করোনাভাইরাসের কারণ ও প্রতিরোধে কী ভাবছেন দেশের শীর্ষ আলেমরা

  মুহাম্মদ বিন ওয়াহিদ ১৯ মার্চ ২০২০, ২২:২৭:৪৫ | অনলাইন সংস্করণ

ছবি: যুগান্তর

গোটা পৃথিবীতে এখন করোনাভাইরাস আতঙ্ক। এক দেশ আরেক দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে । স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে।

এতটুকুই নয়, মুসলমানদের প্রাণের জায়গা মক্কা মোকাররমার মসজিদে হারাম ছাড়া সৌদি আরবসহ বিশ্বের অনেক মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও বন্ধ রাখা হয়েছে।

এ সঙ্কটময় মুহূর্তে মুসলমানদের করণীয় কী হবে, এ সম্পর্কে দেশের কয়েকজন শীর্ষ আলেম কথা বলেছেন যুগান্তর অনলাইনের সঙ্গে।

ভাইরাস বা মহামারী কেন দেখা দেয়? দেশের সর্ববৃহৎ ঈদগাহ কিশোরগঞ্জ শোলাকিয়া ঈদগাহ’র খতিব, শায়খুল হাদীস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ বলেন, ‘মহামারীর পেছনে বৈষয়িক কারণ যেমন থাকে, তেমনই অভ্যন্তরীণ কিছু কারণও থাকে।

আমরা কোরআন- হাদিসের আলোকে বুঝতে পারি, পৃথিবীতে ব্যাভিচার যখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ তায়ালা এমন এমন মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটান, যার নামও মানুষ ইতিপূর্বে কখনও শোনেনি।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন কোনো সম্প্রদায়ের মাঝে অশ্লীলতার প্রসার ঘটে তখন তাদের মাঝে মহামারী এবং এমন দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় যার নমুনা তারা পূর্বপুরুষদের মাঝে দেখেনি। (ইবনে মাজাহ: ৪০১৯)।

আল্লামা মাসউদ বলেন, বর্তমান যুগে হেন কোনো পাপ কাজ নেই, যা আমাদের সমাজে হচ্ছে না। মানুষ ব্যাভিচারে লিপ্ত হচ্ছে, সুদ খাচ্ছে, ঘুষ খাচ্ছে, মানুষ মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করছে। সবরকম গুনাহের কাজই এখন স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে। মানুষ এখন গুনাহকে গুনাহও মনে করছে না।

তিনি বলেন, মূলত মহামারী মুসলমানদের জন্য বড় একটি পরীক্ষা, আর অমুসলিমদের জন্য বড় এক আজাব হিসেবে আল্লাহ তায়ালা প্রেরণ করেছেন। যেন মুসলমানরা সতর্ক হয়ে যায় এবং গোনাহের কাজ ছেড়ে দিয়ে আল্লাহমুখি হয়। আর যারা অমুসলিম আছে, তারা যেন ঈমান আনায়ন করে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের ফলে স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে; যার ফলে তাদের কৃতকর্মের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি তাদের তিনি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে। (সূরা রূম : ৪১)।

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাসচিব ও ঢাকার ফরিদাবাদ মাদ্রাসার মুহতামিম আল্লামা আবদুল কুদ্দুস বলেন, জমিন,পানি, বাতাস ও আগুন- এগুলোর মোকাবেলা পৃথিবীর কেউ করতে পারবে না। কারও হাতে সেই ক্ষমতা দেয়া হয়নি।

তিনি বলেন, এই ভাইরাস বা মহামারীও আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত। তিনি এগুলো রোধ না করলে কেউ তা রোধ করতে পারবে না। কোনো সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানেরও সেই ক্ষমতা নেই। এই জন্য আমাদের প্রাণঘাতী এই করোনাভাইরাসের ব্যাপারে বেশি বেশি তওবা ইস্তেগফার করতে হবে এবং কেউ এতে আক্রান্ত হয়ে গেলে ধৈর্যধারণ করতে হবে।

জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররমের সিনিয়র পেশ ইমাম ও খতিব আল্লামা মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী বলেন, বিশ্বে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী এই করোনাভাইরাস থেকে আল্লাহ তায়ালার কাছে আমাদের পানাহ চাইতে হবে এবং যতটা সম্ভব নিজেদের সতর্ক থাকতে হবে। চিকিৎসক এবং সরকারের পক্ষ থেকে যে নির্দেশনা দেয়া হয়,তা যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে।

করোনাভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হয়ে গেলে তার করণীয় কী হবে? এ সম্পর্কে কথা বলেছেন চট্টগ্রাম ওমর গণি এমইএস ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. মাওলানা আ ফ ম খালিদ

তিনি বলেন, ‘নবী (সা.) বলেছেন, তোমরা যখন কোনো এলাকায় প্লেগ বা মহামারী বিস্তারের কথা শুন, তাহলে সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোনো এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব নেমে আসে, আর তোমরা সেখানে থেকে থাক, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেও না’।

প্রিয় নবী আরও ইরশাদ করেন, যদি তোমরা কোনো ফিতনা বা বিপর্যয় দেখ, তাহলে সেখানে যেও না। নিজের ঘরের মধ্যেই অবস্থান কর এবং জবানের হিফাজত কর ও কথা কম বল। সেই সঙ্গে বেশি বেশি ইস্তেগফার কর।

তিনি বলেন, আমি মনে করি, করোনাভাইরাসের জন্য এগুলো বিশ্বনবী হজরত মোহাম্মদের (সা.) বাতলে দেয়া পদ্ধতি। তাই এগুলোর ওপরে সবার আমল করা উচিত।

অনেকে ভাবছেন, আমার এত চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। করোনা আমাকে স্পর্শ করবে না। কারণ, আমি নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, যাকাত দিই। আমি বলি, আপনি নামাজ-রোজা করলেও আল্লাহ তায়ালা চাইলে করোনা আপনাকেও আক্রান্ত করতে পারে। কথাটা কাউকে ভয় দেখানোর জন্য বলছি না। বলছি, সতর্কতার জন্য। সবার হুশিয়ার থাকতে হবে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আল্লাহর রাসূলের সাহাবীরা যে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অথচ, কতিপয় সাহাবীও মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে শহিদ হয়েছেন।

হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর জামানায় সিরিয়ায় একবার প্লেগ রোগ দেখা দিয়েছিল। তখন সিরিয়ার সেনাপ্রধান ছিলেন হজরত আবু উবাইদা (রা.)। তিনি পত্র মারফত হজরত ওমরকে এ ব্যাপারে অবহিত করলেন।

ওমর (রা.) প্রবীণ সাহাবীদের পরামর্শের জন্য ডেকে এনে জানতে চাইলেন, এখন কী করব? সিরিয়ায় যাব নাকি যাব না? সাহাবীদের থেকে দু'ধরনের অভিমত এল। কেউ বললেন, আপনি যে উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন, সে উদ্দেশ্যে যান। কেউবা বললেন, আপনার না যাওয়াই উচিত।

তারপর আনসার এবং মুহাজিরদের ডাকলেন।তারাও মতপার্থক্য করলেন। সবশেষে বয়স্ক কুরাইশদের ডাকলেন। তারা বললেন, আপনার প্রত্যাবর্তন করা উচিত। দয়াকরে আপনার সঙ্গীদের প্লেগের দিকে ঠেলে দিবেন না।

ওমর (রা.) সিদ্ধান্ত নিলেন, মদীনায় ফিরে যাবেন। খলিফাকে মদীনায় ফিরে যেতে দেখে সেনাপতি আবু উবাইদাহ (রা.) বললেন, আপনি কী আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর থেকে পালানোর জন্য ফিরে যাচ্ছেন?

ওমর (রা.) বললেন, হে আবু উবাইদাহ, যদি তুমি ব্যতীত অন্য কেউ কথাটি বলত! (তাহলে আমার জন্য কথাটা মেনে নেয়া সহজ হতো।) আর হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর এক তাকদীর থেকে আরেক তাকদীরের দিকে ফিরে যাচ্ছি। পলায়ন করছি না।

এক তাকদীর থেকে আরেক তাকদীরের দিকে ফিরে যাওয়ার কী অর্থ, এটাও তিনি আবু উবাউদাহকে বুঝিয়ে দিয়েছেন।

হজরত ওমর বলেন, তুমি বল তো, তোমার কিছু উটকে তুমি এমন কোনো উপত্যকায় নিয়ে গেলে যেখানে দুটো মাঠ আছে। মাঠ দুটোর মধ্যে একটি সবুজ শ্যামল, আরেকটি শুষ্ক ও ধূসর।

এবার বল তো, ব্যাপারটি কী এমন নয়, যদি তুমি সবুজ মাঠে উট চরাও তাহলে তা আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ী চরিয়েছ। আর যদি শুষ্ক মাঠে চরাও, তা-ও আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ী চরিয়েছ?

আসবাব গ্রহণ বা বাহ্যত ভালোটা গ্রহণ করা, এটা আল্লাহর তাকদীর থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়! বরং ভালোটা গ্রহণ করাই ইসলামের দাবি।

অতএব, করোনার ব্যাপারে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। করোনা প্রতিরোধে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা আরও বাড়াতে হবে। শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, গুনাহের কাজ হয় এমন জায়গাগুলোও বন্ধ করতে হবে। গণজমায়েত করা যাবে না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে।

মনে রাখতে হবে, মহামারী মানেই আল্লাহ তায়ালার আজাব বা গজব নয়। তাই যদি হতো, তাহলে ১৮ হিজরিতে এতজন সাহাবী মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতেন না!

এই মহামারীতে মোমিন বা কাফের যে কেউ আক্রান্ত হতে পারে। এই জন্য বেশি বেশি ইস্তেগফার করতে হবে। আল্লাহ তায়ালার কাছে বিগত দিনের ভুল-ভ্রান্তির জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। ধৈর্যধারণ করতে হবে এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হবে।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত