আহমদ শফীর অন্তরে জাগরণের পিদিম জ্বালিয়ে ছিলেন হোসাইন আহমদ মাদানী
jugantor
আহমদ শফীর অন্তরে জাগরণের পিদিম জ্বালিয়ে ছিলেন হোসাইন আহমদ মাদানী

  তোফায়েল গাজালি  

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২০:৩৩:৪৫  |  অনলাইন সংস্করণ

আহমদ শফীর অন্তরে জাগরণের পিদিম জ্বালিয়ে ছিলেন হোসাইন আহমদ মাদানী

প্রেমময়ের প্রেমকানন মাটির দুনিয়া। এখানের রঙ-রূপ, ছন্দ ও গন্ধে পুলকিত হন আমাদের মাবুদ রব্বানা। তিনি এখানে রঙ ঢালেন। রূপ ধরান। ছন্দের তালে তালে প্রবাহিত করেন আমাদের জীবন ধারা।

ছন্দের পতন হলে সাঙ্গ হয় এখানের মেলা। মাবুদ যাকে ভালবাসেন তাকে অমর করে রাখে এই বসুন্ধরা। আল্লামা শাহ আহমদ শফী খোদার ওইসব প্রিয় বান্দাদের একজন যার মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান গোটা মুসলিম দুনিয়া।

তার মৃত্যুর সংবাদে কে কাঁদেনি! আফসোস আর অনুশোচনা করেনি কে সে! তিনি ওলীকুল সম্রাট ছিলেন। বিদগ্ধ আলেম ছিলেন। ইসলামী আইনবেত্তা ছিলেন। যুগ শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ছিলেন। সমকালিন মুসলিম দুনিয়ার অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিচারে তিনি ছিলেন অনন্য উচ্চতায় সমাসীন।

১৯৩০ খৃষ্টাব্দের এক কাক ডাকা ভোর বেলা। কুদরতি সৃষ্টির সুরে নেচে উঠল খোদার আরশ কুরসি। সজীব ও সতেজ হয়ে উঠল উত্তপ্ত পৃথিবীর শুষ্ক প্রকৃতি। জিবরাইলের হাতের বাঁশিতে যে সুর ফুঁকেছিলেন মোহাম্মদ সা.- ‘ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক/খালাকাল ইনসানা মিন আলাক’।

প্রেমময়ের সেই সুর আজ বেজে উঠল সবুজভূমি বাংলাদেশে। ১২ আউলিয়ার পাক জমিন ইসলামাবাদের (চট্টগ্রামের) রাঙ্গুনিয়ায় জন্ম নিলেন ইসলামের রাঙ্গাদুলাল আহমদ শফী।

পাখিয়ারটিলা নামক গ্রামের এক অভিজাত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। মা মোসাম্মাৎ মেহেরুন্নেছার কোলে বসে বাবা বরকত আলীর কানে ফুঁকা আজান ধ্বনিতে যেন বুঝে নিলেন আগামী দিনের পথচলার নীতি ও পদ্ধতি।

শৈশবেই কোরআন শিক্ষার জন্য মৌলভী আজিজুর রহমানের কাছে ভর্তি হন। কোরআন শিক্ষার ফাঁকে ফাঁকে নিয়মিত মাতৃভাষার চর্চাও শুরু করলেন আহমদ শফী। চতুর্থ শ্রেনি পর্যন্ত বাংলা পড়লেন।

এরপর তিনি শরফভাটা মাদ্রাসায় প্রাথমিক পাঠে মনোনিবেশ করলেন। প্রখর মেধার অধিকারি আহমদ শফী খুব অল্প বয়সেই কোরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত ও প্রাথমিক শিক্ষা-দীক্ষায় সাফল্যের সাক্ষর রাখেন।

ভর্তি হন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জামিয়া ইসলামিয়া জিরি মাদ্রাসায়। সেখানে ৫/৬ মাস অধ্যয়ন করেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে ভর্তি হন দারুল উলূম মুঈনুল ইসলামে হাটহাজারী মাদ্রাসায়।

হাটহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষা সমাপ্ত করে উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের জন্য ১৯৪১ সালে ছুটে যান ভারতের উত্তর প্রদেশে অবস্থিত দারুল উলুম দেওবন্দে।

সেখানেই ব্রিটিশ বিরোধি আন্দোলনের অগ্রসেনানী মাওলানা সাইয়্যেদ হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) তার অন্তরে জ্বালিয়ে দেন বিপ্লব ও জাগরণের পিদিম। সময়ের ব্যবধানে এ পিদিম একদিন অনির্বাণ শিখা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়।

মাওলানা মাদানীর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেন তিনি। তার শিষ্যত গ্রহণ করেন। হাদিস, ফেকাহ ও আধ্যাত্মিক সনদ গ্রহণ করেন তার কাছ থেকে। যত দিন বেঁচে ছিলেন মাদানীর আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র সরেননি আহমদ শফী।

দেওবন্দে মাদানীর হাতে বিপ্লব ও জাগরণের যে সবক নিয়েছিলেন আমৃত্যু সেই জাগরণের গান গেয়ে গেছেন তিনি।

আদর্শিক বিপ্লবের নমুনা উপস্থাপন করে ইতিহাসের নায়ক হয়ে আছেন এই কিংবদন্তি। ঐক্য ও সংহতির নজিরবিহীন যে উদাহরণ পেশ করেছেন তা ভোলার নয়, কোনদিন ভুলবে না জাতি।

দেওবন্দের পাঠ চুকিয়ে হোসাইন আহমদ মাদানীর প্রতিনিধি হয়ে শিক্ষক হিসেবে ১৯৪৬ সালে যুক্ত হন দারুল উলুম হাটহাজারীতে। ১৯৮৬ খৃস্টাব্দে মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

শেষ দিন পর্যন্ত হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক ও শায়খুল হাদিসের দায়িত্বের পাশাপাশি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর, বাংলাদেশ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাক ও আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতুল কওমীয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আল্লামা শফী।

আহমদ শফীর অন্তরে জাগরণের পিদিম জ্বালিয়ে ছিলেন হোসাইন আহমদ মাদানী

 তোফায়েল গাজালি 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:৩৩ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
আহমদ শফীর অন্তরে জাগরণের পিদিম জ্বালিয়ে ছিলেন হোসাইন আহমদ মাদানী
ছবি: লেখক

প্রেমময়ের প্রেমকানন মাটির দুনিয়া। এখানের রঙ-রূপ, ছন্দ ও গন্ধে পুলকিত হন আমাদের মাবুদ রব্বানা। তিনি এখানে রঙ ঢালেন। রূপ ধরান। ছন্দের তালে তালে প্রবাহিত করেন আমাদের জীবন ধারা। 

ছন্দের পতন হলে সাঙ্গ হয় এখানের মেলা। মাবুদ যাকে ভালবাসেন তাকে অমর করে রাখে এই বসুন্ধরা। আল্লামা শাহ আহমদ শফী খোদার ওইসব প্রিয় বান্দাদের একজন যার মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান গোটা মুসলিম দুনিয়া। 

তার মৃত্যুর সংবাদে কে কাঁদেনি! আফসোস আর অনুশোচনা করেনি কে সে! তিনি ওলীকুল সম্রাট ছিলেন। বিদগ্ধ আলেম ছিলেন। ইসলামী আইনবেত্তা ছিলেন।  যুগ শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ছিলেন। সমকালিন মুসলিম দুনিয়ার অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিচারে তিনি ছিলেন অনন্য উচ্চতায় সমাসীন। 

১৯৩০ খৃষ্টাব্দের এক কাক ডাকা ভোর বেলা। কুদরতি সৃষ্টির সুরে নেচে উঠল খোদার আরশ কুরসি। সজীব ও সতেজ হয়ে উঠল উত্তপ্ত পৃথিবীর শুষ্ক প্রকৃতি। জিবরাইলের হাতের বাঁশিতে যে সুর ফুঁকেছিলেন মোহাম্মদ সা.- ‘ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক/খালাকাল ইনসানা মিন আলাক’। 

প্রেমময়ের সেই সুর আজ বেজে উঠল সবুজভূমি বাংলাদেশে। ১২ আউলিয়ার পাক জমিন ইসলামাবাদের (চট্টগ্রামের) রাঙ্গুনিয়ায় জন্ম নিলেন ইসলামের রাঙ্গাদুলাল আহমদ শফী। 

পাখিয়ারটিলা নামক গ্রামের এক অভিজাত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। মা মোসাম্মাৎ মেহেরুন্নেছার কোলে বসে বাবা বরকত আলীর কানে ফুঁকা আজান ধ্বনিতে যেন বুঝে নিলেন আগামী দিনের পথচলার নীতি ও পদ্ধতি।

শৈশবেই কোরআন শিক্ষার জন্য মৌলভী আজিজুর রহমানের কাছে ভর্তি হন। কোরআন শিক্ষার ফাঁকে ফাঁকে নিয়মিত মাতৃভাষার চর্চাও শুরু করলেন আহমদ শফী। চতুর্থ শ্রেনি পর্যন্ত বাংলা পড়লেন। 

এরপর তিনি শরফভাটা মাদ্রাসায় প্রাথমিক পাঠে মনোনিবেশ করলেন। প্রখর মেধার অধিকারি আহমদ শফী খুব অল্প বয়সেই কোরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত ও প্রাথমিক শিক্ষা-দীক্ষায় সাফল্যের সাক্ষর রাখেন। 

ভর্তি হন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জামিয়া ইসলামিয়া জিরি মাদ্রাসায়। সেখানে ৫/৬ মাস অধ্যয়ন করেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে ভর্তি হন দারুল উলূম মুঈনুল ইসলামে হাটহাজারী মাদ্রাসায়। 

হাটহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষা সমাপ্ত করে উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের জন্য ১৯৪১ সালে ছুটে যান ভারতের উত্তর প্রদেশে অবস্থিত দারুল উলুম দেওবন্দে। 

সেখানেই ব্রিটিশ বিরোধি আন্দোলনের অগ্রসেনানী মাওলানা সাইয়্যেদ হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) তার অন্তরে জ্বালিয়ে দেন বিপ্লব ও জাগরণের পিদিম। সময়ের ব্যবধানে এ পিদিম একদিন অনির্বাণ শিখা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। 

মাওলানা মাদানীর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেন তিনি। তার শিষ্যত গ্রহণ করেন। হাদিস, ফেকাহ ও আধ্যাত্মিক সনদ গ্রহণ করেন তার কাছ থেকে। যত দিন বেঁচে ছিলেন মাদানীর আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র সরেননি আহমদ শফী। 

দেওবন্দে মাদানীর হাতে বিপ্লব ও জাগরণের যে সবক নিয়েছিলেন আমৃত্যু সেই জাগরণের গান গেয়ে গেছেন তিনি। 

আদর্শিক বিপ্লবের নমুনা উপস্থাপন করে ইতিহাসের নায়ক হয়ে আছেন এই কিংবদন্তি। ঐক্য ও সংহতির নজিরবিহীন যে উদাহরণ পেশ করেছেন তা ভোলার নয়, কোনদিন ভুলবে না জাতি।

দেওবন্দের পাঠ চুকিয়ে হোসাইন আহমদ মাদানীর প্রতিনিধি হয়ে শিক্ষক হিসেবে ১৯৪৬ সালে যুক্ত হন দারুল উলুম হাটহাজারীতে। ১৯৮৬ খৃস্টাব্দে মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। 

শেষ দিন পর্যন্ত হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক ও শায়খুল হাদিসের দায়িত্বের পাশাপাশি  হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর, বাংলাদেশ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাক ও আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতুল কওমীয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আল্লামা শফী।
 

 

ঘটনাপ্রবাহ : আল্লামা শফী আর নেই