Logo
Logo
×

ইসলাম ও জীবন

বিশেষ সাক্ষাৎকার

‘প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আমি মক্তবে কওমি আলেমের কাছে পড়েছি’

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২০, ০১:৪৪ পিএম

‘প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আমি মক্তবে কওমি আলেমের কাছে পড়েছি’

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী। ছবি: যুগান্তর

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী। প্রবীণ রাজনীতিবিদ। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন ইংল্যান্ডে। ছাত্রজীবনেই লন্ডনে ‘মুসলিম মুভমেন্ট’র সভাপতি ছিলেন। 

আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও তিনি বাংলাদেশে ফিরে ইসলামি রাজনীতির একজন কর্মী হিসেবে যোগদান করেন। 

বর্তমানে তিনি ‘বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোট’র চেয়ারম্যান, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বোর্ড অব গভর্নরস-এর সম্মানিত গভর্নর, ইসলামিক ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের চেয়ারম্যান ও জামিয়া মাদানিয়া মুগদা মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। 

একইসঙ্গে হেফাজতে ইসলাম ও বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের অত্যন্ত আস্থাভাজন ব্যক্তিত্ব বলেও পরিচিত তিনি। 

সদ্যপ্রয়াত আল্লামা আহমদ শফী (রহ.) পরবর্তী ইসলামি রাজনীতি, হেফাজত আন্দোলন, কওমি স্বীকৃতিসহ নানান বিষয় নিয়ে যুগান্তরের পক্ষ থেকে তার মুখোমুখী হয়েছিলেন- এহসান সিরাজমনযূরুল হক। গ্রন্থনা করেছেন- তানজিল আমির।  


যুগান্তর: সদ্য প্রয়াত আল্লামা আহমদ শফী (রহ.) সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: তিনি ছিলেন পরশপাথর তুল্য।  তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৭৮ সালে।  তখন আমি লন্ডন থেকে ফিরেছি, বাংলাদেশে তখন কয়েকটি ইসলামি দল মিলে বড় একটি ইসলামিক প্লাটফর্ম তৈরী হয়। নাম—‘ইসলামী আন্দোলন’। 

আমি ছিলাম এর জেনারেল সেক্রেটারি। সে-সময় মাওলানা মশিউর রহমান আমাকে সহ আরো কয়েকজন আলেম নিয়ে হাটহাজারী যান।  আল্লামা শফীর (রহ.) সামনে সম্মিলিত প্লাটফর্মের ধারণাটি তুলে ধরেন। 

তিনি পূর্ণ সমর্থন জানান।  কাজ চাালিয়ে যেতে বলেন এবং তিনি সঙ্গে থাকবেন বলেও আশ্বাস দেন।  এভাবেই তার সঙ্গে আমার পরিচয়।

আওয়ামীলীগ সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর ২০০৯ সালে ভোলার গ্রিন ক্রিসেন্ট মাদরাসায় অস্ত্র পাওয়া নিয়ে অধিকাংশ মিডিয়া কওমি মাদ্রাসাকে দোষারোপ করতে শুরু করে।  তখন আমরা বাইতুল মোকাররমের উত্তর গেইটে একটি বড় সমাবেশ করি। প্রধান অতিথি ছিলাম আমি, সভাপতি মাওলানা ফরিদউদ্দীন মাসউদ। 

সমাবেশের পর দশ সদস্যের একটি দল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করি।  তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে আমাদের কথা শোনেন।  ওই বৈঠকেই কওমি সনদের প্রসঙ্গ উঠে আসে।  আমি বললাম, আল্লামা আহমদ শফীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। 

প্রধানমন্ত্রী বললেন, কিভাবে কী করা যায়? আমি বললাম, ‘একটি সিলেবাস কমিটি গঠন করা যায়।  কারো হস্তক্ষেপ ছাড়া তারা একটি সিলেবাস প্রণয়ন করবে।  সেই সিলেবাসের ওপর সনদ দেওয়া হবে।’ 

আমার কথাটি মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ সাহেবও পছন্দ করেছেন।  আহমদ শফী সাহেব ঢাকায় এলে ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় বৈঠক হয়। 

বৈঠকে ছিলেন মাওলানা আবদুল কুদ্দুস, মাওলানা রুহুল আমিন খান, মাওলানা নুরুল ইসলাম, ইসলামি ঐক্যজোটের মনিরুজ্জামান চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন আলেম। 

তিনি বিষয়টি খুব ইতিবাচক হিসেবে নিয়ে বললেন, অবশ্যই কমিটি করতে হবে এবং তা আজকেই, আর তাতে তোমার নামও থাকবে কমিটিতে।  

আমি বললাম, আমি কওমি মাদরাসায় পড়িনি।  তবুও হযরত জোর করে আমার নাম কমিটিতে দিয়ে দিলেন। আমি তার সাইন করা তালিকা আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দিই।

তার সঙ্গে প্রায়ই ফোনে কথা হতো। একবার ফোনে বললেন, আমার শেষ একটা ইচ্ছা, কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করার আন্দোলন করা। তুমিও প্রধানমন্ত্রীকে বুঝাও। আমার মৃত্যুর আগে এই কাজটি করে যেতে চাই, ইনশাআল্লাহ। 

তিনি ছিলেন একটি পরশপাথর। আমার যাপিত জীবনের বর্ণমালা তার ছোঁয়ায় আলাদা মর্ম পেয়েছে। আলাদা ব্যাঞ্জনা পেয়েছে। জীবন আলোকিত করার জন্য এইসব মানুষদের দোয়া ও ছোঁয়া দুটোই গুরুত্বপূর্ণ।

যুগান্তর: তার মৃত্যু সম্পর্কে কী বলবেন? স্বাভাবিক মৃত্যু, নাকি হাটহাজারীর ছাত্র আন্দোলনের প্রেশারে অস্বাভাবিক মৃত্যু?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: ইন্তেকালের সময় তার নাতি পাশে উপস্থিত ছিলেন।  আমি তার বড় ছেলের ইন্টারভিউ দেখেছি।  মৃত্যু তো আল্লাহতায়ালাই দান করেন।  কিন্তু পার্থিব দৃষ্টিতে আমার বিশ্বাস- তার মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই হয়েছে।  তার সামনে বেয়াদবি এবং প্রেশার ক্রিয়েটের মতো ধৃষ্টতা কেউ দেখায় নি।

যুগান্তর: এর আগে হাটহাজারী মাদ্রাসায় যে ছাত্র আন্দোলন হয়েছে- সে সম্পর্কে বলুন।

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: হাটহাজারী মাদ্রাসার ছাত্র আন্দোলন ছিল যৌক্তিক।  আমিও এটি সমর্থন করেছি। 

ফেসবুক পোস্টে কারও নাম না নিয়ে শফী সাহেবের প্রতি আবেদন করেছি, আপনার এই বর্ণাঢ‍্য জীবনের শেষ মুহূর্তে কয়েকটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে কওমী শিক্ষার মর্যাদা রক্ষা করুন। আল্লাহ্ প্রদত্ত ইজ্জতের সুরক্ষা করুন। 

আলেম নামধারী যে দুষ্ট লোকগুলো আপনার নাম ভাঙ্গিয়ে সর্বনাশী খেলায় মেতে উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব‍্যবস্থা নিন। এতে আপনার সন্তান হলেও ছাড় দেবেন না।

আন্দোনকারী ছাত্রদের প্রতিও আমি অনুরোধ করেছি, আপনারা যেভাবে শৃঙ্খলা বজায় রেখে আন্দোলন করছেন, পুরো দেশের মানুষ আপনাদের সমর্থন দিচ্ছে। খেয়াল রাখবেন কোনও অনুপ্রবেশকারী যেন আপনাদের এই মহান আন্দোলনে প্রবেশ করতে না পারে। 

কারণ আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার মতো অনুপ্রবেশকারীরা অনেক ন্যায্য আন্দোলন নষ্ট করে দিয়েছে, বিপথগামী করে দিয়েছে। 

আল্লামা শফীর (রহ.) মৃত্যুর পর যে অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা ঘটেছে, তা পুরো বাংলাদেশের জন্যই আদর্শ হয়ে থাকবে।  আন্দোলনকারী এবং আন্দোলনবিরোধী- সবাই মিলে হযরতকে যেভাবে সম্মানের সঙ্গে বিদায় জানিয়েছে, তা সৃষ্টি করেছে ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত। 

এটা কেবল দীনি আন্দোলনেই সম্ভব। অন্যান্য আন্দোলনের সঙ্গে দীনি আন্দোলনের পার্থক্যটা এখানেই।

সুতরাং ছাত্ররা যদি বেয়াদবিই করে থাকতো, তাহলে হতে পারতো তারা হযরতের লাশ হাটহাজারী আনতেই দিতো না। কিন্তু তা করা হয় নি। 

যারা ছাত্রদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন এবং যাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হচ্ছে- উভয় পক্ষকেই সংযত হওয়া উচিত।  আকাবিররা সবাই মানুষ; কেউ ভুলের ঊর্ধ্বে নন।  তবুও তারা যে মহান উচ্চতায় পৌঁছেছেন, তা আমাদের জন্য অকল্পনীয়। 

আহমদ শফীসহ ২০২০ সালে আরও যেসব আলেম ইন্তেকাল করেছেন, মাদ্রাসা পরিচালনা করতে গিয়ে তারা যদি কিছু ভুলত্রুটি করেও থাকেন, আমার বিশ্বাস, তাদের আমলের বরকতে সব ধুয়ে মুছে গেছে।

যুগান্তর: পরবর্তী সময়ে মালিবাগ চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসায়ও ছাত্র আন্দোলন হলো।  আপনার কি মনে হয়, এই আন্দোলনের ঢেউ অন্যান্য মাদরাসায়ও জেগে উঠতে পারে?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: সাগরের পাড়ে দাঁড়ালে দেখবেন- বড় বড় ঢেউ দেখে মনে হবে, এ ঢেউ বুঝি সব ভেঙেচুরে নিয়ে যাবে।  কিন্তু খানিক পর আরেকটি ঢেউ যখন এ ঢেউয়ের ওপর এসে আছড়ে পড়ে, বড় ঢেউটি বিলীন হয়ে যায়। 

এখন মাদ্রাসায় নয়া ছাত্র আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়বে কি না, এটা নির্ভর করবে মুরুব্বিদের ওপর। তারা যদি পেছনের ঢেউয়ের মতো এ ঢেউকে বিলীন করে দিতে পারেন, তাহলে এটা আর ছড়াবে না। তবে এ জন্য মুরুব্বিদের দুটো কাজ করতে হবে। 

এক. ছাত্রদের ক্ষোভ-দুঃখ মুরুব্বিদের শুনতে হবে এবং তার বিহিত করতে হবে।  ছাত্ররা তাদেরই সন্তান। 

দুই. কওমি শিক্ষা ব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দেবার জন্য পর্দার আড়াল থেকে কেউ উসকানি দিচ্ছে কি না, মুরুব্বিদের এটাও লক্ষ রাখতে হবে।

যেমন, আল্লামা আহমদ শফীর (রহ.) লাশ বহন নিয়ে যে কাণ্ডটি ঘটল, নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দল যে ভুল বার্তা দিতে চাইল, তারা সবসময় এমনই করে।  কখনও অপপ্রচার, কখনও অপকৌশল, কখনও ফ্যাসিস্ট পন্থায় তারা ইসলামি আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।  তাদের প্রতি সতর্ক থাকতে হবে।

যুগান্তর: হেফাজতের আন্দোলন ও উত্থানকে আপনি কোন দৃষ্টিতে দেখেন?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: ঢাকা ঘেরাও পর্যন্ত হেফাজতের আন্দোলনের সঙ্গে আমার একাত্মতা ছিল।  কিন্তু শাপলায় জমায়েত হওয়া এবং অবস্থান করায় আমার সমর্থন ছিল না।  প্রেস কনফারেন্স করে আমি এর বিরোধিতাও করেছি। 

কারণ এখানে যারা এসেছেন,  ইসলাম ও রাসুলকে নিয়ে নাস্তিক ব্লগারদের ধৃষ্টতার বিচার চাইতে এসেছেন।  আমার সন্দেহ ছিল- অনুপ্রবেশকারীরা এখানে বিশৃঙ্খলা বাঁধাবে। কিন্তু তাদের দমানোর মতো কোনও পরিকল্পনা এখানে নেই।

হাটহাজারী হযরতের অজান্তে যারা ঢাকায় বসে শলাপরামর্শ করছিল, তাদের লক্ষ্য ছিল তাহরির স্কয়ারের মতো সরকারের পতন ঘটানো।  তারা দুদিক থেকেই উপকৃত হতে চাইছিল। 

প্রথমত: যদি আলেমরা শহীদ হন, তাহলে জনগণ বিক্ষুব্ধ হবে।  এতে করে তাদের সরকার পতন আন্দোলন ত্বরান্বিত হবে। 

দ্বিতীয়ত: আলেমদের নাম ভাঙিয়ে জ্বালাও-পোড়াও ও গাছকাটা শুরু করেছিল।  এতে আলেমরাও কলঙ্কিত হবে।  কিন্তু তাদের কোনও উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি।  আলেমগণ আল্লাহ তায়ালার জন্য এসেছিল, আল্লাহ তায়ালাই তাদের রক্ষা করেছেন।  হয়তো কিছু রক্তপাত হয়েছে।

যুগান্তর: অনুপ্রবেশকারী যে গোষ্ঠীর কথা বললেন, তাদের নেতৃবৃন্দের ফাঁসির রায় এবং আল্লামা সাঈদীকে চাঁদে দেখাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, যাতে তাদের অনেক মারা গেছে।  সুতরাং তাদের ক্ষোভ থাকাটা স্বাভাবিক নয়?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: আমি বিশ্বাস করি, আল্লামা সাঈদী খুন খারাবি করেন নি।  তার খুন খারাবির প্রমাণ আমাদের কাছে নেই। কিন্তু তাকে চাঁদে দেখা যাওয়ার ব্যাপারটা তো ডাহা মিথ্যা অপ্রপ্রচার। এটা তো আমি বিশ্বাস করি না। 

তাদের ক্ষোভ থাকতে পারে।  কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশ করতে হবে ন্যায্য উপায়ে।  কিন্তু তারা কোন আন্দোলনটা ন্যায্য উপায়ে করেছে?

শুক্রবারে সবাই জুমা পড়তে গেলো।  গাড়ি পার্ক করে গেলো পার্কিং লটে, কেউ পার্ক করল রাস্তায়।  কিন্তু মতিঝিলে তাদের ২০০ এর মতো গাড়ি ভাঙচুর করা হলো, পুড়িয়ে দেওয়া হলো।  এগুলো তো জনগণের সম্পত্তি। 

ইসলামি আন্দোলন যারা করে, তারা জনগণের সম্পত্তি কেন বিনষ্ট করবে? অন্যরা হয়তো জানে না, কিন্তু তারা তো জানে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে।

যুগান্তর: তাহলে কি আল্লামা শফী হেফাজতের আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: শাপলা চত্বরের ঘটনা প্রমাণ করে না- হেফাজতের আন্দোলন তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন নি। 

কারণ, প্রথমত: ৫ মে  তিনি শাপলা চত্বরে আসেন নি।  দ্বিতীয়ত: পরদিন তিনি সবাইকে চুপ করতে আহ্বান জানালে সবাই চুপ হয়ে যায়।  

যদি আন্দোলন তার নিয়ন্ত্রণে না থাকতো, জামাত-শিবির যেভাবে জ্বালাও-পোড়াও আর গাছকাটা শুরু করেছিল, তা পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ত।  তার আহ্বান কেউ শুনত না। তার মৃত্যু পর্যন্ত হেফাজতের আন্দোলন তার নিয়ন্ত্রণেই ছিল।

যুগান্তর: হেফাজতের ১৩ দফা আপনি সমর্থন করেন?
 
মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: ইসলামি আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে আমি ১৩ দফা সমর্থন করি।  তবে এরমধ্যে তিন-চারটা বাস্তবায়ন খুব কঠিন।  এগুলো নিয়ে আমার আপত্তি আছে।

যুগান্তর: কোনটা নিয়ে আপত্তি? ব্লাসফেমি মানে ধর্ম অবমাননায় মৃত্যুদণ্ডের দাবি?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: না, না।  ১৯৯২ সালে প্রেস কনফারেন্স করে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ব্লাসফেমি আইন করার দাবি জানিয়েছি আমি। 

আলেমরা তখনও ব্লাসফেমি আইনের বিষয়টা জানতেন না।  আমি লন্ডনে পড়ালেখা করেছি।  ইউরোপে একটা আইন আছে, কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া যাবে না। আঘাত দিলে আইন অনুযায়ী শাস্তি পাবে।  

একে বলা হয় ব্লাসফেমি আইন।  আমরা ঠিক ব্লাসফেমি চাই নি, বরং ব্লাসফেমি ধরনের আইন চেয়েছি।  যেন বিধর্মীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং ইসলামের লেবাস পড়ে ইসলামের বিরুদ্ধে আঘাত- সব এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

যুগান্তর: তাহলে নারীনীতি সম্পর্কিত দফা নিয়ে?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: হ্যাঁ।  এটা নিয়ে আমার আপত্তি ছিল।  অভিযোগ ছিল, নারীনীতিতে নারীকে সম্পত্তিতে সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে। 

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমি কথা বলেছি।  তিনি আমাকে বলেছেন, ‘নারীনীতিতে বলা হয়েছে, কোরআনে বর্ণিত ফারায়েজ অনুযায়ী নারী যতটুকু পাবে, ততটুকুতে তার নিয়ন্ত্রণ থাকবে।’ 

এই নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই নারীদের অধিকার। এটা তো আমাদের মানতেই হবে।  বাবার মৃত্যুর পর বোনদের না দিয়ে সব সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ যদি আমাদের হাতেই থাকে, তাহলে নারীকে দেওয়া হলোটা কী? 

প্রধানমন্ত্রী তবুও সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ঘটনা হলো এই। তবু যদি আলেমরা যদি আপত্তি জানান, তাহলে এটাও সংশোধন করব।’

যুগান্তর: ৫ মে যারা শাপলা চত্বরে নিহত হয়েছে, তাদেরকে শহীদ মনে করেন কি না?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: যারা ইসলামের নীতি বাস্তবায়নে নিয়তে এসে নিহত হয়েছে, ইসলামে তারা শহীদ।  কিন্তু যারা সরকার পতনের উদ্দেশ্যে এসেছে, তারা তো শহীদ না।

যুগান্তর: যাদের শহীদ বলছেন, তাদের তো একদল শহীদ করেছে। তাহলে অপরাধী দলটা কারা?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: দেখুন, ‘এরা আলেম, এরা ইসলামি রাজনীতি করে, কিংবা রাজনীতি না করেও দাবি নিয়ে এসেছে’- এই চিন্তায় যদি তাদের আঘাত করে থাকে, তাহলে নিঃসন্দেহে তারা পাপীষ্ঠ। 

কিন্তু রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গিয়ে যদি আঘাত করে থাকে, তাহলে এর দায় নিতে হবে আলেমদের।  সরকার এর দায় নিতে পারে না।  কারণ রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব তাদের হাতে। 

তাহলে একটি প্রশ্ন করি- মঞ্চে সেদিন যারা উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়েছে, তাদের ব্যাপারে কী বলবেন?

যুগান্তর: এটা তো যুদ্ধ ছিল না।

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: হ্যাঁ, যুদ্ধ ছিল না।  কিন্তু তারা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।  সেদিন এক বক্তা বক্তৃতায় বলেছিলেন, উহুদ বিগ্রেড ও বদর বিগ্রেডও নাকি গঠন করা হয়েছে বিভিন্ন দিকে।

যুগান্তর: সে-রাতের ঘটনার তো শক্তিশালী তদন্ত এবং বিচার হওয়ার দরকার ছিল।

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: হুম।  তদন্ত হলে অনেক সত্য সামনে আসতো।  তবে এই তদন্ত সরকার করবে কেন।  বরং তদন্ত করার দরকার ছিল এখানে আসা আলেমদের। 

তারা কমিটি গঠন করে তদন্ত করতে পারতো। আল্লামা শফিও তদন্তের দাবি জানাননি। তদন্তের দাবি জানানোর দরকার ছিল।

যুগান্তর : বেফাকের সর্বশেষ কমিটি নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: কমিটি নিয়ে আমি কোনও মন্তব্য করব না। তবে যেভাবে কমিটি গঠিত হয়েছে, তা ছিল নজিরবিহীন সুন্দর।

যুগান্তর: কওমি স্বীকৃতি নেওয়ার সময় একটা প্রশ্ন খুব উঠেছিল- স্বীকৃতির আগে সংস্কার দরকার।

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: আগে সংস্কার হবে কেন? স্বীকৃতির পর সংস্কার হবে এবং সংস্কারের অনেক স্কোপও এখন বেরিয়েছে। সংস্কার এখন করা দরকার।

যুগান্তর: স্বীকৃতি কিভাবে পাওয়া গেলো, সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে।  এটা নিয়ে নাকি হেফাজতের সঙ্গে দর কষাকষি হয়েছে?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: না, এটা ভুল।  হেফাজত দাবি জানিয়েছে।  পরবর্তী সময়ে পার্লামেন্ট এবং সরকারের সঙ্গে যত যোগাযোগ ও বৈঠক, সবগুলোতে আমি ছিলাম। 

প্রয়াত ধর্মপ্রতিমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহর সঙ্গে এ নিয়ে শুরুর দিকে আমার অনেক বাক-বিতণ্ডাও হয়েছে। তবে শেষদিকে তিনি এটা নিয়ে অনেক দৌড়ঝাঁপ করেছেন। আল্লাহ তাকে জান্নাত নসিব করুন।

যুগান্তর : স্বীকৃতির বিপক্ষেও অনেকে ছিলেন।  যেমন আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেছিলেন, স্বীকৃতি হলে লাখ লাখ লাশ পড়বে...

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: আল্লামা বাবুনগরীর এই বক্তব্য আমি শুনিনি। তবে আল্লামা ফজলুল আমিনীকে (রহ.) বলতে শুনেছি- শেখ হাসিনা থেকে স্বীকৃতি নিব না।

যুগান্তর: স্বীকৃতি পরবর্তী ‘শোকরানা মাহফিল’ অনুষ্ঠিত হলো।  এটা একরকম তোষামোদি হয়ে গেলো কি না?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: এটা তোষামোদি না।  অবদানের কৃতজ্ঞতা আদায় করা।  রাসুল সা. বলেছেন, যে মানুষের শুকরিয়া আদায় করতে পারে না, সে আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করতে পারে না। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বীকৃতি দিয়েছেন, এর কৃতজ্ঞতা জানাতে শোকরানা মাহফিল ডাকা হয়েছিল।  শোকরানা মাহফিলে আমাদের তো দেখেন নি।  হেফাজতের খুব অল্প সংখ্যা নেতা এখানে এসেছিলেন। 

মাহফিলের দুদিন আগে জানতে পারলাম, মাহফিলে আসার জন্য কোথাও কেউ গাড়ি ভাড়া করছে না।  

আমি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহকে বললাম, ‘মাহফিলে যদি মানুষ কম হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আল্লামা আহমদ শফি দুজনেরই অপমান। তাদের অপমান থেকে বাঁচানোর জন্য আমাদের কিছু করতে হবে।’
 
শেখ আব্দুল্লাহ খুব অস্থির হয়ে পড়লেন।  আমি, শেখ আব্দুল্লাহ, ইফার ডিজি শামিম আফজাল বৈঠকে বসলাম।  
ডিজিকে বললাম, ‘জেলায় জেলায় খবর পাঠান।  ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গণশিক্ষা কার্যক্রমের আলেমগণকে আসতে বলেন।  প্রত্যেকে যেন নিজের সঙ্গে আরও দুএকজন নিয়ে আসে।’
 
শোকরানা মাহফিলের দিন ময়দানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের লক্ষাধিক আলেম ছিলেন।  তাদের অধিকাংশই কওমি মাদ্রাসার ছিলেন না।

যুগান্তর: কিন্তু সেই মঞ্চে কিছু তোষামোদিসুলভ বক্তব্য এসেছে।  যেমন প্রধানমন্ত্রীকে ‘কওমি জননী’ বলা।  আবার প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা জয়নাল আবেদিন বললেন, ৫ মে কেউ হতাহত হয়নি।

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: জয়নাল আবেদিন একজন সরকারী কর্মচারী। শোকরানা মাহফিলের মঞ্চে তার বক্তব্য দেওয়াটা আমি পছন্দ করিনি।  

কিন্তু এটা সত্য- কওমি স্বীকৃতির শেষদিকের দৌড়ঝাঁপে তার অবদান অনেক।  বারবার তিনি আমাকে এটাসেটা নিয়ে ফোন করেছেন, জানতে চেয়েছেন।  আর কওমি জননী যিনি বলেছেন, তার হয়তো বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য ছিল।

যুগান্তর: এক সাক্ষাৎকারে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলেছেন, স্বীকৃতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে খুব আন্তরিক ছিলেন। আপনি তো তার কাছাকাছি ছিলেন।  এই আন্তরিকতার কারণটা  কী?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: প্রথমত, প্রধানমন্ত্রীর সামনে যখন কওমি মাদ্রাসার ইতিহাস তুলে ধরা হলো, দেখা গেলো তিনি এর ইতিহাস আগে থেকেই জানেন। 

তিনি বললেন, ‘আমি মক্তবে কওমি আলেমের কাছে পড়েছি।’ সুতরাং এইদিক থেকে একটা দুর্বলতা ছিল। 

দ্বিতীয়ত, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় পার্লামেন্টে মাওলানা আসআদ মাদানী আমাদের স্বপক্ষে কথা বলেছেন। একদিকে ভারতের আলেমদের সমর্থন, আরেকদিকে পার্লামেন্টে আলেমদের কথা বলা- দুটোই তিনি এবং তার বাবা দুজনই জানতেন। 

এই দিক থেকেও একটা দুর্বলতা ছিল।  ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব সত্য বলেছেন।

যুগান্তর: কোনও কোনও ফোরাম প্রশ্ন তুলছে- বোর্ডের অধীনে ইউনিভার্সিটি লেবেলের স্বীকৃতি দেয়া হলো।  এটা ততটা মূল্যায়ন পাবে না।

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী : তখন আলেমরা যেমনভাবে চেয়েছেন, সরকার তেমনভাবেই দিয়েছে।  আলেমরা চেয়েছেন বোর্ডের অধীনে।  কিন্তু আমি চেয়েছিলাম একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হলে ভালো হতো। 

উদাহরণস্বরূপ আমাদের একটা বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে ‘ইমাম বুখারী বিশ্ববিদ্যালয়’।  এর অধীনে সার্টিফিকেট দেয়া হবে। অনেক কিছু অমীমাংসিত রেখেই স্বীকৃতি নেয়া হয়েছে। 

অমীমাংসিত বলতে আলেমরা সেগুলো চাননি।  যেমন- যারা এখান থেকে পাশ করবে, তাদের জন্য ভার্সিটিতে শিক্ষকের পদ, ব্যাংকে পদ, সেনাবাহিনীতে পদ, সরকারি মসজিদে ইমাম দিতে হবে এমন দাবি তারা করেননি।  শুধু স্বীকৃতির সম্মানটা নিয়েছেন।

যুগান্তর: আওয়ামীলীগের দীর্ঘদিন আলেমবিরোধী একটা ইমেজ ছিল।  কিন্তু কওমি স্বীকৃতি ইত্যাদি কারণে সেটা ইমেজ ক্লিন হয়ে গেছে।  এক্ষেত্রে আপনার ও ফরীদ উদ্দীন মাসঊদসহ কয়েকজনের নাম উঠে আসে।  এটা কেন করেছেন?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ তো কওমির আলেম।  এটা তার করার কথাই ছিল।  আমি কওমির আলেম না হলেও কওমি আলেমদের সঙ্গে রাজনীতি করি।  সুতরাং মুরুব্বিরা আমাকে সুযোগ দিয়েছেন, কেউ তাড়িয়ে দেননি।  তাদের প্রতি শুকরিয়া।

যুগান্তর: আপনি আওয়ামীপন্থি কেন হলেন?

মিসবাহুর রহমান চৌধুরী: আওয়ামীগকে আমি পূর্ণ সমর্থন করি না।  তবে তাদের সঙ্গে সম্পর্কের গুণে এখন আমরা বর্তমান সরকারের কাছে দাবি জানাতে পারি।  কিন্তু সব দাবি মানাতে পারব না। 

কারণ এই সরকার তার রাজনৈতিক আদর্শ, চিন্তা, নীতি সবই প্রকাশ করেছেন।  আমরা যারা ইসলামি রাজনীতি করছি, তারাও সংগঠিত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারিনি।  ছোট ছোট সংগঠন আমরা চালাচ্ছি কষ্ট করে। 

মানুষ ভালোবেসে আমাদের সঙ্গে থাকছে। আমরা যদি আওয়ামীলীগকে শতভাগ সাপোর্ট করতাম, তাহলে কষ্ট করে সংগঠন টানার এত দরকার ছিল না।

২০০৮ সালে আমার দল ‘বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোট’ নিবন্ধন পায়নি।  আরপিওর নিয়ম ছিল, যারা স্বাধীনতার পর পার্লামেন্টে একটি সিটও পেয়েছে, তারা নির্বাচনে যাবে।  নতুবা ৫০ টি জেলা এবং ১০০ টি উপজেলায় যাদের অফিস আছে, তারা যাবে। এর কোনোটাতেই আমি উত্তীর্ণ হইনি। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে বললেন, ‘আপনি আওয়ামীলীগ থেকে নির্বাচন করুন। ঢাকার যেকোনো দুটি সিটে।’

আমি তখন বললাম, ‘আমি আওয়ামীলীগ থেকে নির্বাচন করব না।  যদি মহাজোট থেকে হতো, তাহলে নৌকার হয়েও করলে করতাম।’ কিন্তু মহাজোট থেকে নমিনেশন পেতে তো নিবন্ধন লাগে, আমার দলের নিবন্ধ নেই। 

শেখ হাসিনা বললেন, ‘নমিনেশনের জন্য আমার দরজায় ভিড় লেগে আছে। তারা মাথা ঠুকছে। আপনি সাইন করুন।’ 

চারদিন তিনি কাউকে নমিনেশন দেননি।  কিন্তু তবুও আমি রাজি হইনি।  সেই যে তিনি আমার সঙ্গে অভিমান করেছেন, তার সেই অভিমান এখনও আছে।

আওয়ামীগকে আমি পূর্ণ সমর্থন করি না ঠিক।  কিন্তু আমার ইচ্ছা ছিল- আমরা এককভাবে তো সরকার গঠন করতে পারবো না; আওয়ামীলীগের সঙ্গে কোঅপারেশন করে যদি দাবিগুলো বাস্তবায়ন করা যায়, সেটা করে দেখি।

যুগান্তর: ইসলামি ঐক্যজোটের আপনার অংশটি ছাড়া বাকি সবাই বিএনপির সঙ্গে ছিল। কেউ তখন ভাবতেই পারতো না কোনো কওমি আলেমের দল আওয়ামীলীগের সঙ্গে যোগ দিতে পারে। পরবর্তীতে খেলাফত মজলিস যোগ দিয়েছিল।  আপনি বিএনপি থেকে আলাদা হলেন কেন?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: আমি মনে করি এদেশে ইসলামি রাজনীতির উত্থানের জন্য সবচে’ বড় বাধা ‘জামায়াতে ইসলামী’। 

দলটি মনে করে, ইসলামি রাজনীতি করার অধিকার একমাত্র তাদেরই আছে। তারাই সবকিছু করবে।  সুতরাং যে দলে ‘জামায়াতে ইসলামী’ থাকবে, সেখানে তাদের সঙ্গে বসাটা আমি সমীচীন মনে করিনি। 

কারণ সেখানে আমার অস্তিত্ব রক্ষাই মুশকিল হবে।  ‘ইসলামী মোর্চা’ যখন গঠন হয়, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ছিলেন সভাপতি, আল্লামা ফজলুক আমিনী ছিলেন মহাসচিব, আমি  ছিলাম যুগ্ম মহাসচিব। 

মানিক মিয়া এভিনিউর মঞ্চে একমাত্র আমার বিরোধিতার কারণে জামায়াতকে ডাকা হয়নি।  নতুব সব ধারার ইসলামি দল সেখানে এসেছিল।

যুগান্তর: আপনার জামায়াত বিরোধিতা ধর্মীয় বোধ থেকে নাকি রাজনৈতিক?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: দুটোই।  যেসব আলেমের সোহবত আমি পেয়েছি, তারা সবাই বলেছেন, জামায়াত সাহাবিদের সমালোচনা করে।  এই কথাটুকু আমার মাথায় গেঁথে গিয়েছিল।  আকিদার ক্ষেত্রে আমি আলেমদের কথাকেই সর্বেসর্বা মনে করি।  পরে তাদের বইপত্র পড়েও এসব জেনেছি।

ইহুদিদের মূল শক্তিই অর্থ, গুলি, মেধা।  জামায়াতে ইসলামীও এই তিনটিকে তাদের মৌলিক হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছে। 

