর্থক বা লঘু কাজ করলে।’ (বুখারি ৯৩৪)
এমনকি খুতবার সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, ফিসফিস করে কথা বলা ও অমনোযোগী থাকাও এই সুন্নতের সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
৮. দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত অনুসন্ধান করা
জুমার দিনে এমন একটি অমূল্য মুহূর্ত রয়েছে, যে সময়ে বান্দা আল্লাহর কাছে যা চায়, তা-ই কবুল করা হয়। এ মহামূল্যবান সময়ের বিষয়ে অধিকাংশ মানুষ উদাসীন থাকে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
ذَكَرَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَقَالَ فِيهِ سَاعَةٌ لَا يُوَافِقُهَا عَبْدٌ مُسْلِمٌ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّي يَسْأَلُ اللَّهَ شَيْئًا إِلَّا أَعْطَاهُ إِيَّاهُ
‘জুমার দিনে এমন একটি মুহূর্ত আছে, কোনো মুসলিম বান্দা যদি সেই সময়ে নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কিছু চায়, তবে তিনি তাকে অবশ্যই তা দান করেন।’ (বুখারি ৯৩৫)
ইসলামিক স্কলারদের মতে, এ মুহূর্তটি প্রধানত আসরের নামাজের পর থেকে সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নিহিত থাকে।
জুমার দিনটি কেবল একটি সাপ্তাহিক ছুটির দিন বা গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়; এটি ইবাদত, তাওবা, জিকির ও আত্মশুদ্ধির এক সুবর্ণ সুযোগ। আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া এই বরকতময় সুন্নতগুলো পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে আমরা যেমন প্রচুর সওয়াব অর্জন করতে পারি, তেমনি প্রিয় নবীজি (সা.)-এর পবিত্র আদর্শকে জীবন্ত রাখতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জুমার দিনের প্রতিটি সুন্নতের ওপর আমল করার এবং এর পূর্ণ বরকত লাভ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

