আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ: চৈতন্যের দীপশিখা

  মাওলানা ওয়ালীউল্লাহ মাসুদ ১৫ মে ২০২০, ২২:৪২:০৯ | অনলাইন সংস্করণ

আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের ইতিহাসে যে কয়েকজন প্রথিতযশা মুহাদ্দিস ইলমে হাদিস অধ্যাপনার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় চৈতন্যবোধের অবক্ষয়কে রুখে দিয়ে ‘মা আনা আলাইহি ওয়া আসহাবিহী-যে পথে আছি আমি ও সাহাবায়ে কেরাম’ এর চৈতন্যবোধকে পূণর্জাগরন করেছেন, তাদের দিকপাল হলেন মুহাদ্দিসে আযীম মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.)।

ইলম অন্বেষণের সুতীব্র আকাংখা নিয়ে পাড়ি জমান বর্তমান বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম ইসলামী বিদ্যাপিঠ দারুল উলুম দেওবন্দে।
শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন সুন্নতে নববীর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, শায়খুল আরব ওয়াল আযম, কুতবে আলম শায়খুল ইসলাম সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানীর (রহ.)।

সাড়ে তিনবছর তার কাছে বোখারি শরিফ অধ্যয়ন করে এবং তাসাউফের বাইয়াত গ্রহণ করে নিজেকে ইলম-আমলের একজন মহীরূহ হিসেবে গড়ে তুলে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

প্রথমেই তিনি বেছে নেন মানবগড়ার হাতিয়ার শিক্ষাকতাকে। পাশাপাশি মনোনিবেশ করেন সমাজ সংস্কার ও রিজাল গড়ার কাজে। দেওবন্দ থাকাকালীনই তার মাঝে সমাজ সংস্কারের প্রতিভা প্রতিভাত হয়।

যার কারণে তার শায়খ ও মুরশিদ কুতুবে আলম শায়খুল ইসলাম সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) তাকে রসিকতা করে ‘চৌদা সদীকা মুজতাহিদ’- চতুর্দশ শতকের মুজতাহিদ বা সমাজ সংস্কারক বলে সম্বোধন করতেন।

আল্লাহতায়ালা তার মাঝে ইজতিহাদী বা নব উদ্বোধনী শক্তি দিয়েছিলেন।

দেওবন্দ থেকে ফিরে প্রথম কর্মস্থল যশোরের লাউড়ি মাদরাসায় ছাত্র-শিক্ষকদের প্রথম সমাবেশেই স্বরচিত আরবি প্রবন্ধ পাঠ করেন এবং তাতে সকল ওলামায়ে কেরামকে যুগ সচেতন হওয়ার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে প্রথম লাইন লেখেন

خلت الايام و مضت الدهور وانتم اليوم في القبور

‘দিনের পর দিন গড়িয়ে যাচ্ছে, সময় অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে অথচ তোমরা মরণ ঘুমেই পড়ে আছ?’

কওমি মাদরাসায় কাজী সাহেব হুজুর (রহ.) নবজাগরনের সূচনা করেন। তিনি কান্ডারীর ভূমিকায় থেকে মাতৃভাষায় ইসলামের চিরসবুজ সৌন্দর্য সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে দেয়া ও আকাবিরে দেওবন্দের বিশুদ্ধ চিন্তা-চেতনা ও শিক্ষা ছাত্রদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার ব্যতিক্রমধর্মী আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেছেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ করেছেন, ‘আমি প্রত্যেক নবি- রাসুলকে তাদের স্ব-জাতীর ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেছি। যেন তারা তাদের স্ব-জাতির কাছে ব্যাখ্যাদান করতে পারেন।’ (সুরা ইবরাহিম)

ওলামায়ে কেরাম নবি-রাসুলদের উত্তরাধিকারী। সুতরাং তাদের জন্য মাতৃভাষায় দক্ষতা ও পান্ডিত্য অর্জনের আবশ্যিকতা স্পষ্টতই প্রতীয়মান।

কিন্তু বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরামের কাছে বাংলাভাষা ছিল অচ্ছুৎ। তাই মাতৃভাষার গুরুত্ব অনুধাবনে তিনি কওমি মাদরাসায় বাংলায় পাঠদানের পদ্ধতি চালু করেন। তার আগে ব্যক্তিগতভাবে কোন আলেম বাংলাভাষা চর্চা করলেও এ দেশের কওমি মাদ্রাসায় বাংলায় পাঠদান পদ্ধতি তিনিই সর্বপ্রথম প্রবর্তন করেন।

মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ চেয়েছিলেন বাংলাভাষা থেকে পৌত্তলিকতার পোষাককে নামিয়ে তাওহিদ ও রিসালাতের পোষাক পরিয়ে তাকে ইসলামি ভাষায় রূপদান করতে। সে লক্ষ্যে মাদরাসা অঙ্গনে বাংলাভাষা ও সাহিত্য সভা চালু করেন তিনি।

চালু করেন বাংলা ভাষায় বক্তৃতা প্রশিক্ষণ মজলিস, দেওয়াল পত্রিকা ও বার্ষিক স্মরণিকা। এসকল কারণে তৎকালীন কিছু আলেমের ভর্ৎসনার শিকার হতে হয়েছিল তাকে।

অনেক আলেম তাকে বলতেন, ‘কাজী মুতাসিম বিল্লাহ বাংলা ভাষায় দরস দিয়ে ইলমের আযমত নষ্ট করে ফেলেছে।’ তার মাদরাসাকে বাংলা মাদরাসা বলে তিরষ্কার করতেন। তীর্যক বক্তব্যবাণে বিঁধতেন তাকে।

তখন সমালোচিত হলেও আলহামদুল্লিাহ এখন সব কওমি মাদ্রাসায় তার বাতলে দেয়া পদ্ধতিতে পা বাড়িয়ে হাজারো লেখক-সাহিত্যিক হয়েছেন এবং হচ্ছেন।

কওমি মাদ্রাসার সিলেবাসকে ঢেলে সাজানোর দুঃসাহসিকতা তিনিই প্রথম দেখিয়েছেন। প্রাথমিক পর্যায়ের গদ্য সাহিত্যের কিতাব ‘কালয়ুবি’ তিনি সিলেবাস থেকে বাদ দেন। কিছু বানোয়াট গল্পে সংকলিত বইটি।

কিশোর পাঠকরা এগুলোতে কোরআন-হাদিসের ঘটনা ভেবে ভুল করে ফেলতে পারে বিধায় তিনি কালয়ুবির পরিবর্তে কাসাসুন্নাবিয়্যীনকে সিলেবাসভুক্ত করেন।

আমাদের দেশের মাদ্রাসাগুলোয় সাধারণত ক্লাস শুরু হত সকাল সাড়ে ১০টায়। কাজী সাহেব হুজুর বলতেন, ‘পেয়ারে রাসুল (সা.) এর দোয়ার বরকতে প্রভাতে লেখাপড়ায় বরকত হয়।

কেননা পেয়ারে নবি এরশাদ করেছেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মতদেরকে সকাল বেলায় বরকত দিন।’ (সুনানে তিরমিযী, দারেমী, ইবনে মাজা)

হাদিসের ওপর আমল করার লক্ষ্যে গতানুগতিকধারার বিপরীতে তিনি ভোরবেলা ক্লাস চালু করেন।

কাজী সাহেব ছিলেন বাংলা সাহিত্য ও রচনার ক্ষেত্রে একজন সফল লেখক এবং অনুবাদক। তার প্রকাশিত স্বতন্ত্র গ্রন্থ সংখ্যা ৬টি। অপ্রকাশিত রয়েছে বাংলায় ১টি, উর্দুতে ১টি ও আরবিতে ১টি।

দীর্ঘদিন তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সম্পাদনা বোর্ডের সদস্য ছিলেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে তার সম্পাদিত বইয়ের সংখ্যা ৪২ টি। রিভিউ গ্রন্থ সংখ্যা ৫১ টি।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কাজী সাহেব হুজুর দ্বারা তার রাজজাকিয়্যাতের আক্বিদাকে সুসংরক্ষিত করেছেন আমাদের বাংলাদেশিদের জন্য।

আশির দশকের একজন মাওলানা (!) এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। তিনি ওলামাদের একটি সম্মেলন ডাকলেন জন্মনিয়ন্ত্রক বিষয়ক মাসআলা নিয়ে।

তার উদ্দেশ্য ছিল জন্মনিয়ন্ত্রণকে ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ বলে ঘোষণা করা। তৎকালীন প্রায় সকল আলেমই সেই সুচতুর মাওলানার (!) ধোঁকায় পড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু কাজী সাহেব হুজুর বক্তব্য দিতেই গণেশ উল্টে গেল।

ওলামায়ে কেরাম বুঝতে পারলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ শুধু ফিকহি মাসআলা-ই নয় ; এটা আক্বিদারও বিষয়। সেই মাওলানা তখন কাজি সাহেবকে সংগোপনে ৪০ হাজার টাকা উৎকোচ দিতে চাইলে ঘৃণাভরে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে চলে আসেন।

