চুপ থাকা কি সব সময় মহৎ গুণ, নাকি কথা বলাও জরুরি
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানুষের স্বভাব ও ব্যক্তিত্বে ভিন্নতা থাকা খুবই স্বাভাবিক। কেউ খুব বেশি কথা বলতে ভালোবাসেন, আবার কেউ প্রয়োজন ছাড়া একদমই মুখ খুলতে চান না। এই কম কথা বলা মানুষটিকে সমাজে অনেক সময় ভুল বুঝে রহস্যময় বা অহংকারী বলে মনে করা হয়। তবে জবান ও কথার পরিমাণের এই বিষয়টি ইসলাম অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে মূল্যায়ন করেছে। চুপ থাকা কি সবসময়ই মহৎ গুণ, নাকি কথা বলা জরুরি—ইসলামের সুমহান শিক্ষা ও হাদিসের আলোকে বিষয়টি আজ আমরা জেনে নেব।
বেশি কথা নয়, কল্যাণকর কথা বলা
ইসলাম অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক কথা থেকে বিরত থাকতে জোরালোভাবে উৎসাহিত করেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সারাক্ষণ মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকতে হবে। কথার পরিমাণের চেয়ে কথার ধরন ও মানটাই ইসলামের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে প্রিয়নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন—
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’ (বুখারি ৬০১৮, মুসলিম ৪৭)
অর্থাৎ, কথা যদি উপকারী, সুন্দর ও সৎ উদ্দেশ্যে হয় তবে তা বলা উচিত। আর কথা যদি গুনাহ, ঝগড়া বা অনর্থক বিষয়ের কারণ হয়, তবে তখন চুপ থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
নীরবতা মানুষকে অনেক গুনাহ থেকে বাঁচায়
মানুষের জীবনের বেশিরভাগ ভুল ও অপরাধ সংঘটিত হয় এই নিয়ন্ত্রণহীন জবান বা কথার মাধ্যমেই। গিবত, মিথ্যা, অপবাদ, কটু কথা কিংবা অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক থেকে নিজেকে রক্ষা করার মোক্ষম উপায় হলো জবানকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। এই প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন—
مَنْ صَمَتَ نَجَا
‘যে নীরব থাকলো, সে নাজাত (মুক্তি) পেলো।’ (তিরমিজি ২৫০১)
মানুষ প্রতিটি মুহূর্তে যা উচ্চারণ করে, তার প্রতিটি শব্দের হিসাব নেওয়ার জন্য মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে সতর্কবাণী রয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—
مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছেই একজন প্রস্তুত পর্যবেক্ষক (ফেরেশতা) থাকে।’ (সুরা কাফ: আয়াত ১৮)
তাই কম কথা বলা বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা না বলা যদি কাউকে জবান ও গুনাহর খপ্পর থেকে দূরে রাখে, তবে নিঃসন্দেহে সেটি একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় গুণ।
নবীজির (সা.) সংযত ও মিতবাক স্বভাব
আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ছিল কথার ও আচরণের এক অপূর্ব ভারসাম্য। তিনি যেমন অহেতুক কথা বলতেন না, তেমনি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বা প্রয়োজনীয় কথা থেকেও দূরে থাকতেন না। হাদিসে হজরত জাবির ইবনে সামুরা (রা.) বর্ণনা করেন—
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ طَوِيلَ الصَّمْتِ، قَلِيلَ الضَّحِكِ
‘রাসুলুল্লাহ (স.) অধিকাংশ সময় নীরব থাকতেন এবং খুব কম হাসতেন।’ (মুসনাদে আহমদ ৬৩০৮)
তিনি যখনই কথা বলতেন, অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, সত্য ও কল্যাণকর কথাই বলতেন। তাই ইসলামের মূল শিক্ষা হলো—অতিরিক্ত কথা বলাও নয়, আবার অকারণে চিরতরে নীরব থাকাও নয়।
অন্যায় দেখলে চুপ থাকার সুযোগ নেই
চুপ থাকা বা নীরবতা সব পরিস্থিতিতেই যে প্রশংসনীয়, বিষয়টি এমন নয়। সমাজের কোনো অন্যায়, জুলুম বা কারো অধিকার হীনভাবে নষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে সত্যের পক্ষে বা প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে কথা বলা প্রতিটি মুমিনের বড় একটি নৈতিক দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ
‘তোমরা হলে সর্বোত্তম উম্মত, যাদের মানুষের কল্যাণের জন্য আবির্ভূত করা হয়েছে; তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১১০)
তাই চোখের সামনে কোনো অন্যায় হতে দেখেও কেবল ‘আমি ঝামেলায় জড়াব না বা চুপ থাকব’—এমন সুবিধাবাদী নীতি ইসলাম কখনোই শিক্ষা দেয় না। পরিস্থিতি বুঝে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলা মুমিনের ইমানি দায়িত্ব।
কম কথা বলা মানুষকে কীভাবে মূল্যায়ন করব?
কেউ কম কথা বলেন বা বেশি সময় চুপ থাকেন— এ দেখেই তাকে অহংকারী, খিটখিটে বা অস্বাভাবিক মনে করার কোনো কারণ নেই। হয়তো তিনি নিজের জবানকে হেফাজত করার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। আবার বিপরীতভাবে, কেউ সারাক্ষণ চুপ থাকলেই তিনি খুব পরহেজগার বা ভালো মানুষ— এমন নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়াও ঠিক নয়।
সংক্ষেপে বলা যায়, ইসলামের দৃষ্টিতে মূল মাপকাঠি হলো সময়ের সঠিক মূল্যায়ন করা। কখন কথা বলতে হবে এবং কখন চুপ থাকতে হবে— এই বোধ যার মধ্যে আছে, তিনিই প্রকৃত জ্ঞানী। যেখানে সত্য ও ভালো কথা বলা দরকার, সেখানে সাহসিকতার সাথে কথা বলা এবং যেখানে অনর্থক কথা কিংবা ফেতনা থেকে বাঁচার জন্য নীরব থাকাই নিরাপদ, সেখানে চুপ থাকা— এটাই একজন মুমিনের জীবনে সবচেয়ে সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ গুণ।