তাই দেখবেন, তারা মেধাবী খোঁজে—আলেম খোঁজে না।  হেকমতের নাম দিয়ে অনেক স্ববিরোধী কাজ তারা করে। সকালে একটা বলে, বিকেলে আরেকটা করে।  কওমি আলেমরা হেকমত বলেন দূরদর্শিতা ও কৌশলকে।  মিথ্যা বলে আকিদা পরিবর্তন করাকে হেকমত বলে না।

যুগান্তর: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান জীবনের শেষদিকে এসে আমাদের বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ঐক্যের দরকার ছিল।

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: তিনি আমাকেও একথা বলেছেন।  আমি তাকে বলেছি, ‘ইসলামী ব্যাংক না হলে আপনি একথা বলতেন না।’ তবে একটা প্রশ্ন হলো- তিনি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ঐক্যের কথা বলেছেন, কিন্তু যাদের সঙ্গে সারাজীবন রাজনীতি করেছেন, তাদের ঐক্য নিয়ে কতটুকু কাজ করেছেন? আমি তার দোষ বলছি না, কথার কথা বলছি।

যুগান্তর: ঐক্যটা হচ্ছে না কেন?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: ঐক্য না হবার পেছনে অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে।  তবে ঐক্যের আহ্বান করার জন্য যেমন যোগ্য ব্যক্তিত্বের দরকার, তেমন ব্যক্তিত্ব নেই।  তেমন ব্যক্তিত্ব যতদিন না আসবে, ততদিন ঐক্য হবে না। 

বিভিন্ন ইস্যুতে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই।  কিন্তু সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয়ে ঐক্য বিনষ্ট হয়ে যায়।  

৯৪ সালে তসলিমা-বিরোধী আন্দোলনের একটা উদাহরণ দিই- আন্দোলন করার জন্য তখন ‘ইসলামী সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়।  এর সভাপতি বানানো হয় খতিব ওবায়দুল হককে রহ.।  মহাসচিব বানানো হয় চরমোনাই পীর সাহেব, শাইখুল হাদীস সাহেব, ফুরফুরা পীর সাহেব, ছারছিনার পীর সাহেবকে। 

সিদ্ধান্ত হলো- ছয়মাস পর পর একজন একজন করে সভাপতি হবেন।  প্রেসিডিয়ামের মতো।  দুই বছরের জন্য মহাসচিব বানানো হলো মুফতি ফজলুল হক আমিনীকে।  আমি হলাম যুগ্ম মহাসচিব। 

মানিকমিয়া এভিনিউর সম্মেলনে রেজুলেশন পাঠ করবেন খতিব ওবায়দুল হক।  রেজুলেশন লেখার দায়িত্ব দেয়া হলো লালবাগের একজন, চরমোনাইর একজন এবং আমাকে।  কিন্তু রাতে শুনলাম দায়িত্ব চেইঞ্জ হয়ে গেছে। 

এখন রেজুলেশন লিখবেন, বিএনপির আনওয়ার জাহিদ।  এ কাজটি করালেন ইনকিলাবের মাওলানা আব্দুল মান্নান। তার পরামর্শে আনওয়ার জাহিদ রেজুলেশন লিখে সম্মেলনে নিয়ে গেলেন।  আমাদের কারো হাতে কপি দেওয়া হয়নি। 
সভাপতি হিসেবে রেজুলেশন পড়তে দাঁড়ালেন খতিব সাহেব।  তিনি তো রিডিং পড়ছেন।  একজায়গায় তিনি পড়লেন- ‘ইংরেজি শিক্ষিত বিদ্বানরাই পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য দায়ী!’ পরদিন তার বিরুদ্ধে পর পর কয়েকটি মামলা হয়ে গেলো।  পুরো আন্দোলনের মোড় ঘুরে গেল অন্য দিকে! 

এমন সুক্ষ্ণভাবে আলেমদের বহু ঐক্য বিনষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

যুগান্তর: ইসলামী ঐক্যজোট যখন চারদলীয় জোটে অংশগ্রহণ করে, চরমোনাই পীর সাহেব সেখানে যান নি। পীর সাহেবের এই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল বলে মনে করেন?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চললেই ভালো হতো।  তবে চারদলে না গিয়ে তিনিই ভালো করেছেন। এর সুফল পাচ্ছেন এখন। 

সবদল ভেঙে গেছে, কিন্তু তার দল এখনও অটুট।  যেখানেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, কিছু হলেও ভোট পাচ্ছেন।  তিনি রাজনীতিতে একটি স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য তৈরি করতে পেরেছেন।

যুগান্তর: অনেকের সন্দেহ- তাদের প্রতি সরকারের আনুকূল্য আছে।  এটা কতটুকু বাস্তব?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: হ্যাঁ, কর্মসূচিতে সরকারের বাধা না দেওয়া, নির্যাতন না করা- আমাদের তৃতীয় বিশ্বে এটাও একটা আনুকূল্য।  যারা এই আনুকূল্য পায় না, তাদের সরকারি বাধা সহ্য করেই এগিয়ে যেতে হয়। 

তবে আমি মনে করি, যারা ইসলামি রাজনীতি করছে, তাদের আর সময়ক্ষেপণ না করে এখনই ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। আমি মৃত্যুর আগে সবার ঐক্যবদ্ধ একটি রেনেসাঁ দেখে যেতে চাই।

যুগান্তর: আপনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একজন গভর্নর।  বর্তমান সরকার এবং আগের সরকারের আমলেও একটি অভিযোগ বারবার শোনা গেছে- ইসলামিক ফাউন্ডেশনে ধর্মীয় বই প্রকাশের পরিবর্তে ক্ষমতাসীনরা তাদের বিভিন্ন বই প্রকাশ করে।

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: ক্ষমতাসীন সরকার তার আদর্শ প্রচার করতে চাইবেই।  বিশেষ করে জামায়াত ইসলামিক ফাউন্ডেশনে কৌশলে তাদের প্রভাব বিস্তার করেছে।  এখন আমাদের চাপে তাফসিরগ্রন্থ এবং হাদিসের গ্রন্থগুলোর কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। 

বিগত ডিজি যিনি ছিলেন, তিনি তো যাদের মাজার আছে, তাদের সব জীবনীও লিখেছেন।  আপনাদের পক্ষ থেকে এর বিরোধিতাও আমি করেছি।

যুগান্তর: ইদানিং ‘ফাজায়েলে আমল’র মতো কিছু ধর্মীয় বই জব্দ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্টিকার লাগিয়ে মিডিয়ায় প্রচার করছে ‘উগ্রবাদী বই’ বলে। বিষয়টা নিয়ে কিছু বলতে চান কি না?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: আমি পুলিশের অনেক ওয়ার্কশপ, সেমিনার, সভা, ট্রেনিং সেশনে বক্তৃতা দিয়েছি। তাদের একটা কথা বলেছি-  যেসব বই আপনারা উগ্রবাদী মনে করেন, মিডিয়ায় সেগুলো জিহাদি বই বলবেন না। 

কারণ জিহাদি বই তো কোরআনও।  কোরআনে জিহাদের কথা আছে।  পুলিশ কমিশনারদের সামনে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছিলেন, ‘তোমরা মিডিয়া সেল থেকে জিহাদী বই বলবে না।’ এরপর থেকে এই পরিভাষা অনেকটা কমেছে।  

এখানে আরেকটা সমস্যা হলো- যারা রেড দেয়, তারা ইসলাম সম্পর্কে না জানার কারণে তাবলীগের বইকেও জামায়াতের বই মনে করে।  আবার জামায়াতের বইকেও মনে করে হাদীসের গ্রন্থ।  

একবার রেড দেবার পর আমার কাছে  ‘জামায়াতের হাকিকত সিরিজ’ নিয়ে এলো।  প্রচ্ছদে কাবার ছবি।  সে জিজ্ঞেস করলো, ‘এটা কি হাদীসের গ্রন্থ?’ এই হলো অবস্থা। 

সরকার জামায়াতের বিরুদ্ধে লেখার জন্য, তাদের অপকর্ম তুলে ধরার জন্য ডিজিএফআইয়ের এক অফিসারকে দায়িত্ব দিয়েছে।  তিনি যে বই লিখেছেন, তা ‘তাফহীমুল কোরআন’র রেফারেন্সে পূর্ণ! 

তাই ক্ষমতায় আসার আগে একবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলেছিলাম, আলেমদের সমন্বয়ে একটা সেল গঠন করেন এসব তদারকির জন্য।

যুগান্তর: আহমদ শফি (রহ.) একাই অনেক পদের দায়িত্বে ছিলেন।  হাইয়াতুল উলয়ার চেয়ারম্যান, বেফাকের সভাপতি, হাটহাজারীর মহাপরিচালক, হেফাজতে ইসলামের আমির।  এই বয়সে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব নেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত মনে করেন?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: কখনও কখনও একজন ব্যক্তি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান হয়।  তখন তিনি অনেক দায়িত্ব পালন করতে পারেন, যদি তার মেশিনারিজ থাকে।  আহমদ শফী (রহ.) নিজেই একটা প্রতিষ্ঠান ছিলেন।  তার মেশিনারিজও ছিল।  সবগুলো পদের দায়িত্ব পালন করার যোগ্যতা ছিল।

যুগান্তর: আপনারও অনেকগুলো পরিচয়। রাজনীতি করছেন, মাদ্রাসা দিচ্ছেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনে কাজ করছেন। নিজেকে কোন পরিচয়ে পরিচিত করতে ভালোবাসেন?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: ইসলামি আন্দোলনের কর্মী।

যুগান্তর: আজকাল কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: রাজনীতি করছি।  একটি মাদ্রাসা করার ইচ্ছে ছিল।  এক সুহৃদ সহকর্মী মুগদায় এক বিঘা জমি দিয়েছেন।  মাদ্রাসা শুরু হয়ে গেছে।  সেখানে দুতলা ঘরে আছে।  এগারো তলা ভবন তোলার ইচ্ছে আছে।  এখানে বড় লাইব্রেরিও হবে। 

যুগান্তর: ছোটবেলা আপনি কী হতে চেয়েছিলেন? কী হতে পারেননি?

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: ছোটবেলায় যখন স্যুট-কোট পড়তাম, তখনও ইসলামের প্রতি টান ছিলো।  ১৬-১৭ বছর বয়সে চলে গেলাম লন্ডন।  তখনই বিভিন্ন মুসলিম দেশের সভা-সেমিনারে বক্তব্য দিতে শুরু করি। 

তখন আমি লন্ডনের ‘মুসলিম মুভমেন্ট’র সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলাম।  এভাবেই ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে পথচলা শুরু।  এখনও পথ চলছি।  তবে লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি।  সঙ্গে কিছু সহকর্মী পেয়েছি, যারা আমার সঙ্গে লক্ষ্যে পৌঁছতে চায়।

যুগান্তর: অসুস্থতার মধ্যেও সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: কষ্ট করার জন্য আপনাদেরও ধন্যবাদ জানাই।

 

অনুলিখন: রাকিবুল হাসান
 

প্রধানমন্ত্রী মক্তব কওমি আলেম মিছবাহুর রহমান চৌধুরী ইসলামী ঐক্যজোট ইসলামিক ফাউন্ডেশন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম