হজের সামর্থ্য হয়েছে আবার বিয়েও জরুরি— আগে কোনটি করবেন?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হজ ও বিয়ে—ইসলামের দৃষ্টিতে দুটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হজ সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর ফরজ ইবাদত। অন্যদিকে, বিয়ে মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণ, চরিত্র রক্ষা এবং পরিবার গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। তবে বিয়ে না করলে হারামে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল হলে ব্যক্তির পরিস্থিতি অনুযায়ী বিয়ে ওয়াজিব হতে পারে।
এ কারণে অনেক অবিবাহিত মানুষের মনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়—হজে যাওয়ার মতো টাকা জমেছে, কিন্তু বিয়েরও প্রয়োজন রয়েছে। এখন সেই টাকা দিয়ে আগে হজ করবেন, নাকি বিয়ে করবেন? বিয়ে করলে হয়তো হজের সামর্থ্য থাকবে না, আবার হজ করলে বিয়ের খরচ জোগাড় করা কঠিন হবে। এমন পরিস্থিতিতে ইসলামের বিধান কী?
ইসলামি ফিকহে এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্য, বিয়ের প্রয়োজনীয়তা, গুনাহে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং হজ ফরজ হওয়ার শর্ত পূরণ হয়েছে কি না—এসব বিষয়ের ওপর। কুরআন-হাদিসের নির্দেশনা ও ফিকহবিদদের মতামতের আলোকে বিষয়টি বোঝা যাক।
সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সামর্থ্যবান মানুষের ওপর হজ ফরজ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে—
وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا
‘মানুষের মধ্যে যারা সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে, তাদের ওপর আল্লাহর উদ্দেশ্যে এ ঘরের হজ করা অবশ্যকর্তব্য।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ৯৭)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, হজের সামর্থ্য অর্জন করলে তা আদায় করা মুসলিমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে সামর্থ্য বলতে শুধু হাতে টাকা থাকা বোঝায় না; হজে যাওয়ার ব্যয় নির্বাহের পাশাপাশি নিজের ও যাদের ভরণপোষণ তার ওপর আবশ্যক, তাদের প্রয়োজনীয় খরচের বিষয়টিও বিবেচ্য।
কোনো ব্যক্তির স্থাবর সম্পত্তির একটি অংশ বিক্রি করে হজে যাওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে এবং অবশিষ্ট সম্পত্তি বা আয়ের মাধ্যমে হজ থেকে ফিরে নিজের জীবিকা নির্বাহ ও নির্ভরশীলদের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হলে, অন্যান্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তার ওপর হজ ফরজ হতে পারে। তবে জীবিকার অপরিহার্য সম্পদ বিক্রি করা সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়; সম্পদের ধরন, প্রয়োজন ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে।
হজের মর্যাদা ও ফজিলত
হজ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, তওবা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمَ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করল এবং অশ্লীল কথা ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকল, সে এমন অবস্থায় ফিরে আসবে, যেমন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল।’ (বুখারি ১৫২১)
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
وَالْحَجُّ الْمَبْرُورُ لَيْسَ لَهُ جَزَاءٌ إِلَّا الْجَنَّةُ
‘মকবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (বুখারি ১৭৭৩, মুসলিম ১৩৪৯)
হজের এত বড় ফজিলত থাকার কারণে সামর্থ্য অর্জিত হলে তা অযথা বিলম্বিত করা উচিত নয়। তবে কারও বিয়ের প্রয়োজন যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে বিয়ে না করলে হারামে জড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে তার পরিস্থিতিও শরিয়তের বিধান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
বিয়ে কখন সুন্নত, আর কখন ওয়াজিব?
ইসলামে বিয়ে সাধারণভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ও নবীজির (সা.) আদর্শ। তবে ব্যক্তির অবস্থা অনুযায়ী এর বিধান পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো ব্যক্তি যদি বিয়ে করার সামর্থ্য রাখেন, স্বাভাবিকভাবে দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ করতে চান এবং বিয়ে না করলে হারামে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল না থাকে, তাহলে তার ক্ষেত্রে বিয়ে সাধারণত সুন্নত হিসেবে বিবেচিত হয়।
অন্যদিকে, কোনো ব্যক্তি যদি নিজের যৌন চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন এবং বিয়ে না করলে হারামে জড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে, অথচ তিনি বিয়ের দায়িত্ব পালনে সক্ষম হন, তাহলে তার ক্ষেত্রে বিয়ে ওয়াজিব হতে পারে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ، مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ
‘হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে। কেননা, তা দৃষ্টিকে অধিক সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে অধিক হেফাজত করে।’ (বুখারি ৫০৬৬, মুসলিম ১৪০০)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, বিয়ে চরিত্র রক্ষা ও পবিত্র জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই হজ ও বিয়ের মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হলে ব্যক্তির বাস্তব প্রয়োজনও বিবেচনা করতে হবে।
হজ ও বিয়ে— দুটিই ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ, তবে উভয়ের বিধান ব্যক্তির অবস্থা অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর হজ ফরজ হলে তা আদায়ের দায়িত্ব গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতে হবে। অন্যদিকে, বিয়ে না করলে হারামে জড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা থাকলে বিয়েও ওয়াজিব হতে পারে।
তাই হজের টাকা জমেছে বলেই সব পরিস্থিতিতে বিয়ের প্রয়োজন উপেক্ষা করতে হবে— এমন নয়। আবার বিয়ের ইচ্ছা থাকলেই ফরজ হজের দায় এড়িয়ে যাওয়া যাবে— এমন সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। হজ ফরজ হওয়ার সময়, আর্থিক সামর্থ্য, বিয়ের জরুরি প্রয়োজন এবং ব্যক্তির বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