হুজুরের এই কীর্তিকে মরহুম মাওলানা ফজলুল হক আমিনী (রহ.) অকপটে স্বীকার করে বলেছিলেন, ‘এতোদিন তো আমরা জন্মনিয়ন্ত্রণকে ফিকহী মাসআলা বলেই জানতাম; কিন্তু হুজুরের আলোচনা দ্বারা বুঝতে পারলাম এটা শুধু ফিকহী মাসআলা নয় বরং এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ আক্বিদার বিষয়ও বটে।

এর দ্বারা আল্লাহ তায়ালার রাজজাকিয়্যাত সংক্রান্ত আক্বিদায় আঘাত লাগে। সুতরাং এখন থেকে বিষয়টিকে এভাবেই দেখতে হবে।’

হযরত কাজী সাহেব হুজুর তার শায়েখ, পীর ও মুরশিদ হযরত মাদানী রহ. এর চেতনার দেদীপ্যমান বাতিঘর ছিলেন। তাই তিনি সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশভাগ হওয়াকে যেমন মেনে নিতে পারেননি; তেমনি ১৯৭১ এ স্বাধীনতার বিপক্ষেও যেতে পারেননি।

তিনি স্বাধীনতার একজন অকুণ্ঠ সমর্থক ছিলেন। সংগোপণে ,সুসংগঠিত করেছেন যোদ্ধাদের। স্বাধীনতা পরবর্তী বন্ধ হয়ে যাওয়া মাদ্রাসাগুলো খুলে দেয়ার পদক্ষেপ তিনিই প্রথম গ্রহণ করেছিলেন।

শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ দূত হিসেবে হজরত ফিদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানীকে বাংলাদেশে আনার ব্যবস্থা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তিনিসহ ফিদায়ে মিল্লাত সাক্ষাত করেন।

মাদ্রাসাসহ ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। এরই প্রেক্ষিতে তালাবদ্ধ জামিয়া কোরআনীয়া আরাবিয়া লালবাগ মাদ্রাসার তালা তিনি নিজ হাতে খুলে দেন।

কাজী সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খন্ডকালীন প্রফেসর হিসেবে দেড়বছর সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করেন। পরে তিনি পর্দা লঙ্ঘন হয় বিধায় ইস্তফা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলে আসেন।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরবর্তী দুবছর তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য খুব চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি আর ফিরে যাননি।

তিনি ছিলেন রিজাল গড়ার সুনিপুণ কারিগর। আকাবিরে দেওবন্দের চিন্তা-চেতনায় উজ্জীবিত যুগ সচেতন নির্ভেজাল ইসলামের রিজাল গড়েছেন অসংখ্য। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে তার জুড়ি নেই।

বর্তমান খ্যাতনামা আলিম-মুহাদ্দিস, বুদ্ধিজীবি আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ, মাওলানা মাহমুদুল হাসান শায়েখে যাত্রাবাড়ি, মাওলানা আব্দুর রহমান হাফেজ্জীসহ অসংখ্য রিজালের দীক্ষাগুরু তিনি।

বাগ্মীতায়ও তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদার। বাংলা,উর্দু ও ফার্সি ভাষায় সমান দক্ষ ছিলেন তিনি।

জমিয়ত আয়োজিত লাহোরের এক সমাবেশে টানা আড়াইঘন্টা উর্দুতে বক্তব্য দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানী ওলামায়ে কেরামকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

ঠিক তেমনি ফেনীর ঐতিহাসিক মিজান ময়দানে জমিয়ত আয়োজিত এক সমাবেশে একটানা দেড়ঘন্টা বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিয়ে শ্রোতাদের বিমোহিত করে দিয়েছিলেন।

হাদিসের ময়দানে তিনি ছিলেন কিংবদন্তি। বাংলা, উর্দু, আরবি ভাষার পন্ডিত। তাই তার দরসের ঝলকানিও ছিল অনন্য সাধারণ। দরসে হাদিসে শায়খুল ইসলাম মাদানীর (রহ.) প্রতিচ্ছবি বলা হত তাকে।

মূলত: কাজী সাহেব হুজুর (রহ.) ছিলেন এক কালজয়ী প্রতিভা। সামান্য পরিসরে তার জীবন ও কর্মকে তুলে আনা অসম্ভব।

মহান রাব্বুল আলামিনের সমীপে নিবেদন করি, ‘হে আল্লাহ! তোমার রহমতের অবারিত দানের থেকে আপন রহমতের মুষল বারি বর্ষণ কর তার প্রতি। অধিষ্ঠিত কর জান্নাতুল ফেরদাউসের আলা মাকামে। আমিন।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত