আধুনিক কওমি শিক্ষা: পদ্ধতি ও পর্যালোচনা

  মো. শরিফুল ইসলাম সোহেল ২৭ মে ২০১৯, ১২:১৩ | অনলাইন সংস্করণ

দারুল উলুম দেওবন্দ। ছবি: সংগৃহীত
দারুল উলুম দেওবন্দ। ছবি: সংগৃহীত

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড এবং উন্নত জীবন ধারনের সোপান। মূর্খতা এবং অন্ধকার থেকে আলোর পথের দিশারি। শিক্ষা মানুষকে সুন্দর, মার্জিত ও আদর্শ মানুষরূপে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

এবতেদায়ি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমাদের ভিন্নমত থাকতে পারে কিন্তু কোনো একটি শিক্ষা পদ্ধতিকে কোনো দেশ, জাতি, সমাজ আজ পর্যন্ত একক শিক্ষার মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করতে পারেনি। তাই সমাজের মানুষ শিক্ষাকে ভিন্ন ভিন্ন রূপে যথা- ধর্মগত, জাতিগতভাবে গ্রহণ করেছে।

শিক্ষাকে কোনো অবস্থাতেই বেধে রাখা সম্ভব নয়। শিক্ষা একটি চলমান প্রবাহ, চলতে চলতে সে নানারূপে নানা বর্ণে নানা ধর্মে রূপান্তরিত হয়ে চলেছে। এ রকম একটি শিক্ষা পদ্ধতির নাম হচ্ছে কওমি শিক্ষা।

দুই. ১২৭৮ খ্রি. বিশিষ্ট মুহাদ্দিস শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা (রহ.) বাংলার রাজধানী সোনারগাঁওয়ে মাদ্রাসা স্থাপন করেন। সুলতানি আমলে এসব মাদ্রাসা সরকারি খরচে পরিচালিত হতো। ব্রিটিশদের আগমনের পূর্বে প্রায় ৮০ হাজার মাদ্রাসা ছিল। দি ইন্ডিয়ান গ্রন্থে পাওয়া যায় যে, মুসলিম শাসনামলে প্রতি ৮০ জনের জন্য একটি করে মাদ্রাসা ছিল। ব্রিটিশ শাসনকালে এসব মাদ্রাসা বন্ধ করে দেয়া হয়। সেই সময় মুসলমানদের ভাগ্যাকাশে অন্ধকার নেমে আসে। কওমি শিক্ষা কেবল ধর্মীয় শিক্ষাই নয়, এই শিক্ষাব্যবস্থাতে রয়েছে শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সুস্থ চিন্তাধারার বিকাশ।

দীনের প্রচার-প্রসার, ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষায় প্রমাণ মেলে ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন এই কওমি শিক্ষক ছাত্ররা। যে শিক্ষা ১১০০ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত কারিকুলামের আলোকে ছিল না। ১১০৫ হিজরিতে ইসলামী শিক্ষাকে ঢেলে সাজানো হয়। এর পর হতে আজ অবধি কওমি মাদ্রাসা ছাত্রদের কোরআন-হাদিসের আলোকে সার্বিক জ্ঞান দান করা হয়। অধিক ভোগবিলাসে নিরুৎসাহী এবং স্বল্প উপার্জনে সন্তুষ্ট থেকে জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে গড়ে তোলো হয়।

এই শিক্ষাব্যবস্থায় দুনিয়ার কষ্ট, সবর, শোকর, আত্মীয়তার গঠন, ন্যায়পরায়ণতা, উম্মতবোধ, উত্তম চরিত্রের বিষয়গুলো শিক্ষা দেয়া হয়ে থাকে। আধুনিক মুসলমান হয়ে আমাদের সবার কওমি শিক্ষা সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান থাকা জরুরি। মুসলিম ভাইদের বলব ইসলামের সব শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে জানুন এটাও এক ধরনের জ্ঞানচর্চার অংশ, জানলে ক্ষতি নেই জানার কোনো শেষ নেই।

তিন. দারুল উলুম দেওবন্দ: ১৮৬৬ সালে বিশিষ্ট ইসলামী পণ্ডিতরা ভারতের উত্তরপ্রদেশের দেওবন্দ নামক স্থানে এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করেন। কওমি অর্থ জাতি, আর কওমি অর্থ জাতীয়। মাদ্রাসা আরবি শব্দের অর্থ বিদ্যালয়। তা হলে কওমি মাদ্রাসা অর্থ দাঁড়ায় জাতীয় বিদ্যালয়। আর ১০টা আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কওমি বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য একই রকমের ছিল। এ ছাড়া ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি নিত্যনতুন সৃষ্ট ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, ফিতনা ইত্যাদি থেকে জাতিকে সতর্ক করা এবং মুসলমান জাতিকে বিশ্বে মাথা উঁচু করে আধুনিক সভ্যতার নামে আগ্রাসনকে রুখে দিয়ে ইসলাম বা শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কওমি মাদ্রাসা বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য ছিল।

আসুন আমরা কওমি মাদ্রাসা বা দেওবন্দ অনুসারীদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলিত ধাপ সম্পর্কে জানি-

প্রথম ধাপ: মক্তব ২ বছর, নাজেরা ২ বছর, হেফজ ২-৩ বছর প্রত্যয়নের মাধ্যমে ইবতেদায়ি-১ বছর (৫ম শ্রেণি সমাপনী পরীক্ষার সমমান) সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়।

দ্বিতীয় ধাপ: মিজান ১ বছর, নাহবেমির ১ বছর, হেদায়াতুন্নাহু ১ বছর, কাফিয়া ১ বছর, শরহে বেকায়াহ ১ বছর, জালালাইন ১ বছর, মেশকাত ১ বছর, দাওরা হাদিস ১ বছর (মাস্টার্স পরীক্ষার সমমান) সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়।

উচ্চতর গবেষণা: দাওরা হাদিসের পর কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় কয়েকটি বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করার সুযোগ রয়েছে। ফিকহ/মুফতি (১-২ বছর), উলুমুল হাদিস (২-৩ বছর), তাফসির বিভাগ (১-২ বছর)। বর্তমানে আমাদের দেশে ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ/বেফাক বোর্ড নিয়ন্ত্রণ করছে।

চার. প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দাওরা হাদিসকে মাস্টার্স সমমান ডিগ্রি প্রদান করায় রাষ্ট্রীয়ভাবে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী সমাজে বিভিন্ন পেশায় চাকরি লাভের সুযোগ পাচ্ছেন। এ ছাড়া বর্তমান সময়ে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য পিছিয়ে পড়া সবাইকে সমান সুযোগ দিয়ে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে হলে সমাজের সব বুদ্ধিজীবীকে ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে এখনই গবেষণা শুরু করতে হবে।

বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের কার্যক্রম দৃশ্যমান থাকলেও ইবতেদায়ি শিক্ষা নিয়ে সবার মধ্যে এক ধরনের অনিহা বিরাজমান রয়েছে। যার মূল কারণ হলো ইবতেদায়ি শিক্ষা বা কওমি শিক্ষার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সঠিক তথ্য না জানা।

এ শিক্ষার উন্নতির লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণের এখনই সঠিক সময়। তা ছাড়া সংশ্লিষ্ট সব মহলের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং একটি সুবিবেচিত মতামতই ইসলামিক এ শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও ওপরে তুলে আনতে পারে এবং মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে গড়ে তুলতে পারে ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নত ভবিষ্যৎ।

লেখক: প্রোগ্রামার, মাদ্রাসা এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম সাপোর্ট।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×