ইফতারের সময় কাবাঘর যেন জান্নাতের বাগান

  নাজমুল হুদা ১৭ মে ২০১৯, ১৭:০১ | অনলাইন সংস্করণ

ইফতারের সময় কাবাঘর যেন জান্নাতের বাগান
ছবি: সংগৃহীত

রমজান উপলক্ষে পবিত্র কাবা শরিফে অসংখ্য মুসল্লির ভিড় থাকে। কাবা ঘিরে ঈমানদার বান্দাদের এমন উপবেশন যেন ফুলের চারপাশে মৌমাছিদের ভিড়। তাবৎ জাগতিকতা ও পার্থিবতাকে তুচ্ছ করে অবস্থান করছেন সবাই, ধীর-স্থির শান্ত একটি সমাগম। বসে থাকা অনেকেই জড়োসড়ো ও সুবিনীত হয়ে আছেন। ঈমান-আমলের স্বর্ণালি ঐশ্বর্যে হৃদয়ের বদ্ধ দুয়ার ভরপুর করার গভীর আগ্রহ সবার মনে। বাইতুল্লাহর ঈমান স্নিগ্ধ পরিবেশে পবিত্রতার সতেজ পুলকে ভরে ওঠে সবার মন।

আকাশের বুকে বিচরণশীল গম্ভীর মেঘের মতো সবার মাঝে এক গাম্ভীর্যপূর্ণ ভাব। তাসবিহ, জিকির তিলাওয়াত ও কায়মনোবাক্যে দোয়ার মাধ্যমে সময়কে মুক্তাদানার মতো করে তুলছেন সবাই। একদিকে দোয়া ও আমল। আর অন্যদিকে ইফতার তৈরি ও বণ্টন। রমজানের প্রতিটি বিকালে এমন চিত্রই দেখা যায় বাইতুল্লাহ শরিফে।

ইফতারের আগে আমলে মশগুল মুসল্লিরা

অতিথি আপ্যায়ন বা আতিথেয়তা ছিল প্রাচীন আরবদের মৌলিক গুণাবলির একটি প্রধান দিক। এটি তাদের স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের অন্যতম একটি উপাদান ছিল। ব্যক্তি বিশেষ কিংবা সামষ্টিক। কালের ঘূর্ণনে ইসলাম-পরবর্তী সময়ে আজ এটি দ্বীনি চেতনা ও সাওয়াব অর্জনের একটি বিরাট অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আতিথেয়তার মাধ্যমে আরবরা তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে উঁচুতে ধারণ করে আছে। স্বভাব ও সমাজের স্বাভাবিক বোধ হতে আরবদের এ আপ্যায়ন।

আসরের খানিক পর হতেই ইফতার বিতরণের পূর্ব প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। মাগরিবের আজানের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই সবাই খাবারের জন্য বিছানো দস্তরখানে একত্রিত হন। মসজিদুল হারামের ভেতর ও আঙিনাজুড়ে তখন এক অন্যরকম পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

ভেতরের পরিবেশ সুন্দর রাখতে মূল মসজিদের ভেতর শুধু খেজুর, জমজম ও আরবি গাহওয়া পরিবেশন করা হয়।

তাছাড়া স্থানীয় ও আগত জিয়ারতকারীরা ব্যক্তিগতভাবে রুটি, মাঠা, দই, সমুচা ইত্যাদি বিতরণ করেন।

ইফতারের অপেক্ষায়

বাইতুল্লাহর বড়-ছোট প্রবেশ পথ কিংবা ভেতরে চলার পথে খেজুর বিতরণের দৃশ্যগুলো চোখ শীতল করার মতো। সেই সময় সবার মাঝে যেন আত্মত্যাগ ও বিসর্জনের এক অপূর্ব সম্মিলনের চিত্র ফুটে ওঠে। বিতরণ করতে পেরে সবার চোখেমুখে থাকে অপার্থিব খুশির ঝিলিক। সবাই যেন হৃদয়জাত ভালোবাসা বিতরণ করছে। বিলিয়ে দেয়ার মাঝেই যেন হৃদয়ে প্রশান্তির শুভ্রতা ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু মূল মসজিদের বাইরের আঙিনার দৃশ্য ইফতার ও এর পরবর্তী সমযে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। বাইরের পরিবেশিত ইফতারে খেজুর, জমজম, গাহওয়ার পাশাপাশি রুটি, কেক, বিস্কুট, মাঠা এবং এ জাতীয় জিনিস বিতরণ করা হয়।

উন্মুক্ত আয়োজন ও ব্যবস্থাপনাগুলো বিত্তবান সৌদি বিশেষ করে মক্কার অধিবাসীরা পুরো মাসজুড়ে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে আয়োজন করে থাকেন। কোন কোন স্থানে পুরো পরিবারের বড় ও ছোটরা মিলে এমন কার্যক্রমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে।

আবার অনেকে নিজেরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে না পারায় লোকবল নিয়োগ দিয়ে খাবার বিতরণ করেন।

প্রতিদিন হাজারো মানুষ ইফতার করেন কাবায়

একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় ও রাসুল (সা.)-এর দেয়া সুসংবাদের ভাগিদার হওয়ার জন্যই আরবরা এত আয়োজন করে থাকেন।

কারণ রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করালো, সে ওই রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পেল। তবে এ জন্য রোজাদারের সওয়াব হতে বিন্দু পরিমাণ কমানো হবে না।’ (তিরমিজি)

মক্কায় বিপুল-উৎসাহে এমন ইফতার আয়োজন কল্যাণ কাজ ও অপরের প্রতি প্রীতির প্রমাণ বহন করে। এর মাধ্যমে আগত তীর্থযাত্রীদের অন্তরে আরবদের প্রতি একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানও তৈরি হয়।

মক্কায় যুবকদের খেজুর ও জমজম-সংবলিত ইফতার বিতরণ ও আন্তরিকতাপূর্ণ সহযোগিতার মাধ্যমে পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের এক অনুপম দৃষ্টান্ত তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি ইফতারের আগ মুহূর্তে হাজারো মিটার দস্তরখানা বিছিয়ে সেটিকে আবার দ্রুততার সঙ্গে উঠিয়ে নামাজের জন্য প্রস্তুত করার গুরুত্ব চোখে পড়ার মতো।

মক্কার বিভিন্ন প্রবেশপথ ও মানুষ চলাচলের বিভিন্ন পয়েন্টে মক্কার স্থানীয় তরুণদের খেজুর ও জমজম বিতরণের দৃশ্যটি সবার নজর কাড়ে।

এমন কোনো সড়ক মহাসড়ক কিংবা ট্রাফিক সিগন্যাল নেই যেখানে তরুণ ও যুবকরা ইফতার ও ঠাণ্ডা পানির বোতল বিতরণ করে না। তা ছাড়া মক্কার প্রত্যেক এলাকার নাগরিকরা নানা ধরনের ইফতার তৈরি করে সেগুলো মসজিদে পাঠাতে কখনও কার্পণ্য করে না। বিভিন্ন প্রকারের পানীয়, দই, জুস, ফল ও খেজুর ইত্যাদি দিয়ে ইফতারের প্যাকেট তৈরি করে স্থানীয়রা পথেঘাটে ও মসজিদে বিতরণ করেন।

লেখক: শিক্ষার্থী, উম্মুল কোরা বিশ্ববিদ্যালয়, মক্কা মুকাররামা

ঘটনাপ্রবাহ : রমজান ২০১৯

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×