Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

জুমার দিনে ‘আত্মপর্যালোচনা ও আত্মশুদ্ধি’র সুযোগ তৈরি হয় যেভাবে

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৭ পিএম

জুমার দিনে ‘আত্মপর্যালোচনা ও আত্মশুদ্ধি’র সুযোগ তৈরি হয় যেভাবে

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

ব্যবসায়িক জীবনে একজন বিচক্ষণ ও সফল ব্যবসায়ী প্রতি সপ্তাহে তার লাভ-ক্ষতির খাতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেলান। কিন্তু একজন মুমিনের জন্য নিজের আমলনামার হিসাব তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি জরুরি; কারণ পার্থিব ক্ষতি যেকোনো সময় পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও আখেরাতের চিরস্থায়ী ক্ষতি পোষানোর কোনো সুযোগ থাকে না। ইসলামি পরিভাষায় এই আত্মিক হিসাব-নিকাশ ও আত্মপর্যালোচনাকে ‘মুহাসাবাতুন নাফস’ বা নিজের নফসের বিচার নিজে করা বলা হয়। সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ ও বরকতময় দিন জুমায় এই মহৎ অনুশীলনটি করা ধর্মীয়, মানসিক ও নৈতিক বিকাশের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও অপরিহার্য।

১. মুহাসাবাহ: ধারণা, গুরুত্ব ও কুরআন-হাদিসের দলিল

‘মুহাসাবাহ’ শব্দটি আরবি ‘হিসাব’ মূল ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ নিজের কাজ, নিয়ত, ইবাদত ও আচরণকে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সরাসরি এই আত্মপর্যালোচনার নির্দেশ দিয়ে ঘোষণা করেছেন—

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ وَ لۡتَنۡظُرۡ نَفۡسٌ مَّا قَدَّمَتۡ لِغَدٍ ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ

‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; আর প্রত্যেকের উচিত চিন্তা করে দেখা সে আগামীকালের জন্য কি প্রেরণ করেছে; তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত।’ (সুরা আল-হাশর: আয়াত ১৮)

বিশিষ্ট তাফসিরবিদগণ উল্লেখ করেছেন যে, এই আয়াতে ‘চিন্তা করে দেখা’ বলতে মূলত নিজের আমলের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ এবং সুক্ষ্ম হিসাব নিকাশ বোঝানো হয়েছে, যা মুহাসাবাহ বা আত্মশুদ্ধির মূল ভিত্তি।

মুমিনদের এই সফলতার পথ বাতলে দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—

الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ، وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ الْأَمَانِيَّ

‘বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে। আর দুর্বল সেই ব্যক্তি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর কাছে বড় বড় প্রত্যাশা রাখে।’ (তিরমিজি ২৪৫৯; হাদিসটি হাসান)

ইসলামের সোনালী যুগের মনীষী ও খলিফা হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব বোঝাতে বলতেন— ‘তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগেই তোমরা নিজেরাই নিজেদের হিসাব নাও এবং আমল ওজন করার আগেই তোমরা তা ওজন কর। কারণ আজ হিসাব নেওয়া আগামীকালের (কেয়ামতের) হিসাবকে হালকা করবে।’ (ইবনুল কাইয়িম, ‘ইগাসাতুল লাহফান’)

এছাড়া প্রখ্যাত ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তার কালজয়ী ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন’ গ্রন্থে মুহাসাবাহকে আত্মশুদ্ধির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বর্ণনা করে প্রতিদিন বা অন্তত প্রতি সপ্তাহে এই হিসাব নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।

২. জুমার দিন কেন মুহাসাবাহর জন্য সর্বোত্তম সময়?

সপ্তাহের চক্রে জুমার দিনটি হলো একটি প্রাকৃতিক ছেদবিন্দু (Natural Cut-off Point)। বিগত সাত দিনের আমল, সফলতা ও ত্রুটিগুলোকে একটি একক প্যাকেজ হিসেবে মূল্যায়ন করার জন্য এর চেয়ে উপযোগী সময় আর হতে পারে না। জুমার খুতবা ও পবিত্র নামাজের পর মানুষের অন্তর সাধারণত কোমল ও প্রশান্ত থাকে, ফলে নিজের দোষ ও ভুলগুলো স্বীকার করার সঠিক মানসিক প্রস্তুতি তৈরি হয়।

এছাড়া জুমার দিন আসর থেকে মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়টি দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত হওয়ায়, এই সময়ে তওবা ও আগামী দিনের সুদৃঢ় সংকল্প গ্রহণের জন্য এটি শ্রেষ্ঠ সুযোগ।

