মাওলানা কাসেম নানুতবী, ইংরেজ আগ্রাসন প্রতিরোধে এক অকুতোভয় সিপাহশালার
jugantor
মাওলানা কাসেম নানুতবী, ইংরেজ আগ্রাসন প্রতিরোধে এক অকুতোভয় সিপাহশালার

  মুহাম্মাদ রবিউল হক  

০৯ আগস্ট ২০২০, ১৯:৫৮:৩৯  |  অনলাইন সংস্করণ

মাওলানা কাসেম নানুতবী, ইংরেজ আগ্রাসন প্রতিরোধে এক অকুতোভয় সিপাহশালার

১৮৫৭ সালের কিছু আগে ব্রিটিশ-বেনিয়ারা পুরো হিন্দুস্তানের ওপর নিজেদের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ইংরেজরা হিন্দুস্তানের জনসাধারণের ওপর অকথ্য, অমানবিক জুলুম-নির্যাতন শুরু করে।

প্রতিরোধের সকল প্রচেষ্টা সমূলে ধ্বংস করা হচ্ছিল। অত্যাচার নিপীড়ন যখন সকল সীমা ছাড়িয়ে গেলো তখন ১৮৫৭ সালের পূর্বে হিন্দুস্তানের বিভিন্ন জায়গা প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয় এবং দিকে দিকে বিদ্রোহের দানা বাঁধতে থাকে।

শামেলি জেলার থানাভবনে তৎকালীন প্রসিদ্ধ ওলামায়ে কেরাম একত্র হোন। হাজী ইমদাদুল্লাহ, কাসেম নানুতবী, রশীদ আহমদ গাঙ্গুহি এবং রহমতুল্লাহ্ কিরানবিসহ অসংখ্য আলেম মিলিত হোন। তারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঝাণ্ডা উত্তোলন করার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকেন।

হাজী ইমদাদুল্লাহকে আমীর এবং কাসেম নানুতাবীকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। সাহারানপুর থেকে ইংরেজ সেনাবাহিনীর একটি পল্টন অত্যাধুনিক অস্ত্র,ভারি জলকামান নিয়ে শামেলির দিকে যাচ্ছিল।

রশীদ আহমদ গাঙ্গুহির নেতৃত্বে একটি ফৌজ রওনা হয়ে যায় এবং ইংরেজ সেনাবাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধ শুরু করে।

তুমুল লড়াইয়ের পর ইংরেজদের সকল অস্ত্র ওলামায়ে কেরাম করায়ত্ত করতে সক্ষম হোন। এমনকি শামেলির দুর্গ ইংরেজদের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আসেন।

কিন্তু ইংরেজ শক্তির সামনে দিল্লির মুঘল সালতানাত যখন নতিস্বীকার করে নেয় তখন সমগ্র হিন্দুস্তানের মতো শামেলির ময়দানও ইংরেজদের অধীনে চলে যায়। হিন্দুস্তানের একের পর এক পরাজয়ে এক সময় দিল্লির লাল কেল্লায় ইংরেজদের পতাকা উত্তোলিত হয়।

মুসলিম সালতানাতের ৭০০ বছরের সূর্য চিরদিনের জন্য অস্ত চলে যায়। ইংরেজ-বেনিয়াদের জয় আর মুসলমানদের পরাজয়ে কাসেম নানুতবীর অন্তরকে ক্ষত-বিক্ষত করতে থাকে।

ইংরেজরা হিন্দুস্তান দখলে নিয়ে প্রথমে যে কাজটি করে তা হলো মুসলমানদের জন্য হিন্দুস্তানের জমিন সংকুচিত করে ফেলে। সেই জাতি যারা হিন্দুস্তানকে এক নতুন সংস্কৃতি,এক নতুন তাহযীব, এক নতুন ভাষা উপহার দিয়েছে এবং হিন্দুস্তানের উন্নতি-অগ্রযাত্রায় এক নতুন ইতিহাস লিখেছে সেই জাতির ওপর ইংরেজদের নির্যাতন, নিপীড়নের যুগ শুরু হয়ে যায়।

তাদের তাহযীব -তামাদ্দুন ধ্বংসের সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়। তাদের ভিটেমাটি কুক্ষিগত করে নেয়া হয়। তাদের ভাষাকে বেসরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। সরকারি চাকরি হতে তাদের ছাঁটাই করা হয়। শুধু তাই নয় তাদের দ্বীন ধর্মের উপর বিভিন্ন রকমের আক্রোমণ শুরু করা হয়।

একদিকে মুসলমানের অস্তিত্ব হুমকির মুখে ছিলো অন্যদিকে তাদের দ্বীন ধর্ম ইংরেজদের ভয়ানক নিশানায় নিপতিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে শামেলির ময়দানের সেই অকুতোভয় বীর সেনানী এগিয়ে আসেন এবং মুসলমানের দ্বীন ধর্ম হেফাজতের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।

দ্বীনি তালিম ও তরবিয়াতের মাধ্যমে তিনি এমন বিপ্লব সৃষ্টি করেন যার উদাহরণ বিগত কয়েক শতাব্দীতে পাওয়া যায় না। সেই মহান ব্যক্তিত্বের নাম মাওলানা কাসেম নানুতবী। যিনি সমগ্র বিশ্বে দারুল উলূম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে প্রসিদ্ধ।

মাওলানা কাসেম নানুতবী কয়েকটি শহরে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন,দেওবন্দে দারুল উলূম,মুরাদাবাদে মাদরাসায়ে কাসেমিয়া শাহী,গোলাহাটিতে মাদরাসা মানবাউল উলূম এবং আমরোহাতে মাদরাসা ও জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখান থেকে আজ পর্যন্ত ইলমে দ্বীনের আলো ছড়াচ্ছে।

মাওলানা কাসেম নানুতবীর জীবনে অন্যতম অবদান দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা। দারুল উলূম দেওবন্দ শুধু একটি মাদরাসাই ছিলোনা বরং ছিলো একটি মিশন,একটি বিপ্লব ও একটি আন্দোলন। যে স্বপ্ন মাওলানা কাসেম নানুতবী দেখেছিলেন তার রুহানি সন্তানেরা তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন।

তিনি সাহারানপুরের একটি ছোট শহর দেওবন্দে ইলমের যে চেরাগ প্রজ্বালন করেছিলেন, সেই চেরাগ থেকে চেরাগ প্রজ্বালিত হতে থাকে এমনকি সমগ্র ভারতবর্ষ সেই মশাল দ্বারা আলোকিত হয়ে ওঠে।

আজ শুধু হিন্দুস্তান নয় বরং পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, আফ্রিকা মহাদেশ, ব্রিটেন ছাড়াও পৃথিবীর অসংখ্য দেশে দেওবন্দের রুহানি সন্তানেরা চেরাগ জ্বেলে রেখেছেন। যার আলোয় হাজার হাজার বিদ্যার্থী প্রতিনিয়ত নববী ইলমে অবগাহন করে থাকে।

দারুল উলুম দেওবন্দকে জামে আযহারের পর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ইসলামী ইন্সটিটিউট গণ্য করা হয়। মাওলানা কাসেম নানুতবী, মাওলানা সাইয়্যিদ আবেদ দেওবন্দি, মাওলানা জুলফিকার আহমদ দেওবন্দি এবং ফজলুর রহমান উসমানী সাহেবের চেষ্টায় ১৩ মে ১৮৬৬ সালে সাহারানপুরের একটি ছোট গ্রাম দেওবন্দে এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন করা হয়।

একজন শিক্ষক ও একজন ছাত্র দ্বারা সাত্তা মসজিদের নিকটে একটি ডালিম গাছের নিচে এর যাত্রা সূচনা করা হয়।

মাওলানা কাসেম নানুতবীর নিষ্ঠা,ইখলাস ও লিল্লাহিয়াত এবং বেনজির ত্যাগ-তিতিক্ষা ও কোরবানির মাধ্যমে অল্পদিনেই একে উন্নতি ও প্রসিদ্ধির শীর্ষ চূড়ায় পৌঁছে দেয়। তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই বাগানের উন্নতি অগ্রগতির জন্য চেষ্টা-সাধনা করে গেছেন।

দারুল উলুম দেওবন্দ শুধুমাত্র ইলমে দ্বীনের আলো ছড়ায়নি বরং এর মুখপাত্রগণ প্রতিষ্ঠাতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের স্বাধীনতায় এমন মহান ত্যাগ স্বীকার করেছেন যার অবদান হিন্দুস্তানের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে না। রেশমি রুমাল আন্দোলন আজো ভারতের স্বাধীনতায় এক গৌরবময় অধ্যায়।

শায়খুল হিন্দ, উবায়দুল্লাহ সিন্ধি, মুফতি কেফায়েত উল্লাহ, সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী, আহমদ আলী লাহোরী এবং হাবিবুর রহমান লুধিয়ানবী ছাড়াও স্বাধীনতা আন্দোলনের হাজার হাজার বীর সেনানী দারুল উলুম দেওবন্দের সন্তান।

ব্রিটিশবিরোধী লড়াইয়ের পাশাপাশি দারুল উলুমের রুহানি সন্তানেরা জ্ঞানচর্চা ও বিতরণ,গ্রন্থ রচনা,দাওয়াত-তাবলিগ, তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধির ময়দানে যে অনন্য অবদান রেখেছেন বর্তমান পৃথিবীর ইতিহাসে তার নজির পাওয়া যায় না।

দুনিয়াব্যাপী যে দাওয়াত ও তাবলিগী মিশন, যাকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় দাওয়াতি মিশন গণ্য করা হয় তার প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস কান্ধলবি এই প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র ও রুহানি সন্তান।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলের বীর সেনানী শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান,হাজারের অধিক গ্রন্থ প্রণেতা আশরাফ আলী থানবী, জীবন্ত ও সবাক গ্রন্থগার আনোয়ার শাহ্ কাশমিরী, সাব্বির আহমদ উসমানী, হুসাইন আহমদ মাদানী, মুফতি শফী দেওবন্দীসহ হাজার হাজার মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকিহ, সাহিত্যিক এবং দাঈ পাওয়া যাবে যারা এই বাগানের ফুল।

দারুল উলুম দেওবন্দের আদর্শের সন্তানেরা বিগত দেড়শো বছর ইলমি খেদমতের যে অবদান রেখেছেন, নিঃসন্দেহে তার ওপর মিল্লাতে ইসলামিয়া চিরঋণী হয়ে থাকবে। আর এসব কিছুর কৃতিত্ব সেই অকুতোভয় মরদে মুজাহিদের ওপর যিনি শামেলির ময়দানে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দান করেছেন।

মাওলানা কাসেম নানুতবী জিহাদ ও সমাজ সংস্কারে বেশি ব্যাপৃত থাকার কারণে গ্রন্থ রচনায় মনোনিবেশ করতে পারেননি। তারপরও তিনি কিছু অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেছেন,যা তার শাস্ত্রীয় ইমাম হওয়ার সাক্ষ্য বহন করে।

তাকরিরে দিল পছিন্দ, তাহযিরুন্নাস, আবে হায়াত, কিবলা নামা, ইনতিসারুল ইসলাম, আদ দলিলুল মুহকাম, হাদিয়াতুশ শি'আ, আজবিবায়ে আরবাঈন ইত্যাদি।

মাওলানা কাসেম নানুতবী ছিলেন এক মহান মুজাহিদ, একজন মুখলিছ সমাজ সংস্কারক, অনবদ্য লেখক, কালজয়ী মুতাকাল্লিম, অনলবর্ষী বক্তা, অনন্য সাধারণ শিক্ষক ও অভিভাবক, দ্বীন ও মিল্লাতের ক্ষণজন্মা সেবক হওয়ার সাথে সাথে তার ইখলাস ও লিল্লাহিয়াত এবং যুহদ ও দুনিয়া বিমুখতার কারণে তিনি ছিলেন সালাফের বাস্তব নমুনা।

উনিশ শতকের এই মহান মুজাদ্দিদ যিনি যুদ্ধের ময়দানেও তার সমর নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। তিনি হিন্দুস্তানের একটি অনন্য সাধারণ দ্বীনের মুহাফেজখানা প্রতিষ্ঠা করে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন।

তার মৃত্যুতে স্যার সৈয়দ আহমদ যে শোকগাথা লিখে পাঠান তা প্রণিধানযোগ্য, ‘মূলত মাওলানা কাসেম নানুতবী স্বভাব-চরিত্রে ফেরেশতার মতো ছিলেন। তার মতো মহান ব্যক্তিত্বের প্রস্থানে সেই সব মানুষের জন্য আফসোস, পরিতাপ আর দুঃখের বিষয় যারা তার পরে পৃথিবীতে বর্তমান থাকবে।’

কবি বলেন, ‘আসমান তোমার কবরে ছায়া দিক, ফেরেশতাকুল তার দেখাশোনার দায়িত্ব নিক।’

লেখক: শিক্ষক, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ

মাওলানা কাসেম নানুতবী, ইংরেজ আগ্রাসন প্রতিরোধে এক অকুতোভয় সিপাহশালার

 মুহাম্মাদ রবিউল হক 
০৯ আগস্ট ২০২০, ০৭:৫৮ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
মাওলানা কাসেম নানুতবী, ইংরেজ আগ্রাসন প্রতিরোধে এক অকুতোভয় সিপাহশালার
দেওবন্দের মসজিদে রশিদ। ছবি: সংগৃহীত

১৮৫৭ সালের কিছু আগে ব্রিটিশ-বেনিয়ারা পুরো হিন্দুস্তানের ওপর নিজেদের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ইংরেজরা হিন্দুস্তানের জনসাধারণের ওপর অকথ্য, অমানবিক জুলুম-নির্যাতন শুরু করে। 

প্রতিরোধের সকল প্রচেষ্টা সমূলে ধ্বংস করা হচ্ছিল। অত্যাচার নিপীড়ন যখন সকল সীমা ছাড়িয়ে গেলো তখন ১৮৫৭ সালের পূর্বে হিন্দুস্তানের বিভিন্ন জায়গা প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয় এবং দিকে দিকে বিদ্রোহের দানা বাঁধতে থাকে।

শামেলি জেলার থানাভবনে তৎকালীন প্রসিদ্ধ ওলামায়ে কেরাম একত্র হোন। হাজী ইমদাদুল্লাহ, কাসেম নানুতবী, রশীদ আহমদ গাঙ্গুহি এবং রহমতুল্লাহ্ কিরানবিসহ অসংখ্য আলেম মিলিত হোন। তারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঝাণ্ডা উত্তোলন করার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকেন। 

হাজী ইমদাদুল্লাহকে আমীর এবং কাসেম নানুতাবীকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। সাহারানপুর থেকে ইংরেজ সেনাবাহিনীর একটি পল্টন অত্যাধুনিক অস্ত্র,ভারি জলকামান নিয়ে শামেলির দিকে যাচ্ছিল। 

রশীদ আহমদ গাঙ্গুহির নেতৃত্বে একটি ফৌজ রওনা হয়ে যায় এবং ইংরেজ সেনাবাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধ শুরু করে। 

তুমুল লড়াইয়ের পর ইংরেজদের সকল অস্ত্র ওলামায়ে কেরাম করায়ত্ত করতে সক্ষম হোন। এমনকি শামেলির দুর্গ ইংরেজদের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আসেন।

কিন্তু ইংরেজ শক্তির সামনে দিল্লির মুঘল সালতানাত যখন নতিস্বীকার করে নেয় তখন সমগ্র হিন্দুস্তানের মতো শামেলির ময়দানও ইংরেজদের অধীনে চলে যায়। হিন্দুস্তানের একের পর এক পরাজয়ে এক সময় দিল্লির লাল কেল্লায় ইংরেজদের পতাকা উত্তোলিত হয়। 

মুসলিম সালতানাতের ৭০০ বছরের সূর্য চিরদিনের জন্য অস্ত চলে যায়। ইংরেজ-বেনিয়াদের জয় আর মুসলমানদের পরাজয়ে কাসেম নানুতবীর অন্তরকে ক্ষত-বিক্ষত করতে থাকে। 

ইংরেজরা হিন্দুস্তান দখলে নিয়ে প্রথমে যে কাজটি করে তা হলো মুসলমানদের জন্য হিন্দুস্তানের জমিন সংকুচিত করে ফেলে। সেই জাতি যারা হিন্দুস্তানকে এক নতুন সংস্কৃতি,এক নতুন তাহযীব, এক নতুন ভাষা উপহার দিয়েছে এবং হিন্দুস্তানের উন্নতি-অগ্রযাত্রায় এক নতুন ইতিহাস লিখেছে সেই জাতির ওপর ইংরেজদের নির্যাতন, নিপীড়নের যুগ শুরু হয়ে যায়। 

তাদের তাহযীব -তামাদ্দুন ধ্বংসের সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়। তাদের ভিটেমাটি কুক্ষিগত করে নেয়া হয়। তাদের ভাষাকে বেসরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। সরকারি চাকরি হতে তাদের ছাঁটাই করা হয়। শুধু তাই নয় তাদের দ্বীন ধর্মের উপর বিভিন্ন রকমের আক্রোমণ শুরু করা হয়।

একদিকে মুসলমানের অস্তিত্ব হুমকির মুখে ছিলো অন্যদিকে তাদের দ্বীন ধর্ম ইংরেজদের ভয়ানক নিশানায় নিপতিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে শামেলির ময়দানের সেই অকুতোভয় বীর সেনানী এগিয়ে আসেন এবং মুসলমানের দ্বীন ধর্ম হেফাজতের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। 

দ্বীনি তালিম ও তরবিয়াতের মাধ্যমে তিনি এমন বিপ্লব সৃষ্টি করেন যার উদাহরণ বিগত কয়েক শতাব্দীতে পাওয়া যায় না। সেই মহান ব্যক্তিত্বের নাম মাওলানা কাসেম নানুতবী। যিনি সমগ্র বিশ্বে দারুল উলূম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে প্রসিদ্ধ।

মাওলানা কাসেম নানুতবী কয়েকটি শহরে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন,দেওবন্দে দারুল উলূম,মুরাদাবাদে মাদরাসায়ে কাসেমিয়া শাহী,গোলাহাটিতে মাদরাসা মানবাউল উলূম এবং আমরোহাতে মাদরাসা ও জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখান থেকে আজ পর্যন্ত ইলমে দ্বীনের আলো ছড়াচ্ছে।

মাওলানা কাসেম নানুতবীর জীবনে অন্যতম অবদান দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা। দারুল উলূম দেওবন্দ শুধু একটি মাদরাসাই ছিলোনা বরং ছিলো একটি মিশন,একটি বিপ্লব ও একটি আন্দোলন। যে স্বপ্ন মাওলানা কাসেম নানুতবী দেখেছিলেন তার রুহানি সন্তানেরা তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। 

তিনি সাহারানপুরের একটি ছোট শহর দেওবন্দে ইলমের যে চেরাগ প্রজ্বালন করেছিলেন, সেই চেরাগ থেকে চেরাগ প্রজ্বালিত হতে থাকে এমনকি সমগ্র ভারতবর্ষ সেই মশাল দ্বারা আলোকিত হয়ে ওঠে। 

আজ শুধু হিন্দুস্তান নয় বরং পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, আফ্রিকা মহাদেশ, ব্রিটেন ছাড়াও পৃথিবীর অসংখ্য দেশে দেওবন্দের রুহানি সন্তানেরা চেরাগ জ্বেলে রেখেছেন। যার আলোয় হাজার হাজার বিদ্যার্থী প্রতিনিয়ত নববী ইলমে অবগাহন করে থাকে।

দারুল উলুম দেওবন্দকে জামে আযহারের পর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ইসলামী ইন্সটিটিউট গণ্য করা হয়। মাওলানা কাসেম নানুতবী, মাওলানা সাইয়্যিদ আবেদ দেওবন্দি, মাওলানা জুলফিকার আহমদ দেওবন্দি এবং ফজলুর রহমান উসমানী সাহেবের চেষ্টায় ১৩ মে ১৮৬৬ সালে সাহারানপুরের একটি ছোট গ্রাম দেওবন্দে এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন করা হয়। 

একজন শিক্ষক ও একজন ছাত্র দ্বারা সাত্তা মসজিদের নিকটে একটি ডালিম গাছের নিচে এর যাত্রা সূচনা করা হয়।

মাওলানা কাসেম নানুতবীর নিষ্ঠা,ইখলাস ও লিল্লাহিয়াত এবং বেনজির ত্যাগ-তিতিক্ষা ও কোরবানির মাধ্যমে অল্পদিনেই একে উন্নতি ও প্রসিদ্ধির শীর্ষ চূড়ায় পৌঁছে দেয়। তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই বাগানের উন্নতি অগ্রগতির জন্য চেষ্টা-সাধনা করে গেছেন।

দারুল উলুম দেওবন্দ শুধুমাত্র ইলমে দ্বীনের আলো ছড়ায়নি বরং এর মুখপাত্রগণ প্রতিষ্ঠাতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের স্বাধীনতায় এমন মহান ত্যাগ স্বীকার করেছেন যার অবদান হিন্দুস্তানের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে না। রেশমি রুমাল আন্দোলন আজো ভারতের স্বাধীনতায় এক গৌরবময় অধ্যায়। 

শায়খুল হিন্দ, উবায়দুল্লাহ সিন্ধি, মুফতি কেফায়েত উল্লাহ, সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী, আহমদ আলী লাহোরী এবং হাবিবুর রহমান লুধিয়ানবী ছাড়াও স্বাধীনতা আন্দোলনের হাজার হাজার বীর সেনানী দারুল উলুম দেওবন্দের সন্তান। 

ব্রিটিশবিরোধী লড়াইয়ের পাশাপাশি দারুল উলুমের রুহানি সন্তানেরা জ্ঞানচর্চা ও বিতরণ,গ্রন্থ রচনা,দাওয়াত-তাবলিগ, তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধির ময়দানে যে অনন্য অবদান রেখেছেন বর্তমান পৃথিবীর ইতিহাসে তার নজির পাওয়া যায় না।

দুনিয়াব্যাপী যে দাওয়াত ও তাবলিগী মিশন, যাকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় দাওয়াতি মিশন গণ্য করা হয় তার প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস কান্ধলবি এই প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র ও রুহানি সন্তান। 

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলের বীর সেনানী শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান,হাজারের অধিক গ্রন্থ প্রণেতা আশরাফ আলী থানবী, জীবন্ত ও সবাক গ্রন্থগার আনোয়ার শাহ্ কাশমিরী, সাব্বির আহমদ উসমানী, হুসাইন আহমদ মাদানী, মুফতি শফী দেওবন্দীসহ হাজার হাজার মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকিহ, সাহিত্যিক এবং দাঈ পাওয়া যাবে যারা এই বাগানের ফুল।

দারুল উলুম দেওবন্দের আদর্শের সন্তানেরা বিগত দেড়শো বছর ইলমি খেদমতের যে অবদান রেখেছেন, নিঃসন্দেহে তার ওপর মিল্লাতে ইসলামিয়া চিরঋণী হয়ে থাকবে। আর এসব কিছুর কৃতিত্ব সেই অকুতোভয় মরদে মুজাহিদের ওপর যিনি শামেলির ময়দানে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দান করেছেন।

মাওলানা কাসেম নানুতবী জিহাদ ও সমাজ সংস্কারে বেশি ব্যাপৃত থাকার কারণে গ্রন্থ রচনায় মনোনিবেশ করতে পারেননি। তারপরও তিনি কিছু অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেছেন,যা তার শাস্ত্রীয় ইমাম হওয়ার সাক্ষ্য বহন করে। 

তাকরিরে দিল পছিন্দ, তাহযিরুন্নাস, আবে হায়াত, কিবলা নামা, ইনতিসারুল ইসলাম, আদ দলিলুল মুহকাম, হাদিয়াতুশ শি'আ, আজবিবায়ে আরবাঈন ইত্যাদি।

মাওলানা কাসেম নানুতবী ছিলেন এক মহান মুজাহিদ, একজন মুখলিছ সমাজ সংস্কারক, অনবদ্য লেখক, কালজয়ী মুতাকাল্লিম, অনলবর্ষী বক্তা, অনন্য সাধারণ শিক্ষক ও অভিভাবক, দ্বীন ও মিল্লাতের ক্ষণজন্মা সেবক হওয়ার সাথে সাথে তার ইখলাস ও লিল্লাহিয়াত এবং যুহদ ও দুনিয়া বিমুখতার কারণে তিনি ছিলেন সালাফের বাস্তব নমুনা। 

উনিশ শতকের এই মহান মুজাদ্দিদ যিনি যুদ্ধের ময়দানেও তার সমর নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। তিনি হিন্দুস্তানের একটি অনন্য সাধারণ দ্বীনের মুহাফেজখানা প্রতিষ্ঠা করে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। 

তার মৃত্যুতে স্যার সৈয়দ আহমদ যে শোকগাথা লিখে পাঠান তা প্রণিধানযোগ্য, ‘মূলত মাওলানা কাসেম নানুতবী স্বভাব-চরিত্রে ফেরেশতার মতো ছিলেন। তার মতো মহান ব্যক্তিত্বের প্রস্থানে সেই সব মানুষের জন্য আফসোস, পরিতাপ আর দুঃখের বিষয় যারা তার পরে পৃথিবীতে বর্তমান থাকবে।’

কবি বলেন, ‘আসমান তোমার কবরে ছায়া দিক, ফেরেশতাকুল তার দেখাশোনার দায়িত্ব নিক।’

 

লেখক: শিক্ষক, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন