রমজানে কেন কোরআন নাজিল হয়েছে

  মনযূরুল হক ২১ মে ২০১৯, ১৫:১৩ | অনলাইন সংস্করণ

রমজানে কেন কোরআন নাজিল হয়েছে
ছবি: সংগৃহীত

আল্লাহ তায়ালা বলেন : রমজান মাস, এতে নাজিল হয়েছে কোরআন, যা মানুষের দিশারি এবং স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৪)

রমজান মাসে সপ্তম আকাশের লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশ বায়তুল ইজ্জতে পবিত্র কোরআন একবারে নাজিল হয়েছে। সেখান থেকে আবার মজান মাসে অল্প অল্প করে নবী করিম (সা.) এর প্রতি নাজিল হতে শুরু করে। কোরআন নাজিলের দুটি স্তরই রমজান মাসকে ধন্য করেছে।

রমজান মাসের সঙ্গে আসমানি গ্রন্থগুলো, বিশেষ করে কোরআনের এমন অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কারণে রমজান মহিমান্বিত হয়েছে—সন্দেহ নেই। এমনকি কোরআনের সঙ্গে এর সম্পর্ক এত গভীর যে, রমজানকে কোরআনের মাস বলেই অভিহিত করা হয়। ইমাম যুহরি রহ. বলেন : রমজান হচ্ছে কোরআন তেলাওয়াত ও আহার বিতরণের মাস। (ইবনে আব্দুল বার, আত তামহিদ, ৬/১১১)

রমজানে কেন কোরআন নাজিল হয়েছে—এর কারণ তো একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই জানেন। তবে কোরআনের বিভিন্ন আয়াত, হাদিসের ভাষ্য এবং সময়ের সাক্ষ্য থেকে বোঝা যায় বিশেষত তিনটি কারণে রমজানে কোরআন নাজিল করা হয়েছে।

এক. রমজান আসমানি গ্রন্থ নাজিলের মাস

আল্লাহ তায়ালার সাধারণ আদত অনুসারে রমজানেই তিনি আসমানি গ্রন্থ নাজিল করে থাকেন। তাই কোরআনসহ শ্রেষ্ঠ আসমানি গ্রন্থাবলি রমজানে অবতীর্ণ হয়েছে বলে বিশুদ্ধ হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেন : রমজান মাসের পহেলা ইবরাহিম (আ.) সহিফা লাভ করেন, ৬ তারিখে মুসা (আ.) এর কাছে ‘তাওরাত’ নাজিল হয়।

দাউদ (আ.) এর কাছে পবিত্র যবুর নাজিল হয় এ পবিত্র মাসের ১২ তারিখে, আর ঈসা (আ.) পবিত্র ‘ইঞ্জিল’লাভ করেন এবং কোরআন নাজিল হয় রমজানের ২৪ তারিখে। (তাবারানি, হাদিস ১৮৫; তাফসিরে তাবারি, ২৪/৩৭৭)

দুই. রমজান ও কোরআনের অভিন্ন উদ্দেশ্য

রমজান ও কোরআন উভয়ের উদ্দেশ্যও এক। আর তা হলো তাকওয়া অর্জন। দেখুন, কোরআনে এসেছে : তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হলো, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো। (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)

আবার কোরআন যদিও সমগ্র মানবজাতির জন্য অবতীর্ণ হয়েছে, কিন্তু এর দ্বারা শুধু মুত্তাকি ব্যক্তিরাই প্রকৃত উপকার লাভ করবেন—তা-ও উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন : এটি আল্লাহর কিতাব। এতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকিদের জন্য হিদায়াত। (সুরা বাকারা, আয়াত ২)

ইবনে হাজার রহ. বলেন : তেলাওয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য আত্মিক উপস্থিতি ও উপলব্ধি। (ফাতহুল বারি, ৯/৪৫)

ইবনে বাত্তাল রহ. বলেন : রাসূলের এ কোরআন শিক্ষা ও অনুশীলনের একমাত্র কারণ ছিলো পরকালের আকাঙ্ক্ষা ও ব্যাকুল ভাবনার জাগরণ এবং পার্থিব বিষয়ে অনীহার সৃষ্টি করা। (ইবনে বাত্তাল, শরহে বোখারি, ১/১৩)

আর তাকওয়া অর্জনের উদ্দেশ্য এসবই।

তিন. কোরআন সংরক্ষণ

রমজান মাস হল কোরআন সংরক্ষণের মাস। যদিও কোরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালারই হাতে। যেমন তিনি বলেছেন : আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক। (সূরা হিজর, আয়াত ৯)

কিন্তু মানুষই হলো আল্লাহ তায়ালার খলিফা বা পৃথিবীতে তার প্রতিনিধি। এবং মানুষের জন্য তিনি দিয়েছেন রমজান ও কোরআন। রাসূল (সা.)-এর জীবন থেকে দেখি রমজান মাসকেই তিনি কোরআন অনুশীলেন জন্য বিশেষভাবে বেছে নিয়েছেন, যেমনি তার সাহাবি ও পরবর্তী সালাফগণও করেছেন। কোরআনে সেই সকল মহান ব্যক্তিদের উল্লেখ করে এরশাদ করা হয়েছে—এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করার দায়িত্ব আমার। যখন আমি তা পাঠ করি, তখন তুমি সে পাঠের অনুসরণ কর। অত:পর তা ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব আমারই। (সূরা কিয়ামাহ, আয়াত ১৭, ১৮)

একই সঙ্গে তিনি রমজানে রোজা ফরজ করে দিয়ে তার সঙ্গে তারাবির মতো এমন একটি কোরআনি আমল জুড়ে দিয়েছেন যে, বর্তমান বাস্তবতায় তারাবি নামাজ হাফেজে কোরআনদের কোরআন চর্চার জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। এভাবে বিশ্বজুড়ে হাফেজদের ঐক্যবদ্ধ অনুশীলন প্রমাণ করে রমজান ছাড়া তাদের জন্য কোরআন হেফাজত করা যারপরনাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ত।

এমনকি এ-কারণে রমজানে নবীজি (সা.) অধিক পরিমাণে কোরআন অনুশীলনে ব্যস্ত থাকতেন। রমজানে কোরআন শিক্ষায় রাসূলের সহপাঠী হওয়ার জন্য জিবরাইল (আ.) আল্লাহ কর্তৃক নিয়োজিত ছিলেন। এ বিষয়ে হাদিসে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়— ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, জিবরাইল (আ.) রমজানের প্রতি রাতে রাসূলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং ফজর অবধি তার সাথে অবস্থান করতেন। (বুখারি, হাদিস ১৯০২)

রাসূল তাকে কোরআন শোনাতেন এবং তিনি রাতভর তারাবি ও কিয়ামুল লাইলে দীর্ঘক্ষণ কোরআন তেলাওয়াত করতেন। আরো এসেছে, রাসূল তার প্রিয়তমা কন্যা ফাতেমাকে (রা.) গোপনে জানালেন যে, জিবরাইল প্রতি বছর (রমজানে) আমাকে একবার কোরআন শোনাতেন এবং শুনতেন, এ বছর তিনি দু বার আমাকে শুনিয়েছেন-শুনেছেন। একে আমি আমার সময় সমাগত হওয়ার ইঙ্গিত বলে মনে করি। (বুখারি, হাদিস ৩৬২৪)

ইবনে হাজার বলেন : জিবরাইল প্রতি বছর রাসূলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এক রমজান হতে অন্য রমজান অবধি যা নাজিল হয়েছে, তা শোনাতেন এবং শুনতেন। যে বছর রাসূলের ওফাত হয়, সে বছর তিনি দুইবার শোনান ও শোনেন। (ফাতহুল বারি, ১/৪২)

লেখক : প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট, মুহম্মদ (স.) রিসার্চ সেন্টার (এমআরসি)

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : রমজান ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×