৩. মুহাসাবাহর ব্যবহারিক পদ্ধতি ও কর্মপরিকল্পনা

জুমার নামাজের পর অন্তত ১৫ মিনিট নির্জনে বসে, মোবাইল ও অন্যান্য ডিজিটাল বিভ্রান্তি থেকে দূরে সরে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে আপনি সহজেই এই আত্মিক হিসাবটি সম্পন্ন করতে পারেন—

> ৫ মিনিট: বিগত সপ্তাহের আমল, নেক কাজ ও আল্লাহর নিয়ামত স্মরণ করা

> ৫ মিনিট: সপ্তাহজুড়ে হওয়া ভুলত্রুটি ও গুনাহ চিহ্নিত করা এবং এর পেছনের কারণ ভাবা

> ৩ মিনিট: আন্তরিক তওবা করা এবং আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করা

> ২ মিনিট: আগামী সপ্তাহের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ভালো কাজের সংকল্প নেওয়া

  • প্রথম ধাপ— নিয়ামতের স্বীকৃতি: গত সপ্তাহে আল্লাহ তাআলা আপনাকে জীবন, স্বাস্থ্য, রিজিক ও ইবাদতের কী কী সুযোগ দিয়েছেন তা ভেবে শুকরিয়া আদায় করুন।
  • দ্বিতীয় ধাপ— ত্রুটি চিহ্নিতকরণ: নিজেকে সততার সঙ্গে প্রশ্ন করুন— কারো মনে কষ্ট দিয়েছি কি? ফরজ নামাজে কোনো অবহেলা হয়েছে কি? মিথ্যা কথা বা চোগলখোরিতে জড়িয়েছি কি? গিবত, রাগ কিংবা অহংকার প্রকাশ পেয়েছে কি? পিতা-মাতা ও আত্মীয়দের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছি কি?
  • তৃতীয় ধাপ— একটি গুনাহ ত্যাগের সংকল্প: একসঙ্গে সব বদভ্যাস ছাড়ার চেষ্টা প্রায়ই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তাই এই অডিটের মাধ্যমে চিহ্নিত করুন— ‘আগামী সাত দিন আমি অন্তত এই একটি নির্দিষ্ট পাপ (যেমন— গিবত করা, মিথ্যা বলা কিংবা অনর্থক স্ক্রিন টাইম নষ্ট করা) কোনোভাবেই করব না।’

৪. আত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

  • আত্মিক দিক: নিয়মিত মুহাসাবাহ মানুষের ভেতর তাকওয়া ও আল্লাহভীতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মানুষ যখন জানে যে জুমার দিনে তাকে নিজের নফসের হিসাব মেলাতে হবে, তখন সারা সপ্তাহজুড়ে তার কথা ও কাজে বাড়তি সতর্কতা বজায় থাকে। ছোট ছোট তওবার মাধ্যমে গুনাহের কালিমা আত্মায় স্থায়ী দাগ ফেলতে পারে না।
  • মনস্তাত্ত্বিক দিক: আধুনিক মনোবিজ্ঞান (বিশেষ করে Cognitive Behavioral Therapy এবং Positive Psychology) নিয়মিত আত্মপর্যালোচনাকে মানসিক স্বাস্থ্য, মানসিক চাপ মুক্তি ও আচরণগত পরিবর্তনের অত্যন্ত কার্যকর উপায় বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইসলাম চৌদ্দশ’ বছর আগে আত্মশুদ্ধির যে অনন্য পদ্ধতির কথা শিখিয়েছে, আধুনিক বিজ্ঞান আজ তার কার্যকারিতাকে সানন্দে সমর্থন করছে।

অনেক মানুষই দুনিয়ার বুকে বাহ্যিক সফলতা অর্জন করলেও নিজের অন্তরাত্মার আদালতে চরমভাবে পরাজিত থাকে। ‘মুহাসাবাহ’ হলো সেই নিখুঁত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে অন্তরের এই গোপন পরাজয় ও দুর্বলতাগুলোকে চিনে নিয়ে সংশোধন করা যায়। প্রখ্যাত তাবেয়ি হাসান আল-বাসরি (রহ.) বলতেন— ‘যে ব্যক্তি নিজের হিসাব করে না, তার কোনো দ্বীন নেই।’ (ইমাম গাজ্জালি, ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন’)।

তাই সপ্তাহের নির্দিষ্ট একটি সময়ে নিজের আত্মার সামনে সম্পূর্ণ সৎভাবে দাঁড়ানোই হলো প্রকৃত সাহসিকতা এবং সফলতার মূল চাবিকাঠি। আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রত্যেককে নিয়মিত মুহাসাবাহ করার এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে তার সন্তুষ্টি অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